অসীম গোপ, ফুটবলের কোচের কাছ থেকে চেয়ে নেন হকি কোচ

খেলার প্রতি ঝোঁক ছিল খুবই। সবচেয়ে বেশি পছন্দ করতেন ফুটবলকে। বড় ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে অংশ নেন বিকেএসপির বাছাইয়ে। ডিফেন্ডার হিসেবে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হন। কিন্তু পড়ে যান হকি কোচ রাজুর নজরে। সেই সুনজরে হকির গোলরক্ষক হয়ে সরাসরি বিকেএসপি। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। জাতীয় দলের অন্যতম মূল ভরসা এখন তিনি। বলা হচ্ছে জাতীয় হকি দলের তারকা অসীম গোপের কথা। অসীমের ক্যারিয়ার, এর পেছনের গল্প নিয়ে তিনি কথা বলেছেন আমাদের সাব-এডিটর সাগর রায় এর সঙ্গে ।

এসএনপিস্পোর্টস: করোনার ঘরবন্ধী জীবন কেমন কাটছে?

অসীমঃ হঠাৎ করে খেলাধুলা বন্ধ, খুব খারাপ লাগছে। আমরা তো রানিং প্লেয়ার, দুই-তিন মাস খেলা নেই। হ্যাঁ কিছু অনুশীলন করেছি, তবে খেলা না থাকায় খারাপই লাগছে।

এসএনপিস্পোর্টস: এই হকি খেলোয়াড় হওয়ার পেছনের গল্পটা শুনতে চাই।

অসীমঃ হবিগঞ্জে বিকেএসপির ট্রায়াল চলছিল সেসময়। তখন ফুটবল খেলতাম আমি। হবিগঞ্জ জেলা স্টেডিয়ামে সিনিয়রদের সাথে খেলতাম। ট্রায়াল আসার পর আমি ফুটবলে দেই। ডিফেন্সে ট্রায়াল দিচ্ছিলাম। পরিতোষ স্যার ছিলেন ফুটবলের কোচ। উনি আমাকে ক্যাম্পের জন্য সিলেক্ট করেছিলেন। হকির রাজু স্যার তখন উনাকে (পরিতোষ) জিজ্ঞেস করেন আমাকে বিকেএসপিতে ভর্তি নিবেন কিনা। তিনি বলেন ক্যাম্পে নিয়েছি। ভালো করলে ভর্তি করাবো। রাজু স্যার তখন বলেন আমার ওকে পছন্দ হয়েছে, আমি ওকে হকিতে গোলরক্ষক হিসেবে নেব। এভাবেই হকিতে আসা।

এসএনপিস্পোর্টস: শুরুর দিক দিয়ে পরিবার থেকে কতটা সমর্থন পেয়েছিলেন?

অসীমঃ আসলে বিকেএসপির নাম শুনতেই প্রথমে পরিবার থেকে এতটা ধারণা ছিল না। এখন যেমন মিডিয়াতে বিকেএসপি নিয়ে এতো মাতামাতি, সাকিব আল হাসানসহ অন্যান্য বড় খেলোয়াড়রা এখান থেকে আসে বলে নিয়ে যে হাইপটা আছে, তখন সেটা ছিল না। পরিবার থেকে খোঁজখবর নিয়ে প্রাথমিকভাবে অনুমতি দেওয়া হয়। যখন ভর্তি হতে যাবো তখন আমি হবিগঞ্জ সরকারী স্কুলে পড়তাম। পরিবার থেকে দোলাচল ছিল ভর্তি নিয়ে। এরপর বুঝিয়ে-শুনিয়ে ভর্তি হই। এখানে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করেছে আমার দুই মামা রণজয় এবং রিপন। ২০০৭ সালে ভর্তি হই, ২০১৩ পর্যন্ত সেখানেই ছিলাম।

এসএনপিস্পোর্টস: এই হকি ক্যারিয়ারের পেছনে কি কোনো ত্যাগের গল্প আছে?

অসীমঃ আসলে ত্যাগের গল্প বলতে আমি যখন বিকেএসপিতে ছিলাম তখন অধিকাংশ সময় বন্ধের মাঝে সিনিয়রদের খেলা পড়তো। আমার ক্ষেত্রে হয়েছি কি ক্লাস সেভেনে ভর্তি হই বিকেএসপিতে, এইট থেকেই সিনিয়রদের সাথে খেলতাম। তো সেসময় সিনিয়রদের পুরো টিমই থাকতো, আমি ছিলাম অতিরিক্ত খেলোয়াড়। তাদের সাথেই আমাকে রাখতো। খেলতাম তাদের সাথে। এরপর কিছু টুর্নামেন্ট ছিল, যেমন ভারতের ন্যারো কাপ ছিল। যেখানে বয়সভিত্তক হওয়াতে অনেক সিনিয়রই সুযোগ পেতেন না। তখন আমি খেলতাম। বিকেএসপিতে থাকাকালীন সময়ে টানা চার বার খেলেছি আমি। সিনিয়রদের সাথে অনুশীলনও করতাম। ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট ছিল সেই সময়টা। আর এতে স্যাররা আমাকে অনেক সাহায্য করেছে। আমি সবসময়ই বলি স্যারদের এই অবদানের কথা।

এসএনপিস্পোর্টস: হবিগঞ্জের ফুটবলার থেকে জাতীয় হকি দলের অধিনায়ক, অনুভূতি কেমন?

অসীমঃ এখনো সিনিয়র দলের অধিনায়ক হইনি আমি। অনেকেই ভুল করে থাকেন এটা। সিনিয়র দলের সহ-অধিনায়ক আমি। জুনিয়র দলের (অনূর্ধ্ব-২১) অধিনায়ক ছিলাম। অন্য কোনো জুনিয়র দলে আমি খেলি নি। সরাসরি সিনিয়র দলে প্রথম খেলি আমি। এরপর জুনিয়র দলের হয়ে খেলি। সিনিয়র দলে ২০১২ সালে সুযোগ পাই, আর জুনিয়র দলে দুই বছর পরে ২০১৪ সালে খেলি।

এসএনপিস্পোর্টস: ঘরের মাঠে ২০১৪ সালে একটা জুনিয়র কাপে টানা পাঁচ ম্যাচে ৩৪ গোল দেয়া বাংলাদেশ, বিপরীতে একটিও হজম করেনি। গোল হজম না করার পেছনে আপনাকেই বড় কারিগর হিসেবে ধরা হয়, সেই অনুভূতিটা কেমন?

অসীমঃ আসলে যখন খেলছিলাম, চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ধ্যান নিয়েই খেলেছিলাম। বাংলাদেশের মাঠে খেলা, ফেডারেশনসহ সবার আমাদের উপর একটা আশা ছিল। আমরা যে গোল হজম করি নাই সেই দিকে খেয়াল ছিল না। খেলতে খেলতে একেবারে ফাইনাল ম্যাচে স্যার (কোচ) বলছে, আমরা তো একটি গোলও হজম করি না, তো ফাইনাল ম্যাচেও হজম করবো না। ০-০ ব্যবধানে ম্যাচ শেষ করবো। আর এটা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট, যেখানে গোল হজম না করে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। সেখানে আমি সেরা গোলরক্ষক হই, তারপর পত্রিকাতে দেখে আমাকে অনেকেই ফোন দিয়ে অভ্যর্থনা জানিয়েছে। সেখানে শুধু আমার না, যাদের সাথে খেলেছি রক্ষনে ছিল তাদেরও অনেক সহায়তা ছিল।

এসএনপিস্পোর্টস: এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সেরা মূহুর্ত?

অসীমঃ সেরা মূহুর্ত ২০১৪ এশিয়ান গেমসে কোয়ালিফাইয়ের সেমিফাইনাল ম্যাচে। শ্রীলঙ্কা শেষ মূহুর্তে একটা স্টোক পেয়েছিল। সেখান থেকে গোল দেওয়ায় স্কোরলাইন সমান হয়। এরপর ৮ সেকেন্ডের শুটআউট হয়। যেটা নতুন শুরু হয় সেসময়। ঐটাতে আমরা ভালো ছিলাম। আমাদের আত্মবিশ্বাস ছিল আমরা জিতবো। আমি প্রথম তিনটাই সেইভ দিয়ে দেই। এরপর আমাদের দুইটা গোল হয়, একটা সেইভ দিয়ে দেয়। প্রথম তিনটা সেইভ দেওয়াতে ওদেরকে একটা মারতে হয়নি। আমরা জিতে যাই। আমার ছোট বেলা থেকে স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশকে জেতাবো, সেই দিনটা আমার কাছে স্মরণীয়।

এসএনপিস্পোর্টস: স্মৃতিতে কষ্টদায়ক মূহুর্ত?

অসীমঃ কষ্টদায়ক মূহুর্ত ছিল ২০১৪ সালে ওয়ার্ল্ড লিগ রাউন্ড -২। জুনিয়র টুর্নামেন্ট শেষ করে সিঙ্গাপুরে খেলতে গিয়েছিলাম। ওমানের বিপক্ষে ম্যাচ ছিল। ওমানকে খুব একটা ভালো দল মনে করা হয় না। তো তাদের বিপক্ষে তিন গোলে এগিয়ে ছিলাম আমরা, ধরেই নিয়েছিলাম জিতে যাচ্ছি। অথচ নির্ধারিত সময়ে ম্যাচটি ড্র হয়ে যায়। আমাদের এগিয়ে থাকা হয়নি। এরপর শুটআউটে গড়ায়। সেখানে আমাদের দল ৪টা মিস করে। আমি দুইটা সেইভ দিয়েছিলাম প্রথমে। তিন নম্বর আর চার নম্বরে গোল করেছে ওরা (ওমান)। আমাদের দল চারটা মিস করায় পাঁচ নম্বরে আসতে হয়নি আর। ম্যাচটা হেরে যাই আমরা। যে দলের সাথে তিন গোলে জিততে চলে ছিলাম, সেই দলের সাথে শুটআউটে গেলাম, সেখানেও চারটা মিস করে হেরে গেলাম। ওই মূহুর্তটা অনেক খারাপ ছিল। বাসায় এসে এক মাসের মতো ঘুমানোর আগে চিন্তা করতাম ওমানের সাথে হারলাম কিভাবে!

এসএনপিস্পোর্টস: নিজের ক্যারিয়ারকে কোথায় দেখতে চান?

অসীমঃ অনেক দিন ধরে খেলা নাই। পাকিস্তানে টুর্নামেন্ট ছিল একটা। সেখানে খেলতে পারিনি। যার ফলে দীর্ঘদিন ধরে খেলা হচ্ছে না। আমরা বিশ্বকাপে খেলতে চাই। পরবর্তীতে যখন ২৪টা (১৮, ২০, ২২, ২৪ ধাপে ধাপে বাড়বে) দলের বিশ্বকাপ হবে, সেই বিশ্বকাপে খেলতে চাই। যখন বেশি দলের বিশ্বকাপ হবে, তখন আমাদের একটা সুযোগ থাকবে। আমি যতদিন পর্যন্ত খেলবো, সেই পর্যন্ত চাওয়া থাকবে। বাংলাদেশের হয়ে বিশ্বকাপ খেলে যেতে চাই চাই।

এসএনপিস্পোর্টস: ক্যারিয়ার শেষের কি কোনো পরিকল্পনা রয়েছে?

অসীমঃ ক্যারিয়ার শেষে আমি আমার এলাকায় সময় দিতে চাই। কারণ দীর্ঘদিন ধরে বাইরে থাকি। আমার হবিগঞ্জের জন্য কিছু একটা করতে চাই।

এসএনপিস্পোর্টস: দেশের হকি উন্নয়ন কেন হচ্ছে না বলে মনে করেন?

অসীমঃ আমাদের হকিটা ছোট একটা জায়গায় আবদ্ধ হয়ে আছে। যার কারণে বের হতে পারছে না। আমাদের দেশের ক্রিকেট সাংগঠনিক দিক দিয়ে এগিয়ে আছে। বাইরের দেশের দিকে তাকানোর দরকার নেই। ফুটবলের পরেই হকি ছিল। তিন নম্বরে ছিল ক্রিকেট। সেখান থেকে এখন ফুটবল কোথায়, হকি কোথায় আর ক্রিকেট কোথায় চলে গেছে। তিন নম্বর থেকে এক নম্বরে চলে গেছে ক্রিকেট। এমন না যে রাতারাতি আলাদিনের চ্যারাকের জন্য হয়ে গেছে। বাংলাদেশের মানুষরাই এগিয়ে নিয়ে গেছে। সাংগঠনিক দিক দিয়ে ক্রিকেটকে অনুসরণ করলেও আমরা উন্নতি করতে পারি।

এসএনপিস্পোর্টস: অবকাঠামোগত দিক দিয়ে কি উন্নতি প্রয়োজন আরও?

অসীমঃ অবকাঠামোর দিক দিয়ে ঢাকার বাইরে আরও মাঠ প্রয়োজন। যেমন সিলেট, রাজশাহী, চট্টগ্রাম এই তিন জায়গায় একটা করে টার্ফ দরকার। ঢাকার বাইরে খেলাটা গেলে একটা পপুলারিটি কাজ করবে। মানুষ আরও উৎসাহী হবে।

এসএনপিস্পোর্টস: ফেডারেশন থেকে কি সব ধরনের সুবিধা পান?

অসীমঃ ফেডারেশন থেকে সুযোগ-সুবিধা বলতে আপনারা তো জানেনই সব। ক্রিকেট ব্যতিত অন্য কোনো ফেডারেশন খেলোয়াড়দের নিয়ে এতো চিন্তা করে না, সুযোগ-সুবিধা তো পরের কথা।

এসএনপিস্পোর্টস: আর্থিক দিক নিয়ে কি বলবেন?

অসীমঃ আর্থিক দিক বলতে গেলে এই মূহুর্তে একটা লিগ দরকার। অন্য কোনো খেলা নয়, লিগ দরকার। দুই বছর ধরে কোনো লিগ হচ্ছে না। খেলোয়াড়রা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। খেলোয়াড়রা একমাত্র লিগ থেকেই অর্থনৈথিকভাবে কিছুটা লাভবান হয়। তো করোনা পরিস্থিতির পরেই ফেডারেশনের কাছে খেলোয়াড়দের চাওয়া লিগ।

এসএনপিস্পোর্টস: হকিকে পূর্ণ পেশা হিসেবে নেওয়া যেতে পারে বলে মনে করেন?

অসীমঃ পুরো বিশ্বেই হকি এখনও পেশা হতে পারেনি। আন্তর্জাতিক কোনো চাপ নেই, ফেডারেশনের দায়বদ্ধতা নেই। কেউ যে জোর দিয়ে বলবে সেটা নেই। যেমন ফুটবলে আছে, প্রতিবছর প্রফেশনাল লিগ করতে হবে। ফিফা সেটা মনিটরিং করে। আমাদের হকিতে এমন কোনো মনিটরিং করার মতো কেউ নেই। কেউ যে পেশা হিসেবে নিবে, এই যেমন দুই বছর ধরে লিগ নেই তার আয়টা কিভাবে হবে? যার জন্য ভিন্ন কাজ করার পাশাপাশি হকিটা খেলে বেশিরভাগই।

এসএনপিস্পোর্টস: উঠতি খেলোয়াড়দের প্রতি আপনার কি বার্তা থাকবে?

অসীমঃ যারা হকিতে আছে তাদের জন্য বার্তা থাকবে খেলার পাশাপাশি যেন পড়াশোনাটাও ঠিক রাখে। কারণ পড়াশোনা না যদি না করতে পারে দেখা গেছে সবাই তো আর অসীম গোপ হতে পারবে না। এখন সে যদি হকি ভালো খেলতে পারতে উজ্জ্বল ভবিষ্যত তো আছেই, না হতে পারলেও পড়াশোনাটা কাজে লাগবে।

এসএনপিস্পোর্টস: দেশ বা দেশের বাইরে আপনি আইকন হিসেবে কাকে মানেন?

অসীমঃ জ্যাপ স্টকম্যান, নেদারল্যান্ডসের গোলরক্ষক।

এসএনপিস্পোর্টস: হকি ব্যতিত অন্য কোন খেলা এবং খেলোয়াড় সবচেয়ে পছন্দের?

অসীমঃ ফুটবল এবং ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো।

এসএনপিস্পোর্টস: জাতীয় দলের সবচেয়ে কাছের বন্ধু?

অসীমঃ শিতুল (ফরহাদ আহমেদ শিতুল, অধিনায়ক)।

এসএনপিস্পোর্টস: করোনা পরিস্থিতি নিয়ে কোনো বার্তা দিতে চান?

অসীমঃ বর্তমান সময়ে অতিরিক্ত প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে না বের হওয়াটাই ভালো। সামাজিক দূরত্ব মেনে চলতে হবে আমাদের। একই সাথে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।

এসএনপিস্পোর্টসটোয়েন্টিফোরডটকম/নিপ্র/সা/০০