আমাদেরও একজন ডব্লিউ. জি. গ্রেস ছিলেন

নাছিম মোহাম্মদ:: মোহাম্মদ রফিক, আব্দুর রাজ্জাক, হালের সাকিব আল হাসান, আরাফাত সানি, তাইজুল ইসলামরা বাঁহাতি স্পিনে অবিস্মরণীয় সাফল্যর্জন করেছেন, করছেনও। তাদের পথটা কি সহজ ছিলো? কার পথ মাড়িয়ে তাদের বাঁহাতি স্পিনে আসা? আমরা সেই খোঁজ কি রাখি? দেশের ক্রিকেটে বাঁহাতি স্পিনের গোড়াপত্তন কে করেছিলেন? ক্রিকেট নিয়ে যারা নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখেন, ক্রিকেট নিয়ে ভাবেন, তাঁরাই বলতে পারবেন এ প্রশ্নের। হাল প্রজন্মের অনেকেই হয়তো জানে না। তিনি ময়মনসিংহের রাম চাঁদ গোয়ালা। যিনি বয়সকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ঢাকা লিগে খেলেছেন ৫৩ বছর বয়স পর্যন্ত।

অথচ এই যুগের ক্রিকেট প্রেমীরা রাম চাঁদ গোয়ালার নাম শুনলে রীতিমতো অবাক হয়ে যায়। ৭০, ৮০ দশকের ঢাকাই ক্রিকেটের বড় বিজ্ঞাপন ছিলেন গোয়ালা দা। ”গোয়ালাদা”!!! রাম চাঁদ গোয়ালাকে সবাই ”গোয়ালাদা” বলেই ডাকতো।

মাত্র ১৪ বছর বয়সে ময়মনসিংহের লিগে খেলার সুযোগ হয়। গতি দিয়ে ব্যাটসম্যানদের পরাস্ত করা পেসারদের ভিড়ে বাঁহাতি স্পিন ভেল্কি সাথে নিয়ে ঢাকা লিগে আবির্ভাব। স্পিন জাদু দিয়ে নিজেকে স্পিন জাদুঘরের আসনে বসান তিনি। বাম হাতে বল ধরে স্পিন ভেল্কি দেখিয়ে সবাইকে মুগ্ধ করেন। স্পিন ঘূর্ণিতে পরাস্ত করেছেন কিংবদন্তী অর্জুনা রানাতুঙ্গা ও অরবিন্দ ডি সিলভাকে। তখন তার বয়সের ঘর পারি দিয়েছে ৫০’র কোটা।

‘বয়স গড়িয়েছে পারফর্মেন্সেও ভাটা পরেছে।’ রাম চাঁদ গোয়ালা দার বেলা এমনটা হয়নি। বয়স গড়িয়েছে পারফর্মেন্স জ্বলজ্বল করেই জ্বলেছে তার বেলায়। সাবেক ইংলিশ ‘কিংবদন্তী’ ক্রিকেটার স্যার উইলিয়াম গিলবার্ট গ্রেস(ডব্লিউ.জি.গ্রেস)এর নাম নিশ্চই শুনেছেন। যিনি বয়সকে তুরি মেরে উড়িয়ে ক্রিকেট খেলে ৫৫ হাজার রান আর আড়াই হাজারেরও বেশী উইকেট শিকার করেছিলেন। যার ৩২ বছর বয়সে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট ক্যারিয়ার শুরু। আন্তর্জাতিক অভিষেক ৪২ বছর বয়সে। ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত যিনি খেলেছিলেন প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট।

তাই নিঃসন্দেহে বলা যায় আমাদেরও একজন ডব্লিউ.জি.গ্রেস ছিলেন। যিনি খেলেছেন ভিক্টোরিয়া, মোহামেডান, টাউন ক্লাব, শান্তি নগরের হয়ে। আবাহনীর হয়ে টানা ১৫টি মৌসুম খেলে বল হাতে দ্যুতি ছড়িয়েছেন। ৪৩ বছর বয়সে বাংলাদেশের হয়ে আনঅফিসিয়াল ম্যাচে খেলার সুযোগ হয়। ক্যারিয়ারের মাঝে ৫ বছর খেলতে পারেননি। নানান সময় নানান ঝড়ঝাপটা পেরিয়েছেন তবুও নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়ে ক্রিকেটই খেলেছেন। ক্রিকেট ছিল তার ধ্যানজ্ঞান। এই ধ্যানজ্ঞানের ব্যস্ততায় নিজের জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়টাই শুরু করা হয়নি। ৯০ দশকের শেষের দিকে ক্রিকেটকে বিদায় জানান।

উত্তরসূরিদের পথপ্রদর্শকের ভুমিকা পালন করেন। সাইলেন্ট কিলার মাহমুদুল্লাহ রিয়াদও দীক্ষা নিয়েছেন গোয়ালার কাছ থেকে।
ময়মনসিংহের আরোও অনেক ক্রিকেটার তৈরিতে দারুন ভুমিকা পালন করেছেন। এই বুড়ো ক্রিকেটার খেলেছিলেন অল্প বয়সী ক্রিকেটারদের সঙ্গে আবার অনেক ক্রিকেটারের বাপ-চাচাদের সঙ্গেও।।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের বর্তমান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদিন নান্নু যখন পৃথিবীর আলোই দেখেননি তখন গোয়ালা সেরাদের কাঁতারে। আবার পরবর্তীতে মিনহাজুল আবেদিন নান্নু গোয়ালার সতীর্থ খেলোয়ার হিসেবে খেলেছেন একই সাথে। তার দেখানো পথেই হেঁটেছেন রফিক, রাজ্জাকরা। এখনো হাঁটছেন সাকিব, তাইজুলরা।

ভালোবেসে চোখ রাখতেন টেলিভিশনের পর্দায়। উত্তরসূরিদের খেলা পরখ করে দেখতেন। তাইতো বলেছিলেন সাকিব আল হাসানের মধ্যে নাকি উনার প্রতিচ্ছবি দেখতে পান। বাংলাদেশের ক্রিকেটের সর্বকালের সেরা বাঁহাতি স্পিনারদের একজন রাম চাঁদ গোয়ালা। আজ ১৯ জুন শুক্রবার ভোরে এই কিংবদন্তী অনেকটা নিরবেই নিজেকে নিয়ে রওনা হন পরকাল যাত্রায়। তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে দেশের ক্রিকেটের সর্বোচ্ছ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিসিবি।

রফিক-রাজ্জাকদের পথিকৃৎ রাম চাঁদ মানুষের গোয়ালাদা হয়ে স্মৃতির ঝাঁপিতে ঘুরে ভেড়াবেন। ইতিহাসের পাতায় অমলিন এক বুড়ো অমর ক্রিকেটার হয়েই থাকবেন। মাহমুদুল্লাহদের উত্তরসূরি হয়ে থাকবেন। তাদের পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবেন। রাম চাঁদ গোয়ালা একজন অনুপ্রেরণা। যিনি শিখিয়েছেন চলার পথে বয়স বাধা হয়ে দাড়াতে পারেনা। স্যালুট আপনাকে ‘গোয়ালাদা’।

এসএনপিস্পোর্টসটোয়েন্টিফোরডটকম/নিপ্র/০০