কীর্তিমানের ভুল!

আশিক উদ্দিন:: অনিন্দ্যসুন্দর ক্রিকেটের জন্মলগ্ন থেকে এযাবৎকাল, যেখানে অনেকেই অবিস্মরণীয় পারফর্ম করে এসেছেন। নিখাদ বিনোদনের খেলা ক্রিকেটে ব্যাটে-বলে জয় করে নিয়েছেন সাধারণ মানুষের মন। ভক্ত-সমর্থকদের প্রাণের স্পন্দনের সঙ্গে মিশে যান অনেকেই। সব ক্রিকেটারের ভাগ্যে এমন সুনাম, খ্যাতি জোটে না।এমন ক্রিকেটার একটি দেশে একই সময়ে খুব বেশি থাকেনও না। তাদের অনেকেই আবার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সমর্থকদের সেই অমূল্য ভালোবাসা ধরে রাখতে পারেননি। শেষ বিদায়ের আগ পর্যন্ত থাকতে পারেননি মানুষের হৃদয়ে। তাদের কিছু কিছু ভুল সিংহাসন থেকে নিচে নামিয়ে দেয়।

দক্ষিণ আফ্রিকার হ্যান্সি ক্রনিয়ে ঠিক তেমনই একজন ক্রিকেটার। যিনি নিজ দেশের পাশাপাশি বিশ্বের নানা প্রান্তের ক্রিকেট প্রেমীদের প্রাণের স্পন্দনে মিশে গিয়েছিলেন। সেই নব্বইয়ের দশকে প্রোটিয়া ক্রিকেটের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ছিলেন। ক্রিকেট বোঝার ক্ষমতা, মাঠের পারফরম্যান্স ও নেতৃত্বগুণে অল্প সময়েই হয়ে উঠেছিলেন সবার শ্রদ্ধেয় ও প্রিয় ক্রিকেটার এবং সফল অধিনায়ক। ইতিহাসের সফল, বীরোচিত এই বীর শেষ দিন পর্যন্ত তা ধরে রাখতে পারেননি। সমর্থকদের বিশ্বাস ভঙ্গের অপরাধ নিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন মর্মান্তিক এক দূর্ঘটনায়।

অথচ একসময় হ্যান্সি ক্রনিয়ে ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা অধিনায়ক ছিলেন, তার ছিল বিশ্বজোড়া সুনাম। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তিনি আর্থিক লোভের কাছে হার মেনেছিলেন। যার পরিণতি হয়েছিল নিষেধাজ্ঞা এবং পরবর্তী সময়ে বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু।

পুরো নাম ওয়েলস জোহান্স হ্যান্সি ক্রনিয়ে৷ জন্ম ব্লুমফন্টেইন শহরে ১৯৬৯ সালেের ২৫ সেপ্টেম্বরে। তার বাবা ইউয়ি ক্রনিয়ে ছিলেন প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেটার এবং ক্রিকেট ধারাভাষ্যকার। তাই হয়ত বলা যায় ক্রিকেটের নেশা তার রক্তেই ছিল। বাবা-মা’র তিন সন্তানের মধ্যে ক্রনিয়ে দ্বিতীয়। তিনি ছিলেন তার কলেজ ক্রিকেট এবং রাগবী দলের অধিনায়ক এবং দলের সেরা খেলোয়াড়ও বটে।

জন্মগতভাবে ক্রনিয়ে ছিলেন প্রতিভাবান একজন খেলোয়াড়। যার খেলাকে সঠিকভাবে বোঝার ক্ষমতা ছিল অসাধারণ৷ বালকসুলভ সুন্দর চেহারার অধিকারী, যাকে কারও কারও মতে বিবেচনা করা হয় দক্ষিণ আফ্রিকার সর্বকালের সেরা অধিনায়ক হিসেবে৷ কিন্তু, স্পোর্টসম্যানসুলভ আচরণের জন্য অনেকেই তাঁকে বলতেন “ক্রিকেটের বিবেক”। জীবনের এমন অর্জনকে তিনি ধরে রাখতে পারেননি। কীর্তিমান পুরুষ হয়ে পৃথিবীর বুক থেকে স্বর্গে যেতে পারেননি। পৃথিবী নামক গ্রহ থেকে তিনি বিদায় নিয়েছেন নিন্দিত হয়ে। অর্থের কাছে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। জীবনের এই একটি ভুল কীর্তিমানের অনেক অর্জনকে স্লান করে দিয়েছে। কলুষিত করে গেছেন অনেক অর্জনের বাইশ গজকে।

১৯৯২ সালে জাতীয় দলে অভিষেকের পর দুর্দান্ত সময় কাটাতে থাকেন ক্রনিয়ে। দলের নিয়মিত পারফর্মার বনে যাওয়া এই ক্রিকেটার এক সময় পান অধিনায়কের গুরুদায়িত্ব। অভিষেকের আগে স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেট লিগে সমানতালে পারফর্ম করা এই ক্রিকেটার প্রোটিয়া দলের অধিনায়কত্ব পাওয়া নিয়ে কিঞ্চিৎ মজার এক ঘটনা আছে। দক্ষিণ আফ্রিকার নিয়মিত অধিনায়ক কেপলার ওয়েসলেস অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের মাঝপথে চোট পান। তার চোটের কারণে ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক হিসাবে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১৯৯৩-৯৪ মৌসুমে সিডনিতে ঐ ম্যাচে দলকে ৫ রানে জিতিয়ে মাঠ ছাড়েন ক্রনিয়ে। তাও আবার উঠতি এবিডি ভিলিয়ার্সকে দিয়ে বল করিয়ে। ডি ভিলিয়ার্স ঐ ইনিংসে ৬ উইকেট শিকার করেন। ঐ ম্যাচের পরে তাঁকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল মূল অধিনায়কত্ব।

এর পরের কীর্তি সবারই জানা! বুদ্ধিদীপ্ত অধিনায়কদের মধ্যে ক্রনিয়ে ছিলেন অনেকের চেয়ে এগিয়ে। অধিনায়ক হিসেবে তার পরিসংখ্যান সে কথাই বলে। প্রোটিয়াদের ১৮টি টেস্ট সিরিজে নেতৃত্ব দিয়ে জয় পেয়েছেন ১৩টি সিরিজে, যার বিপরীতে পরাজয় মাত্র ৪টি সিরিজে। ওয়ানডেতে ১৩৮ ম্যাচে নেতৃত্ব দিয়ে ৯৯টি জয় এনে দিয়েছেন দলকে, পরাজিত হয়েছেন ৩৫ টি ম্যাচে। মাত্র ৮ বছরের ক্যারিয়ারে ক্রনিয়ে ৬৮টি টেস্ট ম্যাচে ৩৬.৪১ ব্যাটিং গড়ে ৩,৭১৪ রানের পাশাপাশি শিকার করেছেন ৪৩টি টেস্ট উইকেট। আর ১৮৮ টি ওয়ানডে ম্যাচে ৩৮.৬৪ ব্যাটিং গড়ে ৫,৫৬৫ রান করার পাশাপাশি শিকার করেছেন ১১৪ উইকেট।

ক্যারিয়ার অধঃপতনের আগে সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল ক্রনিয়ের। কিন্তু অর্থের লোভ সামলাতে পারলেন না ২০০০ সালে। সেই বছর ভারতের বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানে জেতা টেস্ট সিরিজেই ম্যাচ ফিক্সিং করেন তিনি। একই বছরে ম্যাচ ফিক্সিং প্রস্তাব দেন তৎকালীন ইংলিশ অধিনায়ক নাসের হোসাইনকেও! যেটি পাঁচ মাস পর জানা যায়। সেই ম্যাচে ফিক্সিং করার জন্য জুয়াড়িদের কাছ থেকে পাঁচ হাজার মার্কিন ডলার ও একটি দামি উপহার নেন ক্রনিয়ে। পুলিশী তদন্তের মুখে ওই বছর ১০ এপ্রিল সংবাদ সম্মেলনে অশ্রুসিক্ত চোখে নিজের সব দোষ স্বীকার করেন তিনি।

তবে ভারতের বিপক্ষে করা ক্রনিয়ের ফিক্সিং কেলেংকারি ধরা পড়ার ঘটনা ছিল বেশ রোমাঞ্চকর! তথ্যসূত্র বলছে, একটি অপহরণ ঘটনার তদন্ত করতে ফোনে আড়িপাতে দিল্লি পুলিশ। কিন্তু তারা ক্রনিয়ের ফোনের লাইন পেয়ে যায়। ফোনের ঘটনা শুনে হতভম্ব দিল্লি পুলিশ জানায়, ফোনের একপ্রান্তে ক্রনিয়ে এবং অপরপ্রান্তে এক জুয়াড়ি! ২০০০ সালে ঘটে যাওয়া ফিক্সিং কেলেংকারি স্বীকার করে নেন ক্রনিয়ে। পান নিষেধাজ্ঞা।

এরপর, ১ জুন ২০০২ সাল। এক বিমান দুর্ঘটনায় মারা যান ক্রনিয়ে। যদিও অনেকে মনে করেন, ম্যাচ পাতানো কেলেংকারির ব্যাপারে তার মুখ বন্ধ করতেই তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। সেই ধারণার পক্ষে শক্তিশালী যুক্তিও রয়েছে। যে বিমান দুর্ঘটনায় তিনি মারা যান, তার সেদিন সেই বিমানেই থাকার কথা ছিল না। নির্ধারিত বিমান মিস করায় তিনি সেই বিমানে ওঠেন। সেই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানোর ব্যাপারটি এখনো প্রশ্ন তোলে সন্দেহ প্রবণ ক্রিকেটপ্রেমীদের অন্তরে। কারণ বিমানটি ছিল মালবাহী, আর সেখানে পাইলট আর ক্রনিয়ে ছাড়া কোন যাত্রী ছিল না!

এসএনপিস্পোর্টসটোয়েন্টিফোরডটকম/নিপ্র/০০