কোচের সুনজরে না থাকতে পারলে জাতীয় দলের একাদশে জায়গা নেই!

otete-lekokতানজীল শাহরিয়ার অলী:: অনেক আলোচনা-সমালোচনার পরে দলে ফিরলেন মুমিনুল হক। তবে যেভাবে ফিরলেন তা কোনোভাবেই প্রশংসা করবার মতো নয়। মুমিনুল কে নিয়ে এই কদর্য কাণ্ড দেখিয়ে দিলো দেশের ক্রিকেট আর একজন ‘যোগ্য’ ক্রিকেটারের আশা-ভরসার জায়গাগুলো কেমন ঠুনকো, মেকি এবং ছল-চাতুরিতে ভরা।

মোসাদ্দেক কে বাদ দিয়ে মুমিনুল কে দলে নেয়া হয়েছে। এই মোসাদ্দেক যে চোখের সমস্যায় ভুগছেন, ম্যাচের আদলে হওয়া অনুশীলনে ফিল্ডিং করতে পারেননি। এরপর ডাক্তারি পরীক্ষায় চোখের যে সমস্যা ধরা পড়েছে তাতে সর্বনিম্ন তিন মাস সময়ের মধ্যে তাঁর আর ফেরার সম্ভাবনা ছিলো না। এরপরেও মোসাদ্দেক কে দলে রাখা হয়। আর এই ন্যাক্কারজনক, অত্যন্ত অপেশাদার, এবং শিশুতোষ সিদ্ধান্তের মূল হোতা কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে।

মোসাদ্দেক কে কোনোভাবেই টেস্ট সিরিজে পাওয়া যাচ্ছে না এরপরেও স্কোয়াডে রেখে দল ঘোষনা করা হয়েছে। কারণ, কোচ চাননি মুমিoli-biনুল দলে জায়গা পান! ভাবা যায় একজন মানুষের মনে কী রকম বিদ্বেষ থাকলে দেশের টেস্ট ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা ব্যাটিং গড়ের একজন ব্যাটসম্যানকে এভাবে ছুঁড়ে ফেলা যায়। স্বেচ্ছাচারী আচরণের নগ্ন প্রকাশ এভাবে মুমিনুল কে বাদ দেয়া। নিজের একগুঁয়েমি জেদের বশবর্তী হয়ে দেশের অন্যতম সেরা প্রতিভাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়া হলো।

কোচ তো ভিনদেশি। তিনি তাঁর জেদ বা ব্যক্তিগত অপছন্দের কারণে মুমিনুল কে বাদ দিয়ে দিলেন। কিন্তু, নির্বাচক কমিটি কীভাবে কোচের এমন যুক্তিহীন এবং স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে দল ঘোষনা করলেন? নির্বাচক কমিটির প্রধান যিনি নিজেও ১৯৯৯ ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে বাদ পড়েছিলেন অন্যায্যভাবে। সাংবাদ মাধ্যমের জোরালো ভূমিকায় তিনি বিশ্বকাপের স্কোয়াডে ডাক পেয়েছিলেন। তিনি কীভাবে মুমিনুলের প্রতি এমন অন্যায্য আচরণ কে মেনে নিলেন? তিনি তো অনুভব করতে পারতেন মুমিনুলের বেদনা। দেশের সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমিদের প্রত্যাশা। মুমিনুল ভিনদেশি কোচের কাছ থেকে অবজ্ঞার শিকার হয়েছেন। নির্বাচক কমিটির কাছ থেকেও পাননি ন্যায্য সিদ্ধান্ত।

এতোকিছুর পরেও কি কোনো খড়কুটোর আশায় ছিলেন না তিনি? শ্রীলঙ্কা সফরেই কোচের বিরাগভাজন হয়ে টেস্ট থেকে বাদ পড়েন মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ। তাঁকে এমনকি দেশেই ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়ে যায়। যার স্পষ্ট বার্তা রিয়াদ দল থেকে বাদ, শুধু টেস্ট নয়, একদিনের সিরিজেও থাকবেন না। এমন ঘোরতর অন্যায় সিদ্ধান্তের কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন ওডিআই এবং টি২০(এখন সাবেক) অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা। রিয়াদ কে দেশে পাঠানোর সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বলেছিলেন তিনিই আর লঙ্কায় যাবেন না। বোর্ড থেকে সিদ্ধান্ত পালটে রিয়াদ কে দলের সাথেই রাখা হয়। সেই রিয়াদ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে সাকিব কে সঙ্গী করে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয়ে বিশাল অবদান রেখেছেন। ব্যাট হাতে দলে রাখার প্রতিদান দিয়েছিলেন।

কিন্তু, মুমিনুল হক এর জন্যে এমন কোনো দাবি ওঠেনি টেস্ট অধিনায়কের পক্ষ থেকে! দেশের ইতিহাসের অন্যতম সেরা টেস্ট পারফর্মার কে দলে রাখতে প্রত্যক্ষ কোনো ভূমিকা দেখা যায়নি টেস্ট অধিনায়কের। আশার শেষ প্রদীপটিও মুমিনুল নীরবে ক্ষয়ে ক্ষয়ে যেতে দেখেছেন এভাবেই।

একজন ক্রিকেটারের জন্যে দেশের সংবাদ মাধ্যম ছাড়া আর কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে সোচ্চার হয়নি। একজন পারফর্মারকে শুধুমাত্র একজন ব্যক্তির অপেশাদার সিদ্ধান্তের শিকার হতে হলো। সেই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ কেউ করলেন না! কেউ এই অন্যায় সিদ্ধান্তের বিপক্ষে দাঁড়ালেন না! এ যে কী রকম ভয়ঙ্কর বার্তা ক্রিকেটারদের জন্যে তা হয়ত এখনো অনেকেই বুঝে উঠতে পারছেন না। একজন পারফর্মার কে একজোট হয়ে যখন এভাবে কোণঠাসা করে ফেলা হয়। তখন তাঁর ভেতরের আত্মবিশ্বাস ভেঙ্গে খান খান হয়ে যায়। এটুকু বোঝার ক্ষমতা কর্তাব্যক্তিদের নিশ্চয়ই আছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ যে বার্তা এই ঘটনার মাধ্যমে প্রকাশ পেলো তা হচ্ছে কোচের সুনজরে না থাকতে পারলে জাতীয় দলে জায়গা পাওয়াটা প্রায় অসম্ভব। কোন কারণে স্কোয়াডে জায়গা পেলেও একাদশে জায়গা পাওয়া হয়তো হবে না। আজই সেটা হয়তো দেখা যাবে। এরই মধ্যে কথা শুনা যাচ্ছে মুমিনুলের জায়গা হবে না একাদশে। সেই অসম্ভব ভাগ্যের জোরে সম্ভব হয়েছে, মুমিনুল দলে ফিরেছেন। কিন্তু, তাতে আশা নেই, আশঙ্কা আছে। কোচের আতসী কাঁচের নিচে থাকা মুমিনুল কি পারবেন স্বাভাবিকভাবে মাঠে নামতে? পারবেন আগের মতো পারফর্ম করতে? এমন হিমালয়সম চাপ নিয়ে কারো পক্ষে কি নিজের সেরাটা দেয়া সম্ভব?

একজন মুমিনুল হক কে এমনই অবস্থায় ঠেলে দেয়া হয়েছে যে, শুধু মাঠেই নয়, মাঠের বাইরে সারাক্ষণ তাঁর মনের ভেতর বিভিন্ন ধরণের দ্বন্দ-যুদ্ধ চলতে থাকবে। প্রতিপক্ষ কে সামাল দেবার জন্যে নিবিড়ভাবে যার প্রস্তুত হবার কথা ছিলো। তাঁকে ঘরের শত্রু বিভীষনকে সামাল দেয়ার ছক কষতে হবে।

এই অশোভন কাণ্ডের পরে কোনোভাবেই মুমিনুলের চেনা জগত আগের মতো থাকবে না। চেনা মুমিনুল কে ফিরে পাবার আশাও বেশ কঠিন। বিষয়গুলো কি এই অন্যায্য সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িত সকলে বুঝতে পারছেন?

লেখক: ক্রীড়া লেখক।

(এসএনপিস্পোর্টস২৪ডটকম সব সময়ই লেখকের প্রতি আন্তরিক ও শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখাটি লেখকের একান্তই নিজস্ব। লেখকের মতামতের সঙ্গে আমাদের সম্পাদকীয় নীতির মিল নাও থাকতে পারে।)

এসএনপিস্পোর্টসটোয়েন্টিফোরডটকম/নিপ্র/অলে/০০