ক্রীড়াঙ্গনে বছর জুড়ে শোকের মাতম

সাগর রায়ঃ মৃত্যু মানে কি? মৃত্যু মানেই কেবলই একটা প্রাণ স্পন্দনের ইতি, একটা শরীরের সমাধি। কিন্তু, কোনোভাবেই একটা সম্পর্কের শেষ নয়। লেখাটি যাদের নিয়ে লেখা, সেই সব ব্যক্তিত্বরাও এর বাইরে কিংবা ব্যতিক্রম নন। তবে ২০২০ সালটা সম্ভবত অধিকাংশ মানুষই ভুলে যেতে চাইবেন। কেননা বছরজুড়েই যে কেবল শোকের মাতমই ছিল শুধু। অনেকগুলো হৃৎস্পন্দন স্তব্ধ হয়ে পাড়ি জমিয়েছে ঐ দূর তারার দেশে।

বাস্কেটবল কিংবদন্তি কোবি ব্রায়ান্ট থেকে ফুটবল কিংবদন্তি ডিয়েগো ম্যারাডোনা-পাওলো রসি কিংবা ক্রিকেটের কিংবদন্তি স্যার এভারটন উইকস-ডিন জোন্স কারা ছিলেন না সেই তালিকায়! দেশের ফুটবলের দুই নক্ষত্র নওশেরুজ্জামান-বাদল রায়, ক্রিকেটের রামচাঁদ গোয়ালা সবাইকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেছেন এই অভিশপ্ত বছরেই। বছরের শুরু থেকে শেষ বিশ্বের কোটি ক্রীড়াপ্রেমীদের চোখের কোনে জল জমেছে সেসব বিমর্ষ সংবাদে।

বছরের শুরুতে ভারতের সাবেক অলরাউন্ডার বাপু নাদকার্নি না ফেরার মৃত্যু নাড়া দিয়েছিল। ৮৬ বছর বয়সে বার্ধক্যজনিত রোগে ১৭ জানুয়ারি মুম্বাইয়ে এই ক্রিকেটার না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্টে টানা ২১ ওভার মেডেন নিয়ে বিশ্বরেকর্ড গড়ার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন নাদকার্নি।

নাদকার্দির মৃত্যু শোক কাটতে না কাটতেই বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গন শোকে মূর্ছমান হয় কোবি ব্রায়ান্টের প্রয়াণে। ১৩ বছরের কন্যা জিজি ব্রায়ান্টসহ ২৬ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় এক হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় নিহত হন ৪১ বছরের কোবি ব্রায়ান্ট। বাস্কেটবলে পাঁচবার এনবিও চ্যাম্পিয়নশিপ, দুই বারের অলিম্পিক স্বর্ণপদকজয়ী ও ১৮ বার ছিলেন অলস্টার দলের এই সদস্যের মৃত্যুর রেশ থেকে যায় অনেক দিন।

১৬ ফেব্রুয়ারি না ফেরার দেশে পাড়ি জমান ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সাবেক গোলরক্ষক হ্যারি গ্রেগ। ৮৭ বছর বয়সে উত্তর আয়ারল্যান্ডের এই ফুটবলার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ১৯৫৮ সালে ইউরোপিয়ান কাপে (বর্তমান চ্যাম্পিয়ন্স লিগ) রেড স্টার বেলগ্রেডের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে ইংল্যান্ডে ফেরার পথে জার্মানির মিউনিখে এক বিমান দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মারা যান ২৩ ফুটবলার ও কর্মকর্তা। কিন্তু হ্যারি বেঁচে যান সৌভাগ্যক্রমে। তবে আহত অবস্থাতেই সতীর্থদের উদ্ধারে নেমে পড়েন।

ভারতের ফুটবল কিংবদন্তি প্রদীপ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ওরফে পিকে ব্যানার্জির প্রয়াণের খবর আসে ২০ মার্চ। নিউমোনিয়ায় কলকাতা হাসপাতালে ৮৩ বছর বয়সে কয়েক সপ্তাহ মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে, শেষ পর্যন্ত হার মানেন তিনি। ১৯৬২ সালে এশিয়ান গেমসে স্বর্ণপদক জয়ে পিকে ব্যানার্জি ছিলেন দুর্দান্ত। ভারতীয় ফুটবলের স্বর্ণযুগের অন্যতম সারথি বলা হয় তাঁকে।

ক্রিকেটে ডাকওয়ার্থ লুইস পদ্ধতির জনক লুইস পদ্ধতির যৌথ উদ্ভাবকের একজন ছিলেন টনি লুইস। যিনি ১ এপ্রিল ৭৮ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচে গাণিতিক হিসেবের জন্য গণিতবিদ ফ্রাঙ্ক ডাকওয়ার্থকে সাথে নিয়ে ডাকওয়ার্থ লুইস পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন টনি লুইস। এর একদিন পরই ২ এপ্রিল রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক কিংবদন্তি ডিফেন্ডার গোয়ো বেনিতো পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। রিয়াল মাদ্রিদের ৪২০টি ম্যাচ খেলেছেন তিনি। একই মাসের ২৪ এপ্রিল ক্যান্সারের সাথে পেরে না উঠে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অলরাউন্ডার গ্রায়েম ওয়াটসন ৭৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

২৫ মে ভারতের হকি কিংবদন্তি বলবীর সিং মৃত্যুবরণ করেন ৯৬ বছর বয়সে। ভারতের হয়ে তিনবার অলিম্পিক স্বর্ণ জিতেছেন বলবীর। অলিম্পিকের ফাইনালে সর্বোচ্চ গোল করার রেকর্ড এখনও তার দখলে।

১৯ জুন দেশের ক্রিকেটে শোক নেমে আসে সাবেক ক্রিকেটার রামচাঁদ গোয়ালার প্রয়াণের সংবাদে। ৭৯ বছর বয়সে এই কিংবদন্তি না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। নিজের সময়ে ঢাকার ক্রিকেটে একচ্ছিত্র আধিপত্য দেখিয়েছিলেন তিনি। ১ জুলাই ক্যারিবিয়ান কিংবদন্তি স্যার এভারটন উইকস ৯৫ বছর বয়সে পাড়ি জমান না ফেরার দেশে। টেস্ট ক্রিকেট ইতিহাসে একমাত্র ব্যাটসম্যান হিসেবে টানা পাঁচ ইনিংসে সেঞ্চুরি করার রেকর্ডটি তার দখলেই।

২১ সেপ্টেম্বর স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সদস্য নওশেরুজ্জামান শেষ নিশ্বাঃস ত্যাগ করেন। করোনাভাইরাসের হার মেনে ৭০ বছর বয়সেই দেশের ফুটবলের এই তারকার প্রয়াণ ঘটে। বেশ কয়েকদিন লাইফ সাপোর্টেও ছিলেন তিনি। দিন তিনেক পরই ক্রিকেট বিশ্বে শোকের ছোঁয়া লাগে। ২৪ সেপ্টেম্বর ভারতের মুম্বাইয়ে আইপিএলে স্টার স্পোর্টসের হয়ে কাজ করতে গিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক কিংবদন্তি ক্রিকেটার, কোচ ও জনপ্রিয় ধারাভাষ্যকার ডিন জোন্স।

১৪ অক্টোবর নিউজিল্যান্ডের সবচেয়ে বয়স্ক টেস্ট ক্রিকেটার জন রিড কোলন ক্যান্সারে ভোগে ৯২ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। কিউইদের সাবেক অধিনায়ক ও অলরাউন্ডারের হাত ধরেই প্রথম টেস্ট জয় এসেছিল। ২২ নভেম্বর দেশের ফুটবল শোকে মূর্চ্ছমান হয়। বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক তারকা ও বাফুফের সাবেক সহ-সভাপতি বাদল চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৬৩ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

২৫ নভেম্বর থেকে পুরো ক্রীড়াঙ্গনকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল একটি সংবাদ। আর সেটি হলো ফুটবল ঈশ্বর খ্যাত ডিয়েগো ম্যারাডোনার মৃত্যু। মাত্র ৬০ বছর বয়সেই আর্জেন্টিনার এই বিশ্বকাপজয়ী ফুটবলার কোটি ভক্তকে কাঁদিয়ে পাড়ি জমান না ফেরার দেশে।

দিন সাতেক পরই ২৯ নভেম্বর সেনেগালের বিশ্বকাপ হিরো পাপা বোউবা দিওপ মাত্র ৪২ বছর বয়সে অসুস্থ অবস্থায় পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। ২০০২ ফুটবল বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম আসরেই সবাইকে চমকে দিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল সেনেগাল। গ্রুপ পর্বে সেসময়কার বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে বিদায় করে দিয়েছিল দলটি। আর অবদান ছিল দিওপের।

পরের মাসেও ফুটবল বিশ্বে দুঃসংবাদ পিছু ছাড়ে নি। ৮ ডিসেম্বর আর্জেন্টিনার ফুটবলার ও কোচ আলেহান্দ্রো সাবেয়া না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। ২০১৪ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তোলার এই মাস্টারমাইন্ড ৬৬ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ঠিক একদিন পরই ৯ ডিসেম্বর ইতালির ১৯৮২ বিশ্বকাপ জয়ের কারিগর পাওলো রসি মৃত্যুবরণ করেন। ৬৪ বছর বয়সে না ফেরার দেশে চলে যান এই কিংবদন্তি। অথচ জেলে থেকে বেরিয়ে এসে বিশ্বকাপ খেলতে হয়েছিল তাঁকে। এক বিশ্বকাপেই জিরো থেকে হিরো বনে গিয়েছিলেন তিনি।

বছর শেষদিকে এসে ১৪ ডিসেম্বর না ফেরার দেশে পাড়ি দেন লিভারপুলের সাবেক কোচ জেরার্ড হুলিয়ের। এই ফরাসি তারকা অলরেডসদেরকে পাঁচটি মেজর ট্রফি এনে দেন। ২০০০-০১ মৌসুমে তার অধীনেই ট্রেবল জিতেছিল লিভারপুল। এর বাইরেও আরও অনেক ক্রিকেটার-ফুটবলারসহ অন্যান্য ক্রীড়ার সঙ্গে জড়িতদের প্রয়াণ সংবাদ এসেছে।

এসএনপিস্পোর্টসটোয়েন্টিফোরডটকম/নিপ্র/সা