চেতন সাকারিয়াঃ অন্ধকার থেকে আলোর মঞ্চে

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ আইপিএল। ক্রিকেট দুনিয়ার সবথেকে জমজমাট এক ইভেন্ট। রাতারাতি তারকা বনে গেছেন এমন একাধিক ক্রিকেটার আছেন এই মঞ্চে খেলে। কাড়াকাড়ি টাকার ঝনঝনানির এই আইপিএল ভারতীয়দের স্বপ্নপূরণের অন্যতম মাধ্যম এখন। যেখানে কিছু গল্প অনেক অসাধারণ! যেমন ধরা যাক রাজস্থান রয়্যালসের হয়ে খেলা চেতন সাকারিয়ার গল্প।

ভারতের রাজকোট শহর থেকে ১৮০ কিলোমিটার দূরে ভারতেজ নামের এক অঞ্চলে জন্ম সাকারিয়ার। ২৮শে ফেব্রুয়ারি ১৯৯৮’র পৃথিবীর মুখ দেখা সাকারিয়ার উত্থান যেন রূপকথার গল্পের মতো। ঘাত প্রতিঘাতে ভরা জীবন। ক্রিকেটকে আঁকড়েই যাবতীয় স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্নে পাড়ি দিতে একের পর এক কঠিন পরিস্থিতি সামলেছেন। ক্রিকেটের সরঞ্জাম কিনে দেওয়ার ক্ষমতা ছিল না তার বাবার।

ক্রিকেট শেখার নেশায় মগ্ন সাকারিয়া ব্যাটসম্যান হতে চেয়েছিলেন শুরুতে, কিন্তু স্কুলে থাকতে ব্যাটসম্যানদের কদর নেই দেখে সিদ্ধান্ত বদলে হয়ে যান পেস বোলার। তবে ১৬ বছর পর্যন্ত মেলেনি ক্রিকেটের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। নিজে থেকেই বিভিন্ন কৌশল আয়ত্ব করে বোলিং করে যেতে থাকেন তিনি। দশ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে স্থানীয় এক ক্রিকেট কোচিং ক্যাম্পে অনুশীলনে যেতেন সাকারিয়া। ফিরে এসে বাবার সাথে কাজে সাহায্য করতে হত তাকে। অভাব-অনটনের সংসারে তার বাবার পেশা ছিল অটো চালক। ক্রিকেট শিখে নিত্যদিনে সাকারিয়ার রুটিন ছিল বাবার সঙ্গে নানা জায়গায় যাওয়া।

ছোটোবেলা থেকে সাকারিয়া এবং তার পরিবারের বন্ধুত্ব ছিল দারিদ্রের সঙ্গে। কিন্তু তিনি নিজের স্বপ্নের রাস্তা থেকে কখনও সরে আসেন নি। নিজেকে ক্রিকেটার তৈরিতে সময় দিচ্ছেন, আবার বাবার সাথে কাজে সাহায্য করছেন। যেখানে ক্রিকেট শিখছেন সেখানে আবার ছিল না আধুনিক সব সুবিধা। সঠিক নিয়মে অনুশীলন না হওয়াতে একবার চোটে পড়েন সাকারিয়া। কার কারণে দীর্ঘ এক বছর মাঠের বাইরে থাকতে হয় তাকে। এরপর তার গল্প বদলাতে থাকে। এমআরএফ পেস বোলিং ফাউন্ডেশনে অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি পেসার গ্লেন ম্যাকগ্রার কাছ থেকে শেখার সুযোগ মেলে তার।

সাকারিয়ার পরিবারের অর্থাভাবের মধ্যে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তার এক আত্মীয়। ক্রিকেটের খরচ, পড়াশোনার খরচ সব কিছু বহন করেছেন যিনি। যেখানেও ছিল বিনিময়- অর্থাৎ যিনি সাকারিয়াকে আর্থিক সহযোগিতা করতেন, তার ব্যবসাকাজে সময় দিতে হত সাকারিয়াকে। স্কুল পড়ুয়া অবস্থায় সৌরাষ্ট্রের অনূর্ধ্ব-১৬ দলে সুযোগ পান তিনি। তারপর এমআরএফ পেস ফাউন্ডেশনের নজরে আসেন তিনি। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয় নি সাকারিয়াকে। রাজ্যের বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দলে খেলে নাম কুড়িয়েছেন। এরপর ডাক আসে সিনিয়র দলে। রঞ্জিতে প্রথম ম্যাচেই নেন ৫ উইকেট। ক্রিকেট ক্যারিয়ার উজ্জ্বল হতে লাগল তার। অন্যদিকে পারিবারিক জীবনে আসে বিপর্যয়। বাবা আগে চালাতেন অটো, এরপর ট্রাক চালানোতে নাম লেখান। মাঝে মুখোমুখি হন সড়ক দুর্ঘটনার। এরপর থেকে তিনি পঙ্গু।

সৌরাষ্ট্রের হয়ে রঞ্জিতে অভিষিক্ত সাকারিয়া খেলেছেন সৈয়দ মুশতাক আলী ট্রফিতে। গত জানুয়ারিতে তিনি তখন খেলায় বুঁদ। তখন অনেক বড় বিপর্যয়ে পড়ে সাকারিয়ার পরিবার। তার ছোট ভাই অজ্ঞাত কারণে বেছে নেয় আত্মহত্যার পথ। ‘অ্যারাউন্ড দ্য উইকেট’ নামের এক পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে সাকারিয়ার মা তাদের পারিবারিক দুঃখের কথা এভাবে বলছিলেন, ‘আমরা যেমন কষ্টের দিন কাটিয়েছি, আশা করব কাউকে যেন তা কাটাতে না হয়। সাকারিয়ার চেয়ে যে এক বছরের ছোট ছিল, আমার মেজ ছেলে, সে মাসখানেক আগে আত্মহত্যা করে। চেতন তখন সৈয়দ মুশতাক আলী ট্রফি খেলছিল। আমরা চেতনকে ওর ভাইয়ের মৃত্যুর খবরটা জানাইনি। জানালে ওর খেলায় খারাপ প্রভাব পড়তে পারতো। ১০ দিন ওকে ভাইয়ের মৃত্যুর সংবাদ দিইনি আমরা। ওকে শুধু বলেছিলাম, ওর বাবার শরীর খারাপ।’

সাকারিয়ার মা আরও বলেন, ‘সে সময় ও যখনই ফোন করতো, ওর বাবার সম্পর্কে জানতে চাইতো। ওকে বাবার সঙ্গে কথা বলতে দিইনি। কারণ, তিনি কথা লুকিয়ে রাখতে পারবেন না, বলে দেবেন যে তার ভাই মারা গেছে। ও যখন ওর ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে চাইতো, তখন আমি প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলতাম। কিন্তু এক দিন আমি আর সত্য লুকিয়ে রাখতে পারিনি। কাঁদতে কাঁদতে ওর ভাইয়ের মৃত্যুর খবর দিই। ও এক সপ্তাহ আমাদের সঙ্গে কথা বলেনি, কিচ্ছু খায়নি। ওরা দুই ভাই অনেক ঘনিষ্ঠ ছিল।’

সাকারিয়ার ট্রাক ড্রাইভার বাবাও সন্তানের মৃত্যুশোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি। অসুস্থ অবস্থায় বিছানায় শুয়ে শুয়েই চোখের জল ফেলেন তিনি। সাকারিয়ার মা বলেন, ‘ওদের বাবা ছিলেন ট্রাক ড্রাইভার। তিনটি সড়ক দুর্ঘটনায় তিনবার অস্ত্রোপচার হয়েছে তার। এখন বিছানা থেকে উঠতে পারেন না। উনি এখন আর উপার্জন করতে পারেন না। উনি এখনও ছেলের মৃত্যুর শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি। কিচ্ছু খান না, কোনো কথা বলেন না।’

করোনার প্রকোপ কাটিয়ে গত জানুয়ারিতে ভারত আয়োজন করে সৈয়দ মুশতাক আলী ট্রফি। সেখানেই সাকারিয়া নজর কেড়েছেন আইপিএলের স্কাউটদের। ১ কোটি ২০ লাখ রুপিতে জায়গা করে নিয়েছেন রাজস্থানে। নিজের আইপিএল অভিষেকটাএ রাঙ্গিয়ে রাখলেন বাঁহাতি এই পেসার। পাঞ্জাব কিংসের বিপক্ষে ম্যাচে চার ওভার বল করে মাত্র ৩১ রান দিয়ে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নিয়েছিলেন তিনি। সেই সঙ্গে দুর্দান্ত ফিল্ডিংও করেছেন এক সময় টাকার অভাবে জুতো কিনতে না পারা সাকারিয়া। অভাবে খেয়ে না খেয়ে থাকা ছেলেটাও আজ কোটিপতি হয়েছে শুধুমাত্র তার তপস্যা আর প্রতিভা দেখিয়ে।

এসএনপিস্পোর্টসটোয়েন্টিফোরডটকম/নিপ্র/১১০