জাতীয় দল-বিপিএল, নড়বড়ে হচ্ছে রাহীর অবস্থান

সাগর রায়: পেসার আবু জায়েদ চৌধুরী রাহী! ঘরোয়া ক্রিকেট আলো ছড়িয়ে জায়গা করেছেন জাতীয় দলে। দেশের জার্সিতে তিন ফরম্যাটেই হয়েছে অভিষেক। তবে সাদা পোশাকে যতটা পোক্ত হতে পেরেছেন, রঙিন পোশাকে সেটার কাছে যেতে পারেননি। টেস্টে দেশীয় পেসারদের নিয়ে যে সংস্কৃতি, সেখানটায় মন্দের ভালো হয়ে এসেছিলেন রাহী।

ক্রিকেটের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ফরম্যাটে ১৩ ম্যাচ খেলে ১৮ ইনিংসে বল করার সুযোগ পেয়ে শিকার করেছেন ৩০ উইকেট। ইকোনোমি ৩.৪১ ও বোলিং গড় ৩৭.২৬। এক ইনিংসে সেরা বোলিং ফিগার ৭১ রান দিয়ে ৪ উইকেট। আর ম্যাচের দুই ইনিংস মিলিয়ে সেরা বোলিং ফিগার ১৩০ রানে ৬ উইকেট। কখনো ৫ উইকেট পাননি। তিন বার পেয়েছেন ৪ উইকেট করে।

তেমন কোনো আহামরী ক্যারিয়ার নয় মোটেও। বিশেষ করে ইকোনোমি মানানসই নয় খুব একটা। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিচারে ভালোই বলা চলে অনেকটা। দেশের স্পিন নির্ভরতার মাঝে নিজেকে আলোচনায় রেখেছিলেন অনেকটা। জাতীয় দলের একাদশেও হয়ে উঠেছিলেন এক প্রকার নিয়মিত। বোলিংয়ে তার মূল বৈচিত্র্য সুইং। যেটা দিয়েই সকলের নজর কেড়েছেন। কেউ কেউ তো আবার তার মাঝে ইংলিশ তারকা জেমস অ্যান্ডারসনের ছায়াও দেখছিলেন!

কিন্তু অ্যান্ডারসন যেভাবে আলো ছড়িয়ে যান, সেভাবে তো আর পেরে উঠছেন না রাহী। হঠাৎ করে সবকিছুই যেন মলিন হতে শুরু করেছে তার ক্যারিয়ারে। গেল বছরের শেষ দিকে পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে ঢাকায় হওয়া দ্বিতীয় ম্যাচে বাদ পড়েছেন একাদশ থেকে। বাদ পড়ার আগে চট্টগ্রাম টেস্টে ভালো বোলিং করতে পারেননি অবশ্য। দুই ইনিংস মিলিয়ে ১৬ ওভার বল করে ৬৪ রান খরচায় ছিলেন উইকটশূন্য। হয়েছিল সমালোচনাও। চট্টগ্রাম টেস্টের আগে জিম্বাবুয়ের হারারেতে সর্বশেষ যে টেস্টে খেলেছিল বাংলাদেশ, সেখানেও একাদশে জায়গা হয়নি তার। একমাত্র পেসার হিসেবে খেলানো হয়েছিল এবাদতকে।

রাহীর একাদশ থেকে বাদ পড়ার ক্ষত তিক্ত হয় সম্প্রতি হয়ে যাওয়া বিপিএল প্লেয়ার্স ড্রাফটে। কেননা টুর্নামেন্টের অন্যতম সফল বোলার হয়েও দল পাননি তিনি। জাতীয় দলের পেসারের দল না পাওয়া অবাক করেছে বেশ। ছয় দলের মধ্যে নিজ শহরের দল সিলেটসহ পাঁচটি ফ্র্যাঞ্চাইজি তো নেয়নি, এমনকি দলে নেয়নি বিসিবির মালিকাধীন ঢাকাও।

যে দলের ড্রাফট টেবিলে ছিলেন কিনা জাতীয় দলের ওয়ানডে অধিনায়ক তামিম ইকবাল, টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, নির্বাচক হাবিবুল বাশার সুমন এবং অপারেশন্স বিভাগের কর্মকর্তা ও সাবেক ক্রিকেটার শাহরিয়ার নাফীসরা। ড্রাফটের বাইরে থেকেও এখন পর্যন্ত তাকে কোনো দলে ভেড়ানোর খবর মেলেনি।

এখন পর্যন্ত বিপিএলে ৫৩টি ম্যাচ খেলেছেন রাহী। যেখানে ৮.১৮ ইকোনোমি রেটে শিকার করেছেন ৫৭ উইকেট। টুর্নামেন্টের দশম সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি তিনি। আর পেসারদের মধ্যে সপ্তম। ২০১৭ বিপিএলটা কাটিয়েছেন বেশ ভালো। খুলনা টাইটান্সের হয়ে সেবার ১২ ম্যাচে ১৮ উইকেট নিয়েছিলেন। তবে ইকোনোমি খুব একটা ভালো ছিল না, প্রায় ৯ ছুঁইছুঁই। টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি ছিলেন সেবার। সাকিব ২২ উইকেট নিয়ে ছিলেন শীর্ষে।

তবে ঘরোয়া ক্রিকেটে সাম্প্রতিক সময়ে টি-টোয়েন্টিতে রাহীর অবস্থান ভালো নেই খুব একটা। স্বীকৃত টি-টোয়েন্টি বলতে সবশেষ খেলেছেন ২০২১ সালের জুনে ডিপিএলে। যেখানে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারির তালিকায় শীর্ষ ২৫’এও নাম নেই রাহীর। তালিকার ৩০ নম্বরে থাকা এই পেসার ১৫ ম্যাচে ১৪ ইনিংসে বল করে ১২ উইকেট শিকার করেছেন। ইকোনোমি রেট ৭.৬৮। মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে খেলেছিলেন সেই আসর।

জুনের পর ম্যাচ বলতে ঘরোয়া ক্রিকেটে দুটি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলেছেন। একটি ম্যাচে দুই ইনিংস মিলিয়ে ১ উইকেট করে মোট ২ উইকেট পেয়েছিলেন। এই ম্যাচে প্রথম ইনিংসে ৫ ওভারে ২৭ রান এবং দ্বিতীয় ইনিংসে ৬ ওভারে ১৬ রান দিয়েছিলেন। আরেক ম্যাচে এক ইনিংসে বল করে ১৩ ওভারে ৫ মেইডেনসহ ২৭ রান খরচায় ৪ উইকেট নিয়েছিলেন।

জাতীয় দল কিংবা ঘরোয়া ক্রিকেট, এসবের পর অনেকটা পরিষ্কার বিপিএলে দল না পাওয়ার ক্ষেত্রে ফ্র্যাঞ্চাইজিরা অতীতের চেয়ে বর্তমানের অবস্থানকেই যেন মূল্য দিয়েছেন বেশি! আর যদি সেটিই হয় তাহলে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠে রাহীর সাম্প্রতিক পারফর্মেন্সে কী আস্থা রাখতে পারছেন না তারা?

অবশ্য ফ্র্যাঞ্চাইজিদের একার ওপর প্রশ্ন তুলে লাভ কী, যেখানে জাতীয় দলই আস্থা রাখতে পারছে না রাহীর ওপর! দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ খেলতে বর্তমানে নিউজিল্যান্ড সফরে আছে বাংলাদেশ দল। সেখানে নতুন বছরের শুরুর দিনেই রাহীকে বেশ খানিকটা ধাক্কা দিয়েছে টিম ম্যানেজম্যান্ট। ২৮ বছর বয়সী এই ক্রিকেটারকে চমকপ্রদভাবে রাখা হয়নি প্রথম টেস্টের একাদশে।

অথচ প্রস্তুতি ম্যাচে এই রাহীকেই একাদশে খেলিয়েছিল তারা। পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট থেকে বাদ পড়া, বিপিএলে দল না পাওয়া সব কিছু মিলিয়ে যেন তেঁতে ছিলেন এই পেসার। যার জন্য তাসমান সাগর পাড়ে প্রস্তুতি ম্যাচে করেছেন অগ্নিঝরা বোলিংও।

নিউজিল্যান্ড একাদশের বিপক্ষে তাসকিনের সাথে জুটি বেঁধে নতুন বলে সাফল্য এনে দিয়েছিলেন। ম্যাচে বাংলাদেশ দলের হয়ে নিয়েছিলেন সর্বোচ্চ ৩ উইকেট। ইনজুরিফেরত যে কনওয়ে প্রথম দিন সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছে মাউন্ট মঙ্গানুইয়ের বে ওভালে, সেই ব্যাটার ডাক মেরে ফিরেছিলেন রাহীর বলে। অথচ জাতীয় দলের মূল ম্যাচের একাদশেই তাকে উপেক্ষা করা হলো।

নিউজিল্যান্ডের মতো কন্ডিশনে যেখানে তার সুইং দিয়ে সুবিধা আদায় করতে পারতো বাংলাদেশ, সেই সুযোগ খানিকটা যেন হেলায় হাতছাড়া করেছে টাইগারদের টিম ম্যানেজম্যান্ট! নতুন বলে তাসকিন-শরিফুল যে উড়ন্ত শুরু এনে দিয়েছিলেন বাংলাদেশকে, সেখানে রাহীর সুইং বৈচিত্র্য হতে পারতো আদর্শ। এর বাইরে অভিজ্ঞতায়ও বেশ এগিয়ে তিনি। নিউজিল্যান্ডের মাটিতে সব শেষ টেস্ট ম্যাচে খেলেও তিন উইকেট নিয়েছেন তিনি।

রাহীর পরিবর্তে একাদশে নেওয়া হয়েছে এবাদতকে। কিন্তু তাসকিন-শরিফুলরা যে রানের টুঁটি চেপে ধরেছিলেন নিউজিল্যান্ডের, সেখানে এবাদত গিয়ে সেটি ছেড়ে দিয়ে এসেছেন। পেস সহায়ক কন্ডিশন থাকলেও, নিউজিল্যান্ডকে রান করতে সহায়তা করে এসেছেন এবাদত। প্রথম ইনিংসে উইকেট পেলেও ওভার প্রতি রান দিয়েছেন ৪.১৬ করে। যেটা কিনা টেস্ট ক্রিকেটের জন্য অনেক বেশি। বোলিং ছিল একেবারেই নখদন্তহীন।

রাহীকে না খেলিয়ে এবাদতকে খেলানোর সঠিক ব্যাখ্যা আদৌও আছে কি টিম ম্যানেজম্যান্টের? টিম ম্যানেজম্যান্টের চেয়ে পেস বোলিং কোচ ওটিস গিবসনের নাম এখানে বললেই ভালো হবে। কেননা গুঞ্জন রয়েছে একমাত্র গিবসনের কারণেই একাদশে এবাদত। নিজ পছন্দের শিষ্যকেই সুযোগটা বেশি দিতে চান তিনি! তবে গিবসনের এই স্বাধীনতার জন্য দায় এড়াতে পারেন না ম্যানেজম্যান্টে থাকা বাকি সদস্যরাও।

বর্তমানে সময়টা যে রাহীর ভালো যাচ্ছে না, তা স্পষ্টই। পরপর দুই তিক্ত অভিজ্ঞতার পর এবার নতুন করে তিক্ততা ধরা দিল সিলেটের এই পেসারের। তাসকিন-শরিফুলদের উজ্জ্বলতার ভিড়ে এমনিতেই অনেকটা পিছিয়ে গেছেন তিনি। এবাদতের উপর নির্ভরশীলতা থেকে টিম ম্যানেজম্যান্টের পরিকল্পনা থেকেও যেন ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছেন। এদিকে আশ্চর্যজনকভাবে এখন পর্যন্ত জায়গা হয়নি বিপিএলেও। যেন নড়বড়ে হয়ে উঠেছে রাহীর অবস্থান।

এসএনপিস্পোর্টসটোয়েন্টিফোরডটকম/নিপ্র/সা/00