টেস্টে দুই দশক, যেখানে ভারত, নিউজিল্যান্ড, প্রোটিয়াদের চেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ

নাসিম আহমদ:: ক্রিকেটের প্রাচীন ও প্রথম ফরম্যাট টেস্ট। ১৮৭৭ সালে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার প্রথম অফিসিয়াল টেস্ট ম্যাচ অনুষ্টিত হয়। এর দুই বছর পর দক্ষিণ আফ্রিকা টেস্ট মর্যাদা পায়। এর একশো বছরেরও বেশি সময় পর বাংলাদেশ পায় টেস্ট খেলুড়ে দেশের মর্যাদা। যদিও পথটা সহজ ছিলোনা। আইসিসি ট্রফি জয়, বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ। দেশের মানুষের ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা আইসিসির এমন সিদ্ধান্ত নেয়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রখেছে।

তৎকালীন বিসিবি বস সাবের হোসেন চৌধুরীর টেস্ট ক্রিকেটের জন্য বাংলাদেশের প্রস্তুতিমূলক গুরুত্বপূর্ণ উপস্থাপনাও দারুন ভূমিকা পালন করেছে। আইসিসির প্রতিনিধি দলের সবুজ সংকেত ও অন্যান্য টেস্ট খেলুড়ে  দেশের ভোট না পেলে হয়তো উপরের সবগুলোই বৃথা যেতো। ভাগ্যটাও ছিলো সাবের হোসেনের অনূকূলে। ভাগ্য সবসময়ই সাহসীদের পক্ষেই থাকে।

টেস্ট খেলুড়ে দেশের মর্যাদা পাওয়ার পর ভারত-নিউজিল্যান্ডকে যেমন লম্বা সময় জয়ের স্বপ্ন দেখতে হয়েছে বাংলাদেশের তেমন অপেক্ষা করতে হয়নি। ৫ বছরের মাথায় ঢাকার মাঠিতে বাঙালীর বিজয় কেতন উড়ান এনামুলরা। এরপর অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়েছে বাংলাদেশ।

এই একটি জায়গাতে ভারত, নিউজিল্যান্ড, সাউথ আফ্রিকার এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। টেস্ট মর্যাদা প্রাপ্তির পর দ্রুতই প্রথম জয়ের  স্বাদ পেয়েছে টাইগাররা। টেস্ট ক্রিকেটে পথচলার পাঁচ বছর পরই বাংলাদেশ প্রথম জয়ের স্বাদ পায়। ভারতকে এই প্রথম জয়ের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে ২০ বছর। বাংলাদেশ আজ সেই বিশ বছরে পা দিয়েছে। এর মধ্যে ১১৯ টেস্ট খেলে জিতেছে ১৪টি। ১১৯’র সাথে ১৪ সংখ্যাটা বেশ বেমানান!

১৯৩২ সালে টেস্টে পথচলা শুরু করা ভারত ১৯৫১-৫২ মৌসুমে প্রথম জয়ের স্বাদ পায় ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। তৎকালীন মাদ্রাজ, বর্তমানে তামিলনাড়ুতে সফরকারী ইংলিশদের হারিয়ে ছিলো স্বাগতিকরা। বাংলাদেশও প্রথম টেস্ট জয়ে স্বাগতিক দল ছিলো। প্রথম টেস্ট জয়ের জন্য নিউজিল্যান্ডকে অপেক্ষা করতে হয়ে ছিলো ২৬ বছর। দক্ষিণ আফ্রিকাকে প্রথম জয়ের স্বাদ পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছিলো ১৬ বছর ১০ মাস। টেস্ট ক্রিকেটের দীর্ঘ দশকের পথচলায় বাংলাদেশ কেবল এই জায়গাতে পেছনে ফেলতে পেরেছে ভারত, নিউজিল্যান্ড, সাউথ আফ্রিকাকে।

ব্যাক্তিগত ভাবে দারুন সব অর্জন আছে মুশফিক, তামিমদের। তবে দলগত অর্জনে অনেকটাই ম্লান। তাইতো অসময়ে বিশেষজ্ঞরা বলতে ভুলেননি ‘বাংলাদেশ টেস্ট ক্রিকেটে ১৯ বছরের শিশু।” পরিসংখ্যান বিচারে অনেকটা শিশুই বটে। ১১৯ ম্যাচ খেলে জয় এসেছে মাত্র ১৪টি। অনেক ম্যাচে লড়াই করে ম্যাচ হেরেছে। আবার জেতা ম্যাচ হাতছাড়া হয়েছে বারবার। যেই আক্ষেপগুলো এখনো বাংলাদেশকে পোড়ায়। তেমনি পাকিস্তানের বিপক্ষে জয় প্রায় নিশ্চিত হওয়া একটি ম্যাচ বাংলাদেশ হেরেছিলো। আজ অবদি টেস্টে পাকিস্তানের বিপক্ষে জয়ের দেখা পায়নি বাংলাদেশ।

ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার মতো টেস্ট পরাশক্তির বিপক্ষে জয় পেলেও ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের জয়ের স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেছে। অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয় এসেছে একবার করে। ২০১৭ সালে অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশ সফরে এক দুর্দমনীয় বাংলাদেশকে দেখেছিলো বিশ্ব। সিরিজে হোয়াইট ওয়াশের সুযোগ এসেছিলো। ব্যাটিং ব্যার্থতায়ই ইতিহাস তৈরির পেছনে মূল বাধা হয়ে দাড়াঁয়। তবে অনন্য এক সাকিবকে দেখেছিলো সবাই। দ্বিতীয় টেস্টের ঐতিহাসিক জয়ের সাক্ষী হতে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ছুটে এসেছিলেন শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে।

জয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশ ড্র করেছে ১৬টি ম্যাচ। হারের লজ্জা সেঞ্চুরির কাছাকাছি অবস্থান করছে। টেস্ট স্টেটাস পাওয়ার ২ বছর পূর্ণ না হওয়া আফগানিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের ইনিংস ব্যাবধানে হার কেউ মেনে নিতে পারেনি। এক সময় প্রম্ন উঠেছিলো বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের কাঠামো নিয়ে। কোনো কোনো মহল থেকে এক সময় টেস্ট মর্যাদা কেড়ে নেওয়ারও দাবি উঠে ছিলো। প্রতি সিরিজের আগেই খেলোয়াড় থেকে শুরু করে ম্যানেজম্যান্ট আশ্বাস দেয় ভালো কিছুর। ফলাফল বরাবর সবার হৃদয় ভাঙতো সাদা পোশের ক্রিকেট। ক্রিকেটের অন্যান্য ফরম্যাটে টাইগার বলা হলেও টেস্ট আসলেই যেনো একটা অস্বস্তি আসে। টেস্টের যোগ্যতা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে, বারবার বিসিবিও জিম্বাবুয়েকে উড়িয়ে এনে সব প্রশ্ন মাটি চাপা দিয়েছে। যার কারণে বাংলাদেশ নিজেদের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৭টি টেস্ট খেলে ৭টিতে জিতেছে। তিন ড্রয়ের বিপরীতে হারও তিনটি।

ব্যক্তিগত অর্জনে তিন ডাবল সেঞ্চুরি নিয়ে মুশফিক অনন্য। সাকিব, তামিমের আছে একটি করে ডাবল সেঞ্চুরি। বিদেশের মাটিতে সফর মুমিনুল হক। তাঁর কাঁধেই আছে নেতৃত্বের বার। বোলিং এ রাহী, এবাদতরা নির্বাচকদের মন জয় করে নিয়েছেন। আশাও জাগাচ্ছেন ভালো কিছু দেয়ার। টেস্টে বাংলাদেশের কাঙখিত ফলাফলের পাল্লা বড্ড হালকা।

বোর্ড কর্তারা সিনিয়রদের টেস্ট খেলায় অনীহা এমন কথাও বলেন। এই অনীহা বলেই কিনা কাঙ্খিত ফলাফল আসতেও অনীহা দেখায়? বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেট খেলার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুললে প্রশ্নের ঝড় উঠবে। কোনো সন্দেহ নেই। শেষ টেস্ট ম্যাচে জয় লেখা রয়েছে। আমরা চাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হোক। বাংলাদেশ টেস্ট ক্রিকেটে নতুন করে শুরু করুক। কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌছুক। র‍্যাংকিং এও উন্নতি হোক। এই জয়-পরাজয়, আলোচনা-সমালোচনার যাত্রার আজ ২০ বছর পূর্ণ হলো বাংলাদেশের। ২১ থেকে বাংলাদেশের জয়যাত্রা হোক। শুভকামনা রইলো পরবর্তী পথের জন্য।
চলতে হতে পারে দূর্গম পথে।

এসএনপিস্পোর্টসটোয়েন্টিফোরডটকম/নিপ্র/০০