ডাকাতের সাথে লড়াইয়ের নেশায় শুরু, ৫৬ বছরে এসে স্কুলমাস্টারের পদক জয়

বিশেষ প্রতিবেদক:: বয়স! সে তো কেবলই এক নিমিত্ত সংখ্যা মাত্র। পৃথিবীর বহু দেশের বহু প্রান্তে এমন অসংখ্য ঘটনা আছে যা আপনাকে প্রমাণ এনে দেবে ভুরি ভুরি। বিশেষ করে ক্রীড়াক্ষেত্রে এমন গল্পের তালিকাটা বেশ লম্বা। তবে বাংলাদেশের ক্রীড়াক্ষেত্রে উদাহরণ তৈরি করার মতো তেমন ছবির সংখ্যা নেই বললেই চলে! কিন্তু সেখানে এবার প্রলেপ একে দিলেন জাকির হাসান।

একজন স্কুলমাস্টার জাকির হাসান। সম্প্রতি দেশের ক্রীড়াঙ্গনে তাক লাগানোর মতো ঘটনা ঘটিয়েছেন তিনি। নবম বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ গেমসে ৫৬ বছর বয়সেও তায়কোয়ান্দোতে পদক জিতেছেন দিনাজপুরের তফিউদ্দিন মেমোরিয়াল হাইস্কুলের গণিতের এই সহকারী শিক্ষক। যদিও সার্টিফিকেটে তার বয়সটা ৫২। কিন্তু আদতে সেটি নয়।  এই ৫৬’তে এসেও নিজের হাঁটুর বয়সী ছেলেদের সাথে লড়াই করে পদক ছিনিয়ে নিয়েছেন তিনি। নিশ্চিতভাবেই যা কোনো সাধারণ ঘটনা নয়।

জাকির হোসেনের জীবনের গল্পতে আছে অনেক রোমাঞ্চ। তার বাড়ি দিনাজপুরে। ২০০৯ সাল থেকে তায়কোয়ান্দোতে অনুশীলন শুরু করেন তিনি। এই তায়কোয়ান্দোতে আসার পেছনে রয়েছে অন্য কারণ। ডাকাতের সাথে লড়াই করার নেশা চেপে বসেছিল। বাড়িতে ডাকাতের উৎপাতে থাকা যেতো না। এমনকি ডাকাতের বন্দুকের গুলিতে হারিয়েছেন নিজের ভাইকে। বুঝে গিয়েছিলেন বাঁচতে হলে লড়াই করতে হবে। আত্নরক্ষার তাগিদে তাই শেখা শুরু করেছিলেন মার্শাল আর্ট। তবে কিছুদিন পর সেটি ছেড়ে দিয়ে নাম লেখান প্রায় একই ধরনের খেলা তায়কোয়ান্দোতে।

৪৬ বছর বয়সে জীবনে প্রথমবারের মতো জাতীয় তায়কোয়ান্দো চ্যাম্পিয়নশিপে খেলেন। ২০১১ সালে ঢাকায় এসে সেই প্রতিযোগীতায় অংশ নিয়েই ব্রোঞ্জ পদক জিতে নেন জাকির। বছর দুয়েক অনুশীলন করেই সাফল্য পাওয়াটা বেশ কৃতিত্বের। কিন্তু পদক পেলেও, ঢাকা থেকে নিজ বাড়িতে ফিরেই কটু কথার মুখে পড়তে হয়ে তাকে। নিকট আত্নীয় আর আশ-পাশের প্রতিবেশীরা বাঁকা চোখে তাকানো শুরু করে। সবার চোখে-মুখে একটাই কথা ‘বুড়ো বয়সে ভীমরতি ধরেছে’!

এমন অবস্থায় এক প্রকার বাধ্য হয়েই পছন্দের তায়কোয়ান্দোর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হয় জাকির হাসানকে। এরপর একে একে কেটে যায় সাতটি বছর। মাঝের এই সময়টাতে শরীরে ঝেঁকে বসে রোগ। সঙ্গে বাড়তে থাকে ওজন। এসব দেখে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া জাকির হাসানের একমাত্র কন্যার পরামর্শ, নতুন করে আবারও শুরু করো খেলা।

আদুরে কন্যার সমর্থন পাওয়া বাবাকে আর আটকানোর সাধ্যি কার! ২০১৯ সালে আবারও ফেরেন সেই চেনা খেলা তায়কোয়ান্দোতে। বছর দুয়েকের মাথায়ই জাতীয় পর্যায়ের আরেকটি আসর বাংলাদেশ গেমসে সুযোগ পেয়ে যান। চারিদিকে যখন তারুণ্যের ঝলকানি ভরা মুখ, তখন জাকির হোসেনকে দেখে ভ্রম হতে পারে যে কারোরই। মাথায় পাকা চুলের সাথে, পাকা দাড়িতে ভরা মুখে বয়স্কের তকমা পাওয়া ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু সেই তিনি কিনা চিরচেনা সাদা খেলোয়াড়ি পোশাক গায়ে জড়িয়ে নেমে গেছেন খেলতে। এও সম্ভব!

চমকের যে তখনও ঢের বাকি। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের জিমনেশিয়ামের অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ গেমসের বিশেষ সংস্করণের তায়কোয়ান্দো ইভেন্টে পদক তুলে নিয়েছেন তিনি। চারিদিকে বিভিন্ন বাহিনী আর অন্যান্য দলগুলোর টগবগে তরুণরা পাখির চোখ করে রেখেছিলেন যে পদকে, সেখানে বুড়ো হাড়ের ভেলকি দেখান জাকির হাসান।

পুমসে সিনিয়র পুরুষ ঊর্ধ্ব–৩২ বছর বয়স বিভাগে ৬.৭০ স্কোর করে যৌথভাবে ব্রোঞ্জ জিতেছেন দিনাজপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার এই খেলোয়াড়। তাঁর সাথে ব্রোঞ্জ পদক জেতা অন্য তায়কোয়ান্দার হলেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মাসুম খান। শুধুমাত্র শরীরের জোরের কারণেই এই পদক জিততে পারেননি জাকির হাসান। নিশ্চিতভাবেই সেখানে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে মনের জোর। যে জোরে সকল যুদ্ধে লড়াই করে জয় ছিনিয়ে আনা যায়।

তবে জাকির হোসেন জানিয়েছেন পদকের জন্য নয়, তায়কোয়ান্দোটা খেলেন তিনি মন আর শরীরের সুস্থতার জন্যই। সবল থাকতে, কর্মক্ষম থাকতেই খেলাটা চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। জাকির হোসেনের এমন গল্প নিশ্চিতভাবেই অনুকরণীয়। তাই সমাজের প্রচলিত নানা বাঁধাকে টপকে এগিয়ে যাওয়ার এক অনুপ্রেরণার নাম এখন জাকির হোসেন। বয়সকে তুড়িতেই সংখ্যায় পরিণত করে মনের জোরকে প্রতিষ্ঠিত করার এক লড়াকু প্রতিচ্ছবি এখন জাকির হোসেন।

এসএনপিস্পোর্টসটোয়েন্টিফোরডটকম/নিপ্র/সা/00