দিয়েগো ম্যারাডোনাঃ এক কিংবদন্তির মহাপ্রয়াণ

ছবি-সংগৃহিত।

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ নব্বই দশকে জন্ম যাদের তারা আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয় দেখে নি। বাবা-চাচাদের মুখেই শুনেছিল লাতিন আমেরিকার এই দেশটির বিশ্ব জয়ের গল্প। বিশ্বকাপে দুইবারের শিরোপা জেতা দল আর্জেন্টিনার ছিলেন এক মহানায়ক। দিয়েগো ম্যারাডোনা। বাঁ-পায়ের জাদুতে বিমোহিত করেছেন বিশ্বের কোটি সমর্থকদের। আমার বাবাও ছিলেন ‘৮৬ চ্যাম্পিয়নদের পাড় ভক্ত। তবে যতটা না আর্জেন্টিনার ততটা ম্যারাডোনার। ১৯৮৬ সালে যখন বিশ্বকাপ জেতে আলবেসেলিস্তেরা, তখন বড় বাড়ীর সাদাকালো টিভির সামনে বসা আমার বাবা, তাঁর বন্ধুরা আর সেই সময়কার কঠিন ফুটবল ভক্তরা ছিলেন আনন্দে আত্মহারা। ম্যারাডোনা আর আর্জেন্টিনা দলের ঐ কীর্তি আমার বাবা’ই স্মৃতিচারণ করেছিলেন এমন।

আর্জেন্টিনার ফুটবল ঈশ্বর ম্যারাডোনা, যার জন্য দিনরাত এক করে ফেলেন দেশটির মানুষ। সেই ফুটবল ঈশ্বর বুধবার (২৫ নভেম্বর) পুরো ফুটবল বিশ্বকে কাঁদিয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বেশ কয়েক দিন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। ৬০ বছর বয়সী এই কিংবদন্তি তিগ্রে-তে নিজ বাসায় মারা যান।

ব্যক্তি জীবনে বিতর্কের তুঙ্গে ছিলেন ম্যারাডোনা। নিষিদ্ধ ড্রাগ নিয়ে ফুটবল থেকে নির্বাসন। কোকেনের নেশায় বুঁদ হয়ে মৃত্যুমুখ থেকে ফিরে আসা। ফুটবলের সম্রাট পেলেকে নিয়েও যা-তা মন্তব্য। এমনকি নিজের মেয়ের দিব্যি দিয়ে মিথ্যা বলতে তার বুক কাঁপে না। সেই ডিয়েগো ম্যারাডোনা মানেই আবার অন্তহীন ফুটবল প্রেমও। যিনি প্রায় একাই ১৯৮৬ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে চ্যাম্পিয়নের স্বাদ পাইয়েছিলেন। ‘হ্যান্ড অফ গড’ গোলের বিতর্ক সত্ত্বেও তার ফুটবল-প্রেমে পাগল হয়েছিল অনুসারীরা।

৮৬’র বিশ্ব জয়ের পরের বিশ্বকাপেও দলকে ফাইনালে তুলেছিলেন ম্যারাডোনা। কিন্তু শিরোপা লড়াইয়ে হেরে যায় সেই সময়ের পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে। ১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র আসরেও দলের নেতৃত্বে ছিলেন তিনি; কিন্তু ড্রাগ টেস্টে পজিটিভ হয়ে দুই ম্যাচ খেলেই দেশের পথ ধরতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। গ্রুপ পর্বে গ্রিসের বিপক্ষে জয়ের পর নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানে জেতা ম্যাচটিই হয়ে থাকে তার ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ।

বুয়েন্স আয়ার্সে ১৯৬০ সালের ৩০ অক্টোবর জন্ম ম্যারাডোনার। আর্জেন্টিনার জার্সিতে ১৯৭৭ সালে অভিষেক হওয়া এই ফুটবলার ৯১ ম্যাচে ৩৪ গোল করেছেন। দেশের হয়ে চারটি বিশ্বকাপ খেলেছেন। রেকর্ড ১৬ ম্যাচে বিশ্বকাপে নেতৃত্ব দিয়েছেন ম্যারাডোনা। সবমিলিয়ে বিশ্ব আসরে খেলেছেন ২১ ম্যাচ। ছিয়াশির বিশ্বকাপে তিনি ‘ম্যারাডোনা’ হয়ে ওঠেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখান ‘হ্যান্ড অফ গড’ গোল দিয়ে। এরপর করেন শতাব্দী সেরা গোল। সেই আসর থেকে ইংল্যান্ড ছিটকে গিয়েছিল। তার আগে ম্যারাডোনার পায়ের জাদুতে সর্বনাশ হয়েছিল বেলজিয়ামের। ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির সর্বনাশের মূলেও ছিল তার দুটি পা।

১৯৮২ বিশ্বকাপে ইতালি ম্যারাডোনাকে এক ম্যাচে ২৩ বার ফাউল করে। যা বিশ্ব রেকর্ড। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে তাকে রেকর্ড ৫৩ বার ফাউল করা হয়। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে মাত্র দুটি ম্যাচ খেলতে পারেন তিনি।

দেশের জার্সি গায়ে সাফল্যের পাশাপাশি ক্লাব ফুটবলেও দারুণ সাফল্যের দেখা পান এই আর্জেন্টাইন। বার্সেলোনার জার্সি চাপানো ম্যারাডোনা নাপোলিতে জেতেন লিগ, উয়েফা কাপ। ১৯৮২ সালে বোকা জুনিয়র্সকে লিগ চ্যাম্পিয়ন করেন।

২০০৮ সালে আর্জেন্টিনার কোচ হিসেবে দায়িত্বে নেন ম্যারাডোনা। আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন তাঁর ১০ নম্বর জার্সি অবসরে পাঠানোর উদ্যোগ নিলেও তা কার্যকর হয়নি। ক্যারিয়ার জুড়ে ম্যারাডোনা গড়েছেন ইতিহাস, জন্ম দিয়েছেন নানা কীর্তি, হয়ে উঠেছেন কিংবদন্তি।

কিংবদন্তির জন্ম একবারই হয়। ফুটবলে ম্যারাডোনা যেমন একজনই। যিনি নিজেকে কালের উদ্ধে নিয়ে গেছেন। চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন সর্বকালের সেরা ফুটবলারের খাতায়।

এসএনপিস্পোর্টসটোয়েন্টিফোরডটকম/নিপ্র/১১০