নৃত্যশিল্পী থেকে অলিম্পিকে ত্রমজ কন্যার ‘বিরল’ ইতিহাস

একই পরিবারের সদস্যদের অলিম্পিক খেলার ইতিহাস রয়েছে। আছে জমজদের অংশগ্রহণের ইতিহাসও। শুধু অংশগ্রহণই নয়, স্বর্ণ জয়েরও ইতিহাস আছে তাদের। কিন্তু যেটা ছিল না অলিম্পিকের ১২০ বছরের ইতিহাসে, সেটাই হয়েছিল ২০১৬ রিও অলিম্পিকে। এস্তোনিয়ার ত্রমজ বোনের একসাথে, একই ইভেন্টে অলিম্পিক খেলার মতো বিরল ঘটনা ঘটেছিল সেবার। ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত সেই অলিম্পিকে ১৪ আগস্ট মেয়েদের ম্যারাথনে মাঠে নেমে নতুন ইতিহাস গড়েন ৩০ বছর বয়সী (বর্তমান বয়স ৩৫) তিন জমজ বোন লিলা, লিনা আর লিলি।

সাগর রায়ঃ লেয়া লুইক তখন বাইরে সোভিয়েত যুগের ট্যাক্সিতে অপেক্ষা করছিলেন, তাঁর স্বামী হেনো তখন নার্সিংহোম থেকে তাদের নবজাতককে নিয়ে আসছিলেন। একে একে প্রথম, দ্বিতীয়, এরপর তৃতীয় সন্তানকে বের করে নিয়ে আসছিলেন। ট্যাক্সিতে থাকা ড্রাইভারের তখন অবাক চোখে তাকিয়ে প্রতিক্রিয়া ছিল ‘আপনারা কি পুরো হাসপাতালটিই খালি করে নিয়ে যাচ্ছেন?’

ড্রাইভারের সেই প্রশ্নের উত্তরটা কি দেওয়া হয়েছিল জানা যায়নি। তবে লিলা, লিনা আর লিলি নামের তিন বোন পরবর্তীতে এস্তোনিয়ার মতো ছোট দেশটাকে অলিম্পিকের মতো বিশ্বমঞ্চে করেছিল ইতিহাসের সাক্ষী। জন্মের পর বেশ কয়েক সপ্তাহ, বাড়িতে নিবিড় যত্নেই ছিল তারা। কিন্তু কে জানত ৩০ বছর পরে সেই তিন বোন ক্ষুদ্র একটা জাতির হয়ে অলিম্পিক ম্যারাথনে দৌড়াবে একসাথে। একইসাথে প্রথম ত্রমজ হিসেবে অলিম্পিকে খেলার ইতিহাস গড়বে। অবশ্য তারাই প্রথম কিনা, এই নিয়ে বেশ কাঁটাছেঁড়াও হয়েছিল।

সেই প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির বক্তব্য ছিল তারা ভাই-বোনের হিসেবটা করতে বা রাখতে পারে না। তবে বিভিন্ন সূত্র জানাচ্ছিল যে তারাই প্রথম ত্রমজ। যাদের মধ্যে একজন হলেন আমেরিকার বিল ম্যালন। যিনি কিনা আন্তর্জাতিক অলিম্পিক ইতিহাসবিদদের আন্তর্জাতিক সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং ১২ হাজারেরও বেশি অলিম্পিক অ্যাথলেট ও তাদের আত্মীয়দের একটি ডাটাবেস আছে তার কাছে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে ম্যালন জানিয়েছিলেন, দুই শতাধিক যমজ গেমসে অংশ নিয়েছিল। এদের মধ্যে স্লোভাকিয়ার ক্যানোইস্ট প্যাভল এবং পিটার হচসকর্নার একই ইভেন্টে ২০০০, ২০০৪ এবং ২০০৮ সালে ডাবলস ক্যানই স্লেলমে স্বর্ণপদক জিতেছিল। তবে ম্যালন ৯৯.৯৯ শতাংশ নিশ্চিত ছিলেন যে কোনও ত্রমজ একই কিংবা পৃথক অলিম্পিকে অংশ নেয়নি। এটি যথেষ্ট বিরল ঘটনা।

যে ত্রমজের কথা বলা হচ্ছে, অথচ বছর ছয়েক আগে যখন কিনা ২৪ বছর বয়সী ছিল সেসময় তারা দৌড় শুরু করেছিলেন কেবল। তারা নিজেরাই আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলেন যে একই ইভেন্টে একসাথে অলিম্পিকে অংশ নেবেন। লিলা, লিনা আর লিলির যিনি প্রশিক্ষক ছিলেন সেই লেমবার্গ জানিয়েছিলেন, এটি খুবই ছোট একটি দেশ। যার জন্য অলিম্পিক ম্যারাথনে মাত্র তিন জনকে অনুমতি দেওয়া হয়। আর লুইক বোনেরাই একইসাথে জায়গা করে নিয়ে সেই কীর্তিই গড়ে ফেলেছেন।

তারা তিন জনই ২ ঘন্টা ৪৫ মিনিটের ম্যারাথন স্ট্যান্ডার্ডের জন্য অলিম্পিকে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিল। অলিম্পিকে খেলার আগে বিভিন্ন জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলেছেন। রিও অলিম্পিকে কোয়ালিফাই করতে লিলা ২ ঘন্টা ৩৭ মিনিট ১১ সেকেন্ডের ব্যক্তিগত সেরা হয়ে স্কোর গড়েছিলেন। লিনা ২ ঘন্টা ৩৯ মিনিট ৪২ সেকেন্ড এবং লিলি ২ ঘন্টা ৪০ মিনিট ৩০ সেকেন্ড সময় নিয়েছিলেন। কাকতালীয়ভাবে তাদের জন্মের ক্রমের সাথও মিলে যায় সেটি। রিও অলিম্পিকে খুব আহামরী সাফল্যের কল্পনা না করলেও এদের মধ্যে লিলা শীর্ষ ২০’এ থাকার আশা করেছিলেন।

অবশ্য শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশা পূরণ হয়নি তার। আসরে ২ ঘন্টা ৪৮ মিনিট ২৯ সেকেন্ড সময় নিয়ে তৃতীয় বোন লিলি ৯৭তম হয়েছিলেন। লিলা ২ ঘন্টা ৫৪ মিনিট ৩৮ সেকেন্ড সময় নিয়ে হয়েছেন ১১৪তম। আর লিনা প্রতিযোগীতায়ই শেষ করতে পারেননি। প্রতিযোগীতায় ভালো করতে তাদের কোচ লেমবার্গের চেষ্টার কোনো কমতি ছিল না। তিনি জানতেন ত্রমজের যেমন সুবিধা রয়েছে, তেমনই চ্যালেঞ্জও আছে। যার কারণে এই ম্যারাথন দৌড়ের জন্য প্রত্যেককেই আলাদা আলাদা ওয়ার্কআউট দিয়েছিলেন। পরামর্শ নিয়েছিলেন একই অলিম্পিকের একই ইভেন্টে জায়গা করে নেওয়া জার্মানির দুই জমজ বোন আনা হাহনার এবং লিসা হাহনার কোচ রেনাতো ক্যানোভারের কাছ থেকে। সেই জমজ দুই বোন আনা ২ ঘন্টা ৪৫ মিনিট ৩২ সেকেন্ড সময় নিয়ে ৮১তম এবং লিসা ২ ঘন্টা ৪৫ মিনিট ৩৩ সেকেন্ড সময় নিয়ে ৮২তম হয়েছিলেন রিও অলিম্পিকে।

ফলাফল ভালো না হলেও, এই সাউদার্ন এস্তোনিয়ার ত্রমজ বোনের ইতিহাসের অংশ হওয়ার কীর্তিও কম কিছুর ছিল না। অথচ এদের পরিকল্পনাতেও ছিল অলিম্পিকে আসার। শুরুতে ছিলেন নৃত্যশিল্পী, স্কুলে পড়াকালীন সময়েই পেশাদারভাবে ঐতিহ্যবাহী হিপ-হপ নাচ করতেন তারা। কাজ করেছেন মিউজিক ভিডিওতেও। এছাড়া প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড হিসেবেও কাজ করেছিলেন এই ত্রমজ বোন।

কিন্তু সুপ্রসন্ন ভাগ্য তাদেরকে টেনে গিয়েছে বহুদূর। এক সহকর্মী তাদেরকে পরামর্শ দেন তারা যেন প্রতিযোগিতামূলক দৌড়ে চেষ্টা করে। তবে দৌড়ের জন্য প্রয়োজন তো একজন কোচ। যার জন্য পরবর্তীতে ২০১০ সালে তার্তু বিশ্ববিদ্যালয় একাডেমিক স্পোর্টস ক্লাবের চেয়ারম্যান লেমবার্গের সাথে যোগাযোগ করেন তারা। ২০১১ সালের মধ্যে লিলা এবং লিনা ১০ হাজার মিটার, হাফ-ম্যারাথন এবং ম্যারাথনে জাতীয়ভাবে আলাদাভাবে সেরা হয়েছিলেন। আর কোচ লেমবার্গের মতে এর জন্য বড় সহায়ক ছিল তাদের নাচ। এই নাচের কারণেই পায়ের গোড়ালিসহ পায়ের অন্যান্য অংশকে শক্তিশালী করেছিল।

প্রথমে লেমবার্গ ভেবেছিলেন হয়তোবা তারা কেবল উইকএন্ডের রানার হতে চায়। কিন্তু না, বছর খানেক পরই তিনি বুঝতে পারলেন যে তারা আরও বড় কিছু চায়। সেই বড় হওয়ার ইচ্ছাই ১৩ লাখের কিছু বেশি জনসংখ্যার ক্ষুদ্র দেশ এস্তোনিয়া থেকে অলিম্পিকের ট্র্যাক পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেছে এই ত্রমজ বোনকে। যে লিলি আর লিলা সময় পেলেই নাচ-ছবি আঁকায় মনযোগ দিত, সেই তারাই কিনা অপর আরেক বোন লিনার অনুপ্রেরণা থেকেই কেবল বিশ্ব মঞ্চে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করেছে, সেটিও কিনা এক বিরল ইতিহাসের অংশ হিসেবে।

এসএনপিস্পোর্টসটোয়েন্টিফোরডটকম/নিপ্র/সা