নোংরা পরিবেশের দায় কি শুধুই মিডিয়ার?

oli-biতানজীল শাহরিয়ার:: ঢাকা টেস্টের দল নির্বাচন, অতিরিক্ত খেলোয়াড় হিসেবে অচেনা ক্রিকেটারদের মাঠে যাওয়া আসা, ২১৫ রানের বিশাল ব্যবধানে হেরে যাওয়া ইত্যাদি নিয়ে দেশের ক্রিকেট জগতে চলছে আলোচনা, সমালোচনা। এর মধ্যে জাতীয় দলের টিম ডিরেক্টর খালেদ মাহমুদ সুজনের সাধারণ গণমাধ্যম এবং সামাজিক অনলাইন মাধ্যমে দল নির্বাচন, জাতীয় দল ব্যবস্থাপনা, পরাজয়ের কারণ ইত্যাদি নিয়ে কাঁটাছেড়া করায় হতাশা ব্যক্ত করেন। এরকম ‘নোংরা’ পরিবেশে তিনি আর কাজ করতে আগ্রহী না বলে মত প্রকাশ করেছেন।

ক্রিকেটার সুজন এদেশের ক্রিকেটের এক উজ্জ্বল চরিত্র। নর্দাম্পটনে পাকিস্তান, ঢাকায় ইন্ডিয়াকে হারানোয় মূখ্য ভূমিকা পালন করেছেন, ভাগ্য আর আম্পায়ারের খেয়ালি ভূমিকায় মুলতানে টেস্ট হেরে চোখের জলে মাঠ ছেড়েছেন। যে সময় বাংলাদেশের ক্রিকেট হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগোচ্ছিলো সামনের দিকে, তখন সুজনরা বুক চিতিয়ে লড়াই করেছেন। ক্রিকেটার সুজন এদেশে বরেণ্য ব্যক্তিত্ব।

ক্রিকেটার অotete-lekokধ্যায় শেষ করে সুজন প্রশাসনিক দায়িত্বে যোগ দেবার পর থেকেই সমালোচনা যেনো তার পিছু ছাড়ছে না। একজন ব্যক্তি বোর্ডের বিভিন্ন পদে আসীন হওয়া, ক্লাব কোচিংয়ে যোগ দিয়ে নিজ দলকে অনৈতিক সুবিধা পাইয়ে দেয়া, এরকম নানাবিধ অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে বাংলাদেশের সাবেক এই অধিনায়কের বিরুদ্ধে। সর্বশেষ, মোসাদ্দেক কে ঢাকা টেস্টের দল থেকে বাদ দেয়া হয়েছে আবাহনীর হয়ে ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন লীগে খেলার জন্যে, উঠেছে এই অভিযোগ।

সুজনের বিরুদ্ধে অভিযোগের যেনো অন্ত নেই! তিনি কিছু করলেও যেমন, না করলেও তেমন, সমালোচনার তোপ দাগানোয় কমতি পড়ে না। সর্বশেষ ঘটনায় তিনি যেনো বেশ আবেগি হয়ে উঠেছেন। জাতীয় দলে আর কাজ করতে আগ্রহ নেই বলে জানিয়েছেন গণমাধ্যমে। বলেছেন, গণমাধ্যম এবং সামাজিক অনলাইন মাধ্যমে জাতীয় দল, দল নির্বাচন, দল ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া, গণমাধ্যমের তীব্র সমালোচনা তাকে খুব আহত করেছে।

আমাদের দেশের সাধারণ দর্শকের প্রত্যাশা আকাশচুম্বি। বাংলাদেশ মাঠে নামলেই জয় উপহার দেবে, সিরিজ জিতবে, প্রতিপক্ষকে নাস্তানাবুদ করবে, এমনটা প্রত্যাশা করা খুব স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। শুধু তাই নয়, দল নির্বাচন, খেলার কৌশল, এমনকি পিচের ধরণ কেমন হবে তা নিয়েও সাধারণ ক্রিকেট দর্শকের মতামত আর তীব্র প্রতিক্রিয়া ভেসে বেড়ায় সামাজিক অনলাইন মাধ্যমে। যেখানে থাকে না কোনো শালীনতার বালাই, থাকে না পরমতসহিষ্ণুতা। এদেশের প্রত্যেক ক্রিকেট দর্শকই যেনো একেক জন ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় একজোট হয়ে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে সমালোচনার ফলায় বিদ্ধ করা হচ্ছে। বিভিন্ন রকমের অশোভন প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করা হচ্ছে। অপমানজনক, অসৌজন্যমূলক মতামত প্রদান করা হচ্ছে।

এসব হয়ত জাতীয় দলে খেলা ক্রিকেটারদের কাছে খুব গুরুত্ব পায় না, বিসিবি কর্মকর্তাদের আলোচ্যসূচিতে থাকে না। কিন্তু, সাধারণ গণমাধ্যমে এসব নিয়ে অনেক কিছু লিখা হয়, এসবের প্রভাব খবরের ওপরে পড়ে। ফলে, অনেক সময় এসব ক্রিকেটার, বোর্ড কর্তাদের নজরে পড়ে। সেসব নিয়ে মাঝে মাঝে বিসিবি’র কর্মকর্তারা নিজেদের মন্তব্য প্রকাশ করে থাকেন। কিন্তু, এবার সুজন খুব খোলামেলাভাবেই প্রকাশ করলেন গণমাধ্যম এবং সামাজিক অনলাইন মাধ্যমে নেতিবাচক সমালোচনার বিরূপ প্রভাবে নিজের অস্বস্তিকর অনুভূতিগুলো।

তবে তিনি যেভাবে ‘নোংরা’ পরিবেশের কথা বললেন, সেই পরিবেশ সৃষ্টি হবার সকল দায় সংবাদ মাধ্যমের ওপরে চাপিয়ে দিলে সেটা ন্যায্য সিদ্ধান্ত হবে না। জাতীয় দল নিয়ে দীর্ঘদিন থেকেই সমালোচনা চলে আসছে। সমালোচিত বিষয়ের সবগুলোই যৌক্তিক, তা নয়, তবে, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাব ছিলো, এটা অস্বীকার করার অবকাশ নেই। এছাড়া সুজন বোর্ড পরিচালক, গেইম ডেভেলোপমেন্টের পরিচালক, ক্লাব কোচ, বিপিএল ফ্রাঞ্চাইজির কোচ, কোয়াবের সহ-সভাপতি, জাতীয় দলের ম্যানেজার, টিম ডিরেক্টর ইত্যাদি দায়িত্বে থাকা নিয়েও অনেক সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু, সাংঘর্ষিক পদ থেকে তিনি নিজেকে সরিয়ে নেননি। চন্দ্রিকা হাথুরুসিংহের আমলে দল নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। সেসব নিয়েও বিসিবির কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ নেবার খবর জানা যায়নি। সাধারণ দর্শকের প্রত্যাশার সাথে বাস্তবের আকাশ পাতাল ফারাক সৃষ্টি হয়ে যাওয়ায় প্রতিক্রিয়ার প্রকাশভংগি সাধারণের জ্ঞানের মাত্রা ছাড়িয়েছে, এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না।

সব সমালোচনায় কান পাতার প্রয়োজন নেই। তবে, সমালোচনার জবাবে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করলে তা চূড়ান্ত বিবেচনায় অসামঞ্জস্যশীল হয়ে উঠবে। দায়িত্বশীল অবস্থান থেকে বিভিন্ন বিষয় কে আরো গভীরভাবে ভেবে দেখা জরুরী।

সাধারণ দর্শককেও আরো সহনশীল হয়ে ওঠা আবশ্যক। দুই চার বছর খেলা দেখে ‘বিশেষজ্ঞ’ হয়ে ওঠার প্রবণতা কে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। শুধুমাত্র নিজের মতকে প্রতিষ্ঠা করার অভিপ্রায় নিয়ে ব্যক্তি বিশেষের প্রতি বিদ্বেষ প্রকাশ করা সমীচীন নয়। ক্রিকেটার, বিসিবি সহ সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তি দেশের মানুষ, তাদের কার্যক্রমের গঠনমূলক সমালোচনা, প্রশংসা ইত্যাদি সাধারণ দর্শকের কাছ থেকে অপ্রত্যাশিত নয়। তবে খেয়াল রাখতে হবে তা যেনো মাত্রা ছাড়িয়ে না যায়।

দায়িত্বশীল কর্তাব্যক্তিদেরকেও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আরো সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত গ্রহন করা উচিত। কাজ করতে গেলে বিভিন্ন ভুল-ভ্রান্তি ঘটে। সেসবের কারণে যেনো কারো লঘু পাপে গুরু দণ্ড না হয়। অন্যদিকে কেউ যেনো জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে চলে না যায়। সবদিকেই যথাযথ খেয়াল রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক: ক্রিকেট কোচ।

এসএনপিস্পোর্টসটোয়েন্টিফোরডটকম/নিপ্র/০০