ফাঁকা মাঠে, ফাঁকা পোস্টে গোল দিয়ে আর্জেন্টিনাকে হারিয়েছিল ব্রাজিল

বিশেষ প্রতিবেদকঃ  সুপার ক্লাসিকো মহারণে আগামীকাল মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা। কোপা আমেরিকার ফাইনালকে ঘিরে উত্তেজনার পারদ এখন তুঙ্গে। সেই উত্তেজনার আগুনে ঘি ঢেলে দিচ্ছে অতীতের কিছু ঘটনা। ১৪ বছর পর কোনো ফাইনালে খেলতে নামা দল দুটির সমর্থকদের তর্কে ঢেলে দিচ্ছে বাড়তি রসদ।

ঐতিহ্যের লড়াইয়ের অতীতের দুটি ঘটনা হয়ে রয়েছে চিরস্মরণীয়। তবে ম্যাচ দুটির পরিস্থিতি মোটেও সুখকর ছিল না। বলা চলে ধ্রুপদী এই লড়াইয়ের দুটি কলঙ্কিত অধ্যায় এই ম্যাচগুলো। যেটার একটিতে ব্রাজিলের ডিফেন্ডারকে ঘুমের ঔষধ খাইয়ে ম্যাচ জিতে আর্জেন্টিনা। তবে ব্রাজিলের একটি জয়েও কলঙ্কের দাগ লেগে আছে। ফাঁকা মাঠে, ফাঁকা গোলপোস্টে গোল দিয়ে ন্যাক্কারজনকভাবে ম্যাচ জিতে দলটি। দুই কলঙ্কজনক জয়ের বিস্তারিত জানুন এই প্রতিবেদনে।

সর্বকালের সেরা ক্লাসিকের কলঙ্ক

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ১৯৩৯ সালের ২২ জানুয়ারি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও বিতর্কিত ম্যাচ হয়ে যায় ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরিওতে। দুই ম্যাচের ফুটবল সিরিজ রোকা কাপ খেলতে ব্রাজিল গিয়েছিল আর্জেন্টিনা। সেই সফরে প্রথম ম্যাচে আর্জেন্টিনার কাছে ৫-১ গোলে বিধ্বস্ত হয় ব্রাজিল। স্বাগতিক দর্শকরা এতে বেশ তেতেছিল, একই সাথে সেসময় ব্রাজিল ফুটবলারদের ওপর ছিল ম্যাচ জেতার চাপ।

তবে এই ম্যাচে ব্রাজিল যে একমাত্র গোলটি করেছিল, সেটি পেনাল্টি থেকে। যা কিনা তৈরি করে সন্দেহ। আর্জেন্টিনার মতে ব্রাজিলের খেলোয়াড় হালকা গায়ে লাগলেই ডি বক্সে শুয়ে পড়ে। রেফারি এতেই পেনাল্টি দেন। আর্জেন্টিনা এর প্রতিবাদ করলেও, রেফারি তার সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন। যা মাথায় রেখে দেয় লা আলবিসেলেস্তারা।

এমন পরিস্থিতিতে দিন সাতেকে পরই সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে মুখোমুখি হয়ে দুই দল। ম্যাচে প্রথমে ১-০ গোলে এগিয়ে যায় ব্রাজিল। বিপরীতে দুই গোল দিয়ে ২-১’এ ম্যাচে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। তবে খানিক পরেই ব্রাজিল ২-২ গোলে সমতা আনে। এই ম্যাচেও এবার একই পুনরাবৃত্তি ঘটে। ব্রাজিলের এক ফুটবলার হালকা ধাক্কায় ডি বক্সে শুয়ে পড়েন। আর রেফারি সঙ্গে সঙ্গে পেনাল্টি দেন। তীব্র প্রতিবাদ করেন আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা।

আর্জেন্টিনার ফুটবলার আর্কেডিও লোপেজ মেজাজ হারিয়ে রেফারিকে ধাক্কা দেন। রেফারিও তাকে পাল্টা আঘাত করেন। এরপর লেগে যায় দ্বন্ধ। পরবর্তীতে পুলিশ মাঠে নেমে ঘটায় আরও বড় কাণ্ড। আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের ওপর বেধড়ক লাঠিপেঠা করে রেফারিকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়। একইসাথে লোপেজকে মাঠ থেকে বের করে দেয় পুলিশ। আর এই পুরো ঘটনার প্রতিবাদে মাঠ থেকে বেরিয়ে যায় আর্জেন্টিনার পুরো দল।

কিন্তু এখানেই নাটক থামেনি। বাকি তখন আরও অনেক কিছু। প্রতিপক্ষের কোনো খেলোয়াড় ছাড়াই ফাঁকা মাঠে, ফাঁকা গোলপোস্টে পেনাল্টি শট নেয় ব্রাজিল। সেখান থেকে পাওয়া গোলে ৩-২ ব্যবধানে কলঙ্কজনক জয় পায় স্বাগতিকরা। আর এতেই ফুটবলের ইতিহাসে ন্যাক্কারজনক এক ঘটনার অবতারণা করে ব্রাজিল। এই ম্যাচটিকে সর্বকালের সেরা ক্লাসিক হিসেবে ধরা হয়।

‘দ্য হলি ওয়াটার স্ক্যান্ডাল’

১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে ঘটে ‘দ্য হলি ওয়াটার স্ক্যান্ডাল’ নামে বিতর্কিত এক ঘটনা। সেই বিশ্বকাপে খেলেছিলেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা। যেখানে আর্জেন্টিনা দলের বিরুদ্ধে আনা হয় গুরুতর এক অভিযোগ। শেষ ষোলোর লড়াইয়ে ব্রাজিলের মুখোমুখি হয় আর্জেন্টিনা। সেই ম্যাচে ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডার ব্রাঙ্কোকে পানির সাথে ঘুমের ঔষধ ট্র্যাঙ্ক্যুলাইজার মিশিয়ে খাইয়েছিলেন আর্জেন্টাইন ফিজিও। যেন ম্যারাডোনা কোন সহজেই নিজের কাজটা সম্পাদন করতে পারেন ভালোভাবে।

ম্যাচটিতে বিরতির কিছু আগে আর্জেন্টিনার ফুটবলার পেদ্রো চোট পেলে, তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে মাঠে আসেন ফিজিও। সেসময় আর্জেন্টাইন ফিজিওর কাছে পানি চান ব্রাঙ্কো। আর সুযোগের সদ্ব্যবহার করেন আর্জেন্টাইন ফিজিও। ব্রাঙ্কোকে ট্র্যাঙ্ক্যুলাইজার মেশানো পানির বোতল দেন।

আর এতেই কাজ হয়ে যায়। সেই পানি পান করে বিরতির পর মাঠে নামেন ব্রাঙ্কো। বার বার ঘুমের ঘোরে চোখ বন্ধ হয়ে আসতে থাকে তার। ম্যারাডোনাকে আটকানোর পরিবর্তে, নিজেকেই সামলাতে পারছিলেন না তিনি। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিন ডিফেন্ডারকে বোকা বানিয়ে ক্যানিজিয়াকে বল বানিয়ে দেন ম্যারাডোনা। ক্যানিজিয়া সেটি জালে বল জড়িয়ে দেন অনায়াসেই।

আর সেই গোলেই বিশ্বকাপ যাত্রা থেকে ছিটকে যায় ব্রাজিলের। ম্যাচটি ১-০ গোলে জিতে নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করে আর্জেন্টিনা। ম্যাচ হারের পর ব্রাঙ্কো দাবি করেন, আর্জেন্টাইন ফিজিওর দেওয়া পানি পান করে সামনের সবকিছু ঘোলাটে দেখতে থাকেন। অবশ্য সেই অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে নাকোচ করেছিল আর্জেন্টাইন ফুটবল এসোসিয়েশন। এরপর ফিফায় অভিযোগ করা হয় ব্রাজিলের পক্ষ থেকে। তবে এই বিষয়ে কিছুই মন্তব্য করেনি ফিফা। কিন্তু ‘দ্য হলি ওয়াটার স্ক্যান্ডাল’ নামে ইতিহাস হয়ে যায় সেটি।

সেই ঘটনার ১৫ বছর ২০০৫ সালে ম্যারাডোনা এক সাক্ষাৎকারে সবাইকে চমকে দিয়ে ‘দ্য হলি ওয়াটার স্ক্যান্ডাল’ ঘটনাটি স্বীকার করেন। ব্রাঙ্কোকে দেওয়া পানিতে ট্র্যাঙ্ক্যুলাইজার মেশানো ছিল বলে জানান ফুটবল ঈশ্বর। যা পরবর্তীতে তৈরি করে বিতর্ক।

এসএনপিস্পোর্টসটোয়েন্টিফোরডটকম/নিপ্র/সা