ফয়সল ইস্যুতে ক্ষোভ আর হতাশায় ভরা সুনামগঞ্জের ক্রীড়াঙ্গণ

আম্মার আহমেদ, সুনামগঞ্জ: ২০১৫ সালের আগস্টে দেশের মানুষের মুখে মুখে ছিলো সুনামগঞ্জের নাম। লাল-সবুজের কিশোর ফুটবল ইতিহাসে সেবারই প্রথম শিরোপা জিতে ছিলো বাংলাদেশ।

সুনামগঞ্জের আরপিন নগর গ্রামের ছোট্ট কিশোর ফয়সল ছিলো সেই সাফ জয়ের নায়ক। ২২ জনের ফুটবল লড়াই সেদিন টাইব্রেকারে পরিণত হয়ছিলো বাংলাদেশের ফয়সল বনাম ভারতীয় খেলোয়াড়ের লড়াই। টাইব্রেকারে শেষ শট আটকে দিয়ে সেদিন জয়ের নায়ক হয়ে ছিলেন ফয়সল।

ফয়সলে উচ্ছ্বসিত ছিলো সুনামগঞ্জের ক্রীড়াঙ্গণ। মুখে মুখে ছিলো ফয়সলের নাম। গর্বিত হয়ে ছিলেন সুনামগঞ্জের মানুষ। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই সেই সুনামগঞ্জের ক্রীড়াঙ্গণেই নেমে আসছে হতাশা আর ক্ষোভ।

এনিয়ে মুখ খোলছেন সুনামগঞ্জের সাবেক সিনিয়র ফুটবলার ও ক্রীড়া সংগঠকরা। তাদের ক্ষোভের কেন্দুবিন্দুতে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)।

সুনামগঞ্জের ক্রীড়াঙ্গনের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাফুফে জাতীয় এই বীরের প্রতি ঠিকমত খেয়াল রাখেনি। যে ভাবে পরিচর্যা করার কথা ছিলো এই অসাধারণ প্রতিভার সেরকম কিছুই করেনি ফেডারেশন। কেবল তাদের স্বার্থটাই আদায় করে নিয়েছে বাফুফে।

সুনামগঞ্জের সংগঠকরা বাফুফেকে দোষারুপের পাশাপাশি বলছেন সুনামগঞ্জের সংগঠকদেরও ব্যর্থতা আছে। নিজ শহরের ভবিষ্যত তারকাকে যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারেননি স্থানীয় সংগঠকরা।

সুনামগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান ইমদাদ রেজ চৌধুরী এসএনপিস্পোর্টসকে বলেন, এটা আমাদের জন্য দুঃখ জনক। বাফুফে এরকম জাতীয় প্রতিভাকে লালন-পালন করতে পারেনি। একজন ছেলে পরিবারের সদস্যদেরকে অসুস্থ রেখে দিনের পর দিন ফুটবলের আশায় পড়ে থাকতে পারে না। তবুও আমরা তাকে বলে ছিলাম যথাসাধ্য চেষ্টা করবো। কিন্তুু অভাবের কারণে সেটি আর হয়নি।

সুনামগঞ্জ জেলা ফুটবল এসোসিয়েশনের (ডিএফএ) সভাপতি আবু জাকের বলেছেন ফয়সাল আমাদের সুনামগঞ্জ জেলার ফুটবল কে এক অনন্য উচুঁতে নিয়ে গিয়েছিলো। তাঁর বর্তমান অবস্থায় পুলিশের চাকরি টা আমাদের জন্য দূঃখের। আমরা তাকে বলেছিলাম যে জেলা ক্রীড়া সংস্থার পক্ষ হতে শুধু তার পড়ার খরচ চালানো হবে কিন্ত সে তার পারিবারিক দরিদ্রতার কথা চিন্তা করে এই চাকরি টা নেওয়াটাই বাধ্য হয়েছে।

সুনামগঞ্জ ডিএফএর এই সভাপতি আরো বলেন, সুনামগঞ্জের  ফয়সাল সাফ জয়ের নায়ক হয়ে বাংলাদেশের নায়ক হলেও পায় বাফুফের পক্ষ থেকে কোন সহযোগিতা পেলো না ছেলেটা।

মাত্রই কিছু দিন আগে সুনামগঞ্জ জেলা ফুটবল দলের গোলরক্ষক সুমন বখত অবসর নিয়েছেন। সিলেট বিভাগীয় কমিশনার কাপের ফাইনালে তিনি অবসর নেন। সাবেক এই গোলরক্ষক ফয়সলের এমন পরিণতিতে দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ফয়সলের যা কতৃিত্ব আছে তা আমাদের জন্য অনেক গর্বের বিষয়।

তিনি বলনে, ফয়সল অনুর্ধ্ব ১৬ দলের শুধু গোলকিপার ই নয় এনে দিয়েছে সাফ জয়ী ট্রফি। আমি মাত্রই জেলা দল থেকে অবসর নিয়েছে। মঙ্গল মিকিদার জায়গা যেভাবে আমি পূরণ করেছি আশা করবো ফয়সল সুনামগঞ্জ জেলা দলের গোলবারে এসে আমার জায়গাটা পূরণ করবে। পুলিশের ফুটবল দলে খেলে যাবে।

সুনামগঞ্জের প্রাক্তন কৃতি ফুটবলার জাবের রইস ব্যথিত মনে বলেন, একটা ফয়সল তৈরি করতে পারবে না ফেডারেশন। ফয়সল অকালে ঝড়ে গেলো বাফুফে ও সুনামগঞ্জ ডিএফএ’র কারনে। বাংলাদেশে গুণীজনদের কদর আগেও ছিলনা। এখনও নাই।

আক্ষেপ করে তিনি বলেন, আমাদের জেলায় এমন মানুষ কি নাই যারা ফয়ছলের ভরণ পোষণের ব্যবস্থা করে দিতে পারতেন। এই দেশের জন্য ও সুনামগঞ্জ জেলার জন্য সুনাম কুড়িয়ে আনার কোন মানে হয়না। সুনাম দিয়া পেট ভরেনা ডাল ভাত লাগে। আমি খুশি হয়েছি ফয়সল চাকরিতে চলে গেছে আগে নিজে বাঁচতে হবে পড়ে দেশ ও সমাজ।

সুনামগঞ্জের জেলা দলের প্লেয়ার সুমু বলেন, আমরা দূঃখিত আমাদের সারাটা জীবন কেটেছে ফুটবলরে মাঠে অথচ ফুটবল আমাদেরকে কিছুই দেয়নি। ফয়সলের মতো এভাবেই ঝড়ে যায় ফুটবলের প্রতিভার ফুলগুলো। এ দেশ থেকে আমি অনেক দূঃখিত যে আজ ফয়সল সাফ জয়ের নায়ক হয়ে ও তার কিছুই মিললো না। আজ সুনামগঞ্জ গোলকিপার শুন্য দল। প্রার্থনা করি ফয়সল যেনো পুলিশ ফুটবল টিমে খেলতে পারে।

সুনামগঞ্জের প্রাক্তন কৃতি ফুটবলার ও কোচ তাপস বলেন, ফয়সল আমাদের সুনামগঞ্জের তথা পুরো বাংলাদেশের গর্ব। অথচ কি বলবো দূঃখের কথা সেইই ফয়সল কি না আজ চাকরির পথ ধরলো বাফুফের কারনে। তিনি অত্যন্ত নিন্দা জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশের ফুটবলের এমন অমুল্যায়নে ফুটবল প্রতিভারা হারিয়ে যাচ্ছে।

সুনামগঞ্জ জেলা দলের ফুটবল প্লেয়ার সামিউন বলেন, ফয়সলের বাসার পাশেই আমার বাসা।  অনেক গরীব ঘরের ছেলে হয়েও লেগে থাকতো ফুটবল নিয়ে। দেশসেরা কিশোর গোলরক্ষক আমাদের ফয়সলের জন্যই কিছুই করেনি বাফুফে। বাফুফের পক্ষ থেকে কোন সুযোগ না পেয়ে চাকরি নিলো। ফয়সল পুলিশ ফুটবল দলে জায়গা করতে পারবে কি না জানি না।

সুনামগঞ্জের কৃতি ফুটবলার কফিউল বলেন, ফয়সল আজ চোখের দূরে পুলিশ ক্যাম্পিং এ আছে কেমন আছে জানি না। পুলিশে তার ভবিষ্যত কেমন তা ও জানা নেই শুধু এইটুকু বলতে পারছি দেশের অমুল্যায়নে ঝড়ে গেলো আরেকটা ফুটবলের আলো।

এসএনপিস্পোর্টসটোয়েন্টিফোরডটকম/নিপ্র/০০