বিপর্যয়ের বছরে ফুটবলে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প

সাগর  রায়:: অনেকে বলছেন ‘বিষে’ নীল ২০২০ সাল! কিংবা অনেকই বলছেন ‘বিষময়’ দুই হাজার বিশ, বিষে বিশ। এরকম নানান বাহারের নামেই স্পষ্ট বছরটাকে কতটা বিষাক্ত মনে করা হচ্ছে। কেনইবা মনে করা হবে না? করোনাভাইরাসের ভয়াল থাবা বিপর্যস্ত করে তুলেছিল গোটা বিশ্বের মানুষকে। যার আঁচ থেকে বাঁচতে পারেনি ক্রীড়াঙ্গনও।

তবে মহামারীকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে এসে নতুন আলোর মশাল জ্বালিয়েছে ফুটবল।  ক্রীড়াঙ্গনে বছর জুড়েই বিভিন্ন কারণে আলোচনায় ফুটবল। করোনাকে পাশ কাটিয়ে কিভাবে খেলা পরিচালনা করা যায়, সেটির দারুণ উদাহরণই তৈরি করেছে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাটি। কেমন ছিল এবছরের ফুটবল? এসএনপিস্পোর্টস’র তৈরি করা সালতামামিতে দেখে নেয়া যাক সেটিই।

ক্লাব ফুটবল

ইউরোপজুড়ে মহামারী করোনার তাণ্ডবে একের পর এক লিগ বন্ধের ঘোষণা। তখন স্তব্দ হয়ে পড়ে ফুটবলাঙ্গন। এই করোনা থেকে ফুটবলকে বেরিয়ে নিয়ে আসার প্রক্রিয়ার শুরুটা হয়েছে বুন্দেসলিগার হাত ধরে। দুই মাসের বেশি সময় বন্ধ থাকার পর জার্মানির শীর্ষ এই লিগের হাত ধরেই ফুটবলের নতুন যাত্রা শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে একে একে মাঠে ফেরে বাকি লিগগুলোও। বুন্দেসলিগাকে অনুকরণের মাধ্যমেই ১৬ মে ফুটবলের নতুন সূর্য উদয় হয়। পরবর্তীতে দুই ম্যাচ হাতে রেখেই আসরের রেকর্ড টানা অষ্টম বারের মতো শিরোপা ঘরে তুলে লিগের জায়ান্ট দল বায়ার্ন মিউনিখ।

করোনা কাটিয়ে মাঠে ফেরার পর ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলো ফিরে পেয়েছিল পুরোনো আমেজ। যারই অন্যতম সবাইকে চমকে দিয়ে রিয়াল মাদ্রিদের লা লিগা শ্রেষ্ঠত্ব পুনরোদ্ধার। চিরপ্রতিদ্বন্ধী বার্সেলোনার চেয়ে মাত্র ২ পয়েন্ট পিছিয়ে ছিল জিনেদিন জিদানের শিষ্যরা। কাতালান জায়ান্টদের হোঁচটের সঙ্গে নিজেদের শেষ ১১ ম্যাচের ১০টিতেই জিতে লা লিগার ইতিহাসে রেকর্ড ৩৪তম শিরোপা ঘরে তুলে সার্জিও রামোসরা।

ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ নিয়ে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা ছিল। গুঞ্জন ছিল লিগ বাতিল করা হতে পারে। আর এতে লিভারপুল ও সমর্থকদের মনে কিছুটা ক্ষোভেরও জন্ম হয়। তবে সব কাটিয়ে পুনরায় প্রিমিয়ার লিগ মাঠে ফেরানোর সিদ্ধান্তে স্বস্তি ফেরে অলরেড শিবিরে। কেননা ৩০ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে লিগ শিরোপা উঠতে যাচ্ছিল ক্লাবটির ঘরে। শেষ পর্যন্ত তিন মাস পর শুরু হওয়া খেলায় রেকর্ড ৭ ম্যাচ হাতে রেখে এবং দ্বিতীয় স্থানে থাকা দলের সাথে রেকর্ড ২৫ পয়েন্টের ব্যবধান রেখে ট্রফির স্বাদ পায় ক্লপ শিষ্যরা।

ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোর মধ্যে সবার শেষে ফেরে ইতালিয়ান সিরি আ। যেখানে টানা নবম বারের মতো শিরোপা স্বাদ পায় জুভেন্টাস। তবে মৌসুমটা খুব একটা ভালো যায়নি তুরিনের বুড়িদের। দ্বিতীয় স্থানে থাকা লাৎসিও থেকে মাত্র ১ পয়েন্ট এগিয়ে থেকে শিরোপা জেতে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোরা। মৌসুমের শুরু থেকে ধুঁকতে থাকা জুভেন্টাস শেষ ভাগেও এসে ধুঁকেছে। এদিকে ফ্রেঞ্চ লিগ ওয়ানে টানা তৃতীয় বারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয় পিএসজি। তবে নেইমার-এমবাপ্পেদের জয়ের লিগটি ছিল অসমাপ্ত। কেননা করোনার কারণে ফ্রান্সে সব ধরনের খেলাধুলা বন্ধ করে দেওয়া হয়।

চ্যাম্পিয়ন্স লিগে অবিশ্বাস্য কিছুর স্বাক্ষী হয়েছিল ফুটবল বিশ্ব। আরও একটি ফুটবল ট্র্যাজেডি দেখেছিল সবাই। লিওনেল মেসির বার্সেলোনার বিরুদ্ধে অপ্রতিরোধ্য বায়ার্ন মিউনিখ পেয়েছিল ৮-২ গোলের বিশাল জয়। কোয়ার্টার ফাইনালে সেই লড়াই একদিকে প্রকাশ করেছিল বার্সার রুগ্ন দশা এবং অপরদিকে প্রকাশ করেছিল বায়ার্নের সেই মৌসুমের দুর্দান্ত ছুটে চলার গল্প। আসরের চ্যাম্পিয়ন হয় বায়ার্নই। ইউরোপে শ্রেষ্টত্বের লড়াইয়ে প্রথম বারের মতো ফাইনালে উঠা পিএসজিকে ৩-১ গোলে হারিয়ে ষষ্ঠ বারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয় বাভারিয়ানরা। করোনার কারণে শেষ দিকে কোয়ার্টারফাইনাল ও সেমিফাইনাল হয় এক লেগের। সবগুলো ম্যাচই পর্তুগালের লিসবনে অনুষ্ঠিত হওয়া চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শেষ পর্বের নাম দেওয়া হয় মিনি টুর্নামেন্ট।

ভঙ্গুর অবস্থায় বার্সেলোনা দল। এর উপর বিশ্ব ফুটবলে আলোড়ন তুলে একটি ব্যুরোফ্যাক্স। লিওনেল মেসি ক্লাব ছাড়তে চান বলে বার্সেলোনাকে একটি ব্যুরোফ্যাক্স পাঠান। মেসি ও কাতালানদের মধ্যে দুই দশকের সম্পর্কে ছেদ নিয়ে ভক্তদের মনের মাঝে তৈরি হয় আঘাত। এর জন্য সবাই বার্সা প্রেসিডেন্ট জোসেপ মারিয়া বার্তেমেউকে দায়ী করে পদত্যাগ দাবি করেন। এদিকে মেসি-বার্সার তিক্ততা ক্রমশই বেড়ে যাচ্ছিল। রিলিজ ক্লজ নিয়ে সমস্যায় বার্তেমেউর ম্যানেজমেন্ট আদালতে যাওয়ার পর্যন্ত হুঁশিয়ারি দেয়। কিন্তু, নিজের প্রিয় ক্লাবকে আদালতে তুলতে চাননি মেসি। অনিচ্ছ্বা সত্ত্বেও তাই শেষ পর্যন্ত থেকে গেছেন এলএমটেন। কিছুদিন পর বিভিন্ন কারণে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন বার্তেমেউ ও তার ম্যানেজম্যান্ট।

আন্তর্জাতিক ফুটবল

ক্লাব ফুটবলে নজর কাড়লেও, আন্তর্জাতিক ফুটবল ফিরে অনেক পরেই। করোনার কারণে অনেক আসর স্থগিত করতে হয়। সেপ্টেম্বরে উয়েফা নেশন্স লিগের দ্বিতীয় আসর দিয়ে মাঠে ফিরে আন্তর্জাতিক ফুটবল। জমজমাট লড়াই শেষে নেশন্স লিগের গ্রুপ পর্ব শেষ করে সেমিফাইনালে উঠেছে চার পরাশক্তি দেশ ইতালি-স্পেন এবং বেলজিয়াম-ফ্রান্স। এর মধ্য দুই দলকে নিয়ে আগামী ১০ অক্টোবর মিলানের সান সিরোতে অনুষ্ঠিত হবে ফাইনাল।

গেল আসরের চ্যাম্পিয়ন পর্তুগাল এবার ব্যর্থ হয়েছে সেমিফাইনালে উঠতে। একই নেশন্স লিগে ব্যর্থতার ধারা অব্যাহত রেখে চলেছে জার্মানি। পরবর্তীতে অক্টোবরে মাঠে ফিরে বিশ্বকাপ বাছাই। যেখানে অংশ নেয় ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ের মতো দলগুলো। এছাড়া আরও বেশ কিছু আন্তর্জাতিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া স্থগিতও বেশ কিছু ম্যাচ।

দেশের ফুটবল

বাংলাদেশের ফুটবল খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি এবছর। জানুয়ারিতে বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ দিয়ে শুরু হয়েছিল এবছরের খেলা। সেখানে সেমি ফাইনাল থেকেই বিদায় নিতে হয় স্বাগতিকদের। পরবর্তীতে ক্লাব ফুটবলে ফেডারেশন কাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। শুরু হয়েছিল প্রিমিয়ার লিগও। কিন্তু, প্রথম পর্বের ম্যাচ বাকি থাকতেই ১৫ মার্চ থেকে সেটিও বন্ধ হয়ে যায়। এরপর সব ধরনের ঘরোয়া আসরই বাতিল করে দেওয়া হয়। শুধুমাত্র মেয়েদের লিগ রাখা হয়। কিছুদিন আগে যেখানে প্রত্যাশিতভাবেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বসুন্ধরা কিংস।

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ছেলেদের বিশ্বকাপ ও এশিয়ান বাছাইয়ে আফগানিস্তান, ভারত এবং ওমানের বিপক্ষে ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল ঘরের মাঠে। বিশেষ করে আফগানিস্তান ম্যাচ নিয়ে চলছিল জোর প্রস্তুতি। সেগুলো পিছিয়ে চলে গেছে আগামী বছরে। তবে এশিয়ান ও বিশ্বকাপ বাছাইয়ে কাতারের বিপক্ষে দ্বিতীয় লেগে গিয়ে খেলে এসেছেন জামাল ভূঁইয়ারা। তবে সেখানে খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি বাংলাদেশ দল। ৫-০ গোলের বিধ্বস্ত হয়ে ফিরেছে দলটি।

কাতার সফর করার আগে নেপালের বিপক্ষে দুটি প্রীতি ম্যাচের সিরিজ খেলেছে বাংলাদেশ। যেখানে প্রথমটিতে ২-০ গোলের জয়ের পর দ্বিতীয়টি গোলশূন্য ড্র হয়েছে। তবে সিরিজ জয়ের চেয়ে বেশি সমালোচনায় পড়তে হয় বাফুফের অবব্যস্থাপনা নিয়ে। ৮ হাজার দর্শক প্রবেশের অনুমতি থাকলে এর চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ দর্শক মাঠে প্রবেশ করে খেলা উপভোগ করেছেন। এদিকে এবছরই বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষীকী উপলক্ষ্যে সাফ ফুটবল অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও, সেটি বাতিল হয়ে যায়। মেয়েদের জাতীয় দলে তো বেহাল দশা অনেক আগে থেকেই। ২০১৯ সালের মার্চে সবশেষ খেলেছিল সাবিনা-কৃষ্ণারা। দেড় বছর ধরে ফুটবল থেকে বাইরে থাকায় ফিফা র‍্যাঙ্কিং থেকেই বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে তাদেরকে।

দেশের ঘরোয়া ফুটবলের জায়ান্ট বসুন্ধরা কিংসের এএফসি কাপে খেলা নিয়ে আশা তৈরি হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সেটিও বাতিল হয়। মালদ্বীপের টিসি স্পোর্টসকে ৫-১ গোলে হারিয়ে দুর্দান্ত শুরুর ইঙ্গিত দিলেও, শেষ পর্যন্ত আর হয়ে উঠেনি। কেননা করোনার কারণে মৌসুমই বাতিল করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। নানা বনিবনার পর দেশের ঘরোয়া ফুটবল ফিরেছে আবারও। বছরের শেষ দিকে এসে ফেডারেশন কাপ দিয়ে শুরু হয়েছে ঘরোয়া মৌসুম।

এদিকে এর আগে বাফুফে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেয়েছে। চতুর্থ বারের মতো সভাপতি হয়েছেন কাজী সালাউদ্দিন। সমালোচনায় তীর বিদ্ধ হলেও, পুনরায় তাঁর প্যানেলের অধিকাংশ ব্যক্তিই জয় লাভ করেছে। এছাড়া দেশের ফুটবলের আলোচনার ইস্যু ছিল জামাল ভূঁইয়ার কলকাতা মোহামেডানে খেলতে যাওয়া। নানান অনিশ্চয়তা আর নাটকীয়তাকে সঙ্গী করে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ অধিনায়ক ছয় মাসের জন্য ধারে আই লিগে দলটির হয়ে খেলতে গিয়েছেন।

বিপুল অঙ্কের ক্ষতি ও সূচি নিয়ে ফুটবলার-কোচদের অসুন্তষ্টি

করোনার কারণে বিশ্বজুড়ে ফুটবল নিয়ে বিপুল পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে। ১৪০০ কোটি ডলার শুধুমাত্র ক্লাব ফুটবলেই ক্ষতি ধরা হচ্ছে। বার্সেলোনা-ম্যানসিটিসহ ইউরোপের শীর্ষ অনেক ক্লাবই নিজেদের ক্ষতি নিয়ে বিপাকে পড়েছে। যার মধ্যে বার্সেলোনা তো মহা সংশয়ে পড়েছিল। শুধুমাত্র ক্লাব নয়, অন্যান্য ফুটবলেও মোটা অঙ্কের ক্ষতিতে পড়েছে।

করোনায় ক্ষতি পোষাতে ও দ্রুত মৌসুম শেষ করতে ঠাসা সূচি করা হয়েছে। যা নিয়ে বিভিন্ন সময় ফুটবলার ও কোচরা নিজেদের অসুন্তষ্টির কথা জানিয়েছেন। ক্লপ-গার্দিওলা-মরিনহোরা বার বার তুলেছেন এমন প্রসঙ্গের কথা। কেননা এতে করে ইনজুরি প্রবণতা বেড়ে গেছে বহুগুণ। দলের পারফর্মেন্সে যা ব্যাঘাত ঘটছে। এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে যে একাদশ মাঠে নামানোও কঠিন হয়ে পড়ে।

ব্যক্তিগত অর্জন

এবছর ফিফা বর্ষসেরা ফুটবলার নির্বাচিত হয়েছেন লেভানডফস্কি। বায়ার্ন মিউনিখের এই পোলিশ স্ট্রাইকার প্রথম বারের মতো এমন পুরষ্কারের দেখা পেয়েছেন। এর জন্য তিনি পেছনে ফেলেছেন ফুটবলের দুই মহাতারকা লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে। এদিকে টানা দ্বিতীয় বারের মতো বর্ষসেরা কোচ নির্বাচিত হয়েছেন ইয়ূর্গেন ক্লপ।

করোনার কারণে চলতি বছর ব্যালন ডি’অর দেওয়া হয়নি। ফ্রান্সের বিখ্যাত ম্যাগাজিন ফ্রান্স ফুটবল এর পরিবর্তে ড্রিম একাদশ তৈরির ঘোষণা দিয়েছিল। সেটি প্রকাশ করা হয়েছে। যেখানে মেসি-রোনালদোর সাথে পেলে-ম্যারাডোনাকে রাখা হয়েছে। এছাড়া ব্যক্তিগত মাইলফলক অর্জন করেছেন লিওনেল মেসি। এক ক্লাবের পেলের করা সর্বোচ্চ ৬৪৩ গোলের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছেন আর্জেন্টাইন সুপারস্টার। বার্সেলোনার হয়ে তাঁর গোল সংখ্যা এখন ৬৪৪টি।

এসএনপিস্পোর্টসটোয়েন্টিফোরডটকম/নিপ্র/সা/১১০