বিষাদময় দেশের ক্রিকেট

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ বাংলায় বহুল প্রচলিত একটি প্রবাদ আছে যে, ‘বিপদ যখন ধেয়ে আসে, তখন সব দিক থেকে একসাথেই আসে’। বাংলাদেশের ক্রিকেটেরও আজ এমনই এক দিন। গত ২৪ ঘন্টারও কম সময়ের মধ্যে টাইগার ক্রিকেটারদের মাঝে বিপদের ঘনঘটা দেখা দিয়েছে। অস্থিরতার এক দিনে একে একে তিন তারকা ক্রিকেটারের করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের খবর বেড়িয়েছে। অবশ্য কালো ছায়া নেমে আসা ক্রীড়াঙ্গনে শুরুটা রাম চাঁদ গোয়ালাকে দিয়ে। গতকালই সবাইকে ছেড়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন রাম চাঁদ গোয়ালা।

রাম চাঁদ গোয়ালার প্রয়াণ
রাম চাঁদ গোয়ালা বাংলাদেশ ক্রিকেটের এক উজ্জল নক্ষত্রের নাম। সেই নক্ষত্রের পতন হয়েছে গতকাল ১৯ জুন শুক্রবার। সকাল সাত টায় ক্রিকেটাঙ্গনকে কাঁদিয়ে দিয়ে ৭৯ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান দেশের প্রথম বাঁহাতি এই স্পিনার। ঢাকার ক্রিকেটের এই কিংবদন্তি হার্ট-চোখেরসহ নানা বার্ধক্যজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন দীর্ঘদিন ধরে। ৫৩ বছর বয়স পর্যন্ত ক্রিকেট খেলা ‘গোয়ালাদা’র প্রয়াণে শোকে কাতর হয় সবাই।

সাবেক ক্রিকেটার নাফীস ইকবাল করোনায় আক্রান্ত
‘গোয়ালাদা’র প্রয়াণের শোক কাটতে না কাটতেই গতরাতে খবর পাওয়া যায় সাবেক ক্রিকেটার, কোচ, ম্যানেজার নাফীস ইকবাল করোনায় আক্রান্ত। যিনি আবার কিনা বাংলাদেশের ওয়ানডে অধিনায়ক ও ড্যাশিং ওপেনার তামিম ইকবালের বড় ভাই। জাতীয় দলের হয়ে ১১ টেস্ট ও ১৬ ওয়ানডে খেলা এই ক্রিকেটার শুক্রবার করোনা আক্রান্তের খবর জানান। ছোট ভাই তামিমের সহায়তার সাথে নিজের ব্যক্তিগত উদ্যোগে জন্মভূমি চট্টগ্রামে অসংখ্য কাজ করেছেন তিনি। অসহায়-ক্ষতিগ্রস্থদের সহযোগীতায় কাজ করেছেন নিজে থেকে ছুটে গিয়ে। চট্টলার এই সন্তান বর্তমানে হোম আইসোলেশনে আছেন। ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন।

মাশরাফী বিন মোর্ত্তাজার করোনায় আক্রান্ত
রাত পেরিয়ে নতুন দিনের শুরু হয়। শনিবার দিনের সবটুকু হাইলাইটস এদিন কেড়ে নিয়েছেন সাবেক অধিনায়ক ও নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য মাশরাফী বিন মোর্ত্তাজা। বাংলাদেশ ক্রিকেটের এই সুপারস্টার আক্রান্ত হয়েছেন করোনা ভাইরাসে। সংবাদ মাধ্যমের বৌদলতে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে সেই খবর। প্রিয় ম্যাশের করোনা আক্রান্তের খবর ক্রীড়াঙ্গনের পাশাপাশি মুষড়ে দেয় গোটা দেশকে। দেশের সর্বকালের সেরা অধিনায়কের সুস্থতা কামনায় শুরু হয়ে পড়ে প্রার্থনা। ভক্তদের মনে চরম দুঃশ্চিন্তা ভর করে। গোটা জাতি যেন একত্রিত হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে মাশরাফীর করোনা মুক্তিতে। কোভিড-১৯ প্রকোপের শুরু থেকেই কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। নিজ নির্বাচনী এলাকার সাথে কাজ করে যাচ্ছেন সারা দেশের জন্য। সরকারী সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি ব্যক্তি সহায়তাও করে যাচ্ছেন তিনি। ব্রেসলেটসহ অন্যান্য স্মারক নিলামে তুলেছেন। সেখান থেকে আসা অর্থের পাশাপাশি জাতীয় দলে নিজের সর্বশেষ বেতনের অর্থ দিয়ে ক্রিকেটারদের সাথে একত্রিত হয়ে ক্ষতিগ্রস্থ মানুষ ও ক্রীড়াবিদদের পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করে যাচ্ছিলেন। বর্তমানে ঢাকার নিজ বাসা থেকেই করোনা পরবর্তী চিকিৎসা নিচ্ছেন সবার প্রিয় চিত্রা পাড়ের দুরন্ত সেই মাশরাফী।

ক্রিকেটার নাজমুল ইসলাম অপু করোনায় আক্রান্ত
মাশরাফীর করোনায় আক্রান্তের খবরের স্থায়িত্ব বেশি সময় হয়নি। এর মধ্যেই আরও একটি দুঃসংবাদ এসে হাজির হয় ক্রিকেটাঙ্গনে। বাবা-মাসহ করোনা আক্রান্ত হয়েছেন নাজমুল ইসলাম অপু। এই বাঁহাতি স্পিনার শুরু থেকেই কাজ করে গেছেন মানুষের কল্যাণে। ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি জাতীয় দলের অন্যান্য ক্রিকেটারের সহায়তায় ক্ষতিগ্রস্থদের পাশে দাঁড়িয়েছেন অপু। এই ক্রিকেটার নিজে ইফতার বিলিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্থদের মাঝে। নিজ হাতেই ত্রাণের প্যাকেট বানিয়েছেন। মেপে দিয়েছিলেন চাল। মানুষের কল্যাণে নিজে উপস্থিত থেকে মাঠ পর্যায়ে কাজ করার কারণেই করোনা আক্রান্ত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ক্রিকেট তো বটেই, দেশের পুরো ক্রীড়াঙ্গনকেই যেন নাড়িয়ে দিয়েছে এমন সব খবর। কিংবদন্তি ‘গোয়ালাদা’ যেখানে গেছেন, সেখান থেকে আর ফিরে আসবেন না। সবার চাওয়া থাকবে পরপারে যেন ভালো থাকেন তিনি। ‘গোয়ালাদা’কে আর ফিরে না পাওয়া গেলেও, আমাদের মাঝেই আছেন নাফীস-মাশরাফী-অপুরা। দ্রুতই যেন সুস্থ হয়ে উঠেন তাঁরা সেই কামনা সবার। খুব শীগ্রই যেন আবারও ক্রিকেটাঙ্গন মুখরিত হয় এই তারকাদের পদচারণে। মাঠের যোদ্ধারা ফিরে আসুক মাঠেই। একই সাথে চাওয়া থাকবে যেন দীর্ঘ না হয় এই অশনি সংবাদের তালিকা। দীর্ঘ না হয় দেশের করোনা আক্রান্তের তালিকা।

উল্লেখ্য, দেশে এখন পর্যন্ত সর্বমোট ১ লক্ষ ৮ হাজার ৭৭৫ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন ১৪২৫ জন। মোট সুস্থ হওয়ার সংখ্যা ৪৩৯৯৩ জন।

এসএনপিস্পোর্টসটোয়েন্টিফোরডটকম/নিপ্র/সা