বিষাদের সুর বাজল বলে…

সাগর রায়ঃ সব কিছুর-ই শুরু আছে শেষ হয়ে যায়, শ্রাবণ এসে ঝরে ঝরে সেও ফিরে যায়। সারা জনম কেঁদেও কারো দুঃখ না ফুরায়, সব কিছুর-ই শুরু আছে শেষ হয়ে যায়..। কনক চাঁপা ও মনির খানের সুরেলা কন্ঠে গাওয়া এই গানের মতোই জীবন বন্ধী নির্মূহ বাস্তবতায়। সেই বাস্তবতাকে মেনেই বিষাদের সুর আজ দেশের ক্রিকেট পাড়ায়। অবশ্য সেই বিষাদের কোনো আনুষ্ঠানিকতা নেই। শুধু আছে কেবল এক টুকরো আশঙ্কার ঝলকানি। ভবিষ্যতে এমন দৃশ্য দেখে কিভাবে ক্রিকেটপ্রেমীদের অবস্থা তথৈবচ, সেটিরই একটি ইঙ্গিত মাত্র।

ঘটনার সূত্রপাত সাত সাগর তেরো নদীর ওপারের দেশ নিউজিল্যান্ডে। তাসমান সাগর পাড়ের দেশটিতে আজ টি-টোয়েন্টি সিরিজের শেষ ম্যাচে মাঠে নেমেছিল বাংলাদেশ ও নিউজিল্যান্ড। বেরসিক বৃষ্টির ছোবলে ইডেন পার্কে টি-টোয়েন্টি থেকে টি-টেনে রূপান্তরিত হয় ম্যাচ। তবে বাংলাদেশের দুরবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। হারের ধারা অব্যাহত রেখে এই ম্যাচেও খালি হাতে মাঠ ছেড়েছে বাংলাদেশ। কিউই পাখির দেশ থেকে জোড়া হোয়াইটওয়াশ সঙ্গে করে নিয়ে আসার সকল বন্দোবস্তের ষোলো কলা পূর্ণ। তবে এদিন দেখা মিলেছে টাইগার ক্রিকেট ইতিহাসের বিরলতম এক দৃশ্যের।

 

বিদেশ ট্যুরে অধিনায়কের রুমে এমন আড্ডা কি আর দেখা যাবে?

 

দেশের ক্রিকেটে পঞ্চপাণ্ডব মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল ও মুশফিকুর রহিমকে ছাড়াই একাদশ সাজাতে হয়েছে বাংলাদেশকে। এমন বিরলতম ঘটনা শেষ কবে দেখেছে বাংলার ক্রিকেট? উত্তর পেতে গেলে ফিরে তাকাতে হবে দেড় দশক অর্থাৎ, ১৫ বছর আগে। ২০০৬ সালে শেষ বার পাঁচ পান্ডবের কাউকে ছাড়াই খেলতে নেমেছিল বাংলাদেশ। চট্টগ্রামে হাবিবুল বাশার সুমনের নেতৃত্বে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সেবার টেস্ট খেলতে নেমেছিল টাইগাররা।

পাক্কা ৫৫১১ দিন পর তাই দেশের ক্রিকেটের বিরলতম দৃশ্যটির দেখা মিলল। অবশ্য সেটি ছিল দেশের মাঠে। বিদেশের মাটিতে খেলার হিসেবে ধরলে দিনের হিসেব বাড়বে আরও অনেকটা। বিদেশের মাঠে এই ফিফারকে ছাড়াই খেলতে নামার ঘটনা সবশেষ ঘটেছিল ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বরে। কলম্বোর পি সারা ওভালে সেই ম্যাচটিও ছিল সাদা পোশাকে এবং অধিনায়ক ছিলেন সেই হাবিবুল বাশার সুমন।

এরপর দিনের পর দিন পেরিয়েছে, বছরের পর বছর পেরিয়েছে, কিন্তু দেশের পাঁচ কিংবদন্তি ক্রিকেটারকে অন্তত একজনকে ছাড়াও মাঠে নামেনি বাংলাদেশ। কেউ না কেউ থেকেছেন দলের ছায়সঙ্গী হয়ে। তবে সে যাত্রায় ভাঁজ পড়ল এবার। পঞ্চপাণ্ডবকে ছাড়াই মাঠে নেমেছিল বাংলাদেশ। যাদের একজন অবসর নিয়ে ফেলেছেন টি-টোয়েন্টি ফরম্যাট থেকে, দু’জন ব্যক্তিগত এবং পারবারিক কারণে খেলতে পারেননি এবং বাকি দু’জন দলের সাথে থেকেও ইনজুরি সমস্যায় মাঠে নামতে পারেননি।

সব মিলিয়ে দেশের ক্রিকেট স্বাক্ষী হলো আরও একটি ইতিহাসের। পরিচিত নামগুলো দেখা যায়নি একাদশের পাতায়। দেখা হয়নি তাদের মাঠের পারফর্মেন্স। হয়নি কোনো আলোচনা-সমালোচনা। অপ্রত্যাশিতভাবে বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক কারণে এমন বিরল ঘটনার দেখা মিললেও, কোনো একটা সময় এই বিষয়টাও নিয়মিত ঘটতে থাকবে। হয়ত সেটা এক-দুই কিংবা পাঁচ বছর পরে। সবকিছুরই যে শেষ আছে।

টুর্নামেন্ট চলাকালে পঞ্চপাণ্ডবকে একসাথে এমন দৃশ্যপটে দেখা যাবে কি আর?

যে শেষের ছোট্ট একটি ঝলক দেখা হয়ে গেল আজ ইডেন পার্কে। একটা নতুন অধ্যায় শুরুর ইঙ্গিত মিলে গেল। পঞ্চপাণ্ডবের উৎপত্তি যে মহাভারতে সেই পাঁচ ভাই যুধিষ্ঠীর, ভীম, অর্জুন, নকুল ও সহদেবকেও তো উত্তরসূরির হাতে ত্যাগ করতে হয়েছিল রাজত্ব-ভোগ-আভিজাত্যের চাকচিক্যতাকে। বাংলার পঞ্চপাণ্ডবও সেখানে ব্যতিক্রম হবেনই বা কি করে। সময় যে প্রায় চলে এসেছে জায়গা ছেড়ে দিতে হবে অন্যদের হাতে।

এখন বাকি তো কেবল আনুষ্ঠানিকতার। শত-সহস্র স্মৃতি আর মায়ার বাঁধনকে আলগা করা ঢাকে এই কাঁটি পড়ল বলে…।  দেশের ক্রিকেটের বিষাদের আওয়াজ এই উঠল বলে…। যে আওয়াজে কত সাফল্য আর ব্যর্থতা মায়াজালে আছে বন্ধী। কত ঘটনা, কত রটনা আছে সঙ্গী। কত হাসি-দুঃখ স্মৃতির ভেলা ভাসে। এসবই যে পুরাতন হবে একদিন। কিন্তু জীবন তো থেমে থাকবে। নৌকা এসে ভিড়বে ঘাটে, যাত্রী তুলে অন্য ঘাটে এসে তাদের নামিয়ে দেবে। এভাবে যাত্রী বদলাবে কিন্তু নৌকা তার যাত্রা থামাবে না। আপন গতিতে ছুটে চলবে দুর্বার।

কারোর জন্যই যে আটকে থাকে না কিছুই। আজ বিদেশের মাঠে নেই প্রিয় পাঁচ। একদিন দেশের মাঠে একসাথে গর্জন দিতে দেখা যাবে না তাদের। এভাবেই চলতে থাকবে। তাঁদেরকে ছাড়াই বাংলাদেশের ক্রিকেটকেও এগোতে হবে। আবেগের টুলি উড়িয়ে বলতে হবে ‘শো মাস্ট গো অন’। তবে এই পঞ্চপাণ্ডবের স্মৃতি থেকে যাবে ততদিন, যতদিন দেশে-বিদেশে ক্রিকেট বলে কিছু থাকবে।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম আসবে, আর এই তারকাদের কীর্তিগাঁথা ঠাই পাবে ঐতিহ্যের পাতায়। মাঠের খেলায় দেখতে না পারলেও তাঁরা থেকে যাবেন আমাদের অন্তরে, সব সাফল্যের অনুপ্রেরণায়। তাদেরকে না পাওয়ার ব্যাথা বুকে নিয়েই শুরু হবে আমাদের নতুন যাত্রা। সবার শেষে তাই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় বলতেই হয়  ‘যেতে নাহি দিব হায়, তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়।’

এসএনপিস্পোর্টসটোয়েন্টিফোরডটকম/নিপ্র/সা/১১০