‘বিসিবি সালিশ কেন্দ্র খোলে বসুক’!

তানজীল শাহরিয়ার অলী, অতিথি লেখক:: ক্রিকেট ভদ্রলোকের খেলা। ক্রিকেট খেলোয়াড় সকলেই যে ভদ্রলোক, কিংবা, ভদ্রভাবে otete-lekokখেলাটা খেলবেন তা নয়, ভদ্রভাবে খেলা এবং জীবন যাপন নির্ভর করে ক্রিকেটারের ওপর। উপরোক্ত বাক্যটা ক্রিকেটের আদি ঐতিহ্যকে ধারণ করে। আধুনিক কালে ক্রিকেট বাণিজ্যিকী করণের চরম পর্যায়ে উপনীত হওয়ার কারণে অনেক অগ্রহনযোগ্য কান্ড ঘটছে মাঠে এবং মাঠের বাইরে।

ক্রিকেটারদের এই মাঠের বাইরের আচরণ নিয়ে গত তিন চার বছরে সবচেয়ে সমালোচনা বাংলাদেশেই হয়েছে। শুধু সমালোচনাই নয়, সেসবের অনেকগুলোই গড়িয়েছে আদালত অব্দি। ২০১৫ বিশ্বকাপের আগে পেসার রুবেল হোসেনের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের অভিযোগ দায়ের করা হয়, বিশ্বকাপের প্রাক্কালে হওয়া সেই মামলায় রুবেল কে কারাগারে প্রেরণ করেন আদালত। এরপর অনেক আলোচনা, সমালোচনা হয় দেশ জুড়ে, বিশ্বকাপের অল্প কিছুদিন আগে জামিনে ছাড়া পেয়ে দলের সাথে অস্ট্রেলিয়া যান রুবেল।
oli-bi
বিশ্বকাপের মাঝ পথে দেশে ফেরত আসেন আরেক পেসার আল আমিন হোসেন। বিসিবি সুস্পষ্টভাবে কিছু জানায়নি, আল আমিন শৃংখলা ভঙ্গের কারণে দল থেকে বাদ পড়েছেন এমনটাই বিবৃতি দিয়েছিলেন ম্যানেজার খালেদ মাহমুদ। পরে সংবাদ মাধ্যমে খবর বেরোয় ইন্ডিয়ান বাজিকর এর সাথে দেখা সাক্ষাত এবং আলাপ করায় আল আমিন কে দল থেকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়। আল আমিন ওই ব্যক্তির পরিচয় জানতেন না, এটা বলে নিজের পক্ষে সাফাই দিয়েছিলেন।

ক্রিকেটার শাহাদাত হোসেন এর শিশু কর্মী নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে দেশের সংবাদ মাধ্যমে ব্যাপক তোলপাড় হয়। শাহাদাত এবং তাঁর স্ত্রী তাদের বাসার শিশু গৃহকর্মীকে নির্মমভাবে নির্যাতন করেন। সেই ঘটনায় মামলা হয়। আসামি শাহাদাত এবং তাঁর স্ত্রী দুই জনই পলাতক থাকার পর, আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। পরে সেই মামলায় তাদের কে জামিন প্রদান করা হয়।

রুবেল এর পর নারী নির্যাতনের অভিযোগ দায়ের হয় স্পিনার আরাফাত সানির বিরুদ্ধে। একই সাথে দু’জন নারী কে বিবাহ করে প্রতারণার অভিযোগে তিনি অভিযুক্ত হন, আদালত তাঁকে সেই মামলায় কারাগারে প্রেরণ করেন। সেই মামলায় অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে জামিনে মুক্তি পান সানি। সর্বশেষ প্রিমিয়ার লিগে খেলেছেন তিনি।

এই কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সর্বশেষ অভিযুক্ত ক্রিকেটারের নাম মোহাম্মদ শহীদ। শহীদের স্ত্রী এই পেসারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করেছেন যে, ২য় সন্তানটি কন্যা হবার কারণে শহীদ তাঁকে আর সহ্য করতে পারছেন না, এমনকি সন্তান ভূমিষ্ঠ হবার আগে কন্যা সন্তান আসছে, এটা জেনে স্ত্রী কে শ্বশুর বাড়ি পাঠিয়ে দেন, সন্তান জন্মদানের সময় থেকে এখন পর্যন্ত স্ত্রী’র সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক নয়, কন্যা সন্তানের মুখটিও দেখেননি শহীদ!

স্ত্রী’র ভরণ পোষণ দিচ্ছেন না, ঘরেও ফেরত নিচ্ছেন না। বছর পার হয়ে গেলেও স্ত্রী’র সাথে সমাধানে আগ্রহী নন তিনি। এভাবে মানবেতরভাবে জীবন যাপন করতে করতে অবশেষে শহীদের স্ত্রী মুখ খুলতে বাধ্য হয়েছেন, বিভিন্ন মাধ্যমে শহীদের বিপক্ষে অভিযোগগুলো তুলে ধরেছেন। শরণাপন্ন হয়েছেন দেশের ক্রিকেট অভিভাবক সংস্থা বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ড এর।

বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায় আশরাফুলের ম্যাচ ফিক্সিং এবং নিষিদ্ধ হওয়া। এরপরেই যে ঘটনাগুলো সবাইকে বেশ নাড়া দিয়েছে, সেগুলো হলো উপরোক্ত নারী এবং শিশু নির্যাতনের বর্বর এবং অমানবিক ঘটনাগুলো।

অভিযুক্ত সকলেই জাতীয় ক্রিকেটার। জাতীয় দলে খেলার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন। দেশের ক্রিকেটের প্রতিনিধি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করা এসব ক্রিকেটারদের মানসিক অবস্থা কেমন, মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কী রকম, তা এসব ঘটনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। চিন্তা করবার বিষয় ক্রিকেটের মতো এতো পরিচ্ছন্ন খেলার সাথে যুক্ত থেকেও কী রকম ভয়ানক অপরাধমূলক প্রবৃত্তি এইসব ক্রিকেটারদের মধ্যে।

অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে, তাতে বিসিবি কে এইসব বিষয় সামলানোর জন্যে একটি লিগাল উইং, বা, সালিশ কেন্দ্র খুলবার পরামর্শ দিয়ে দিতে পারেন সচেতন ক্রিকেটপ্রেমিরা। এইসব ভয়ঙ্কর অপরাধীদের বিকৃত আচরণের ফলে বিশ্বজুড়ে বদনাম হচ্ছে বাংলাদেশের। দূর্নাম হচ্ছে ক্রিকেট খেলোয়াড়দের।

এসব অনাকাংখিত এবং আইন বিরুদ্ধ, মানবাধিকার লঙ্ঘিত হওয়া কর্মকাণ্ড নিয়ে বিসিবি কে কোনো সচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু করতে পারে না? ক্রিকেটারদের নিজেদের দায়িত্বজ্ঞান, মানবাধিকার, আইন ইত্যাদি নিয়ে দীক্ষা দেবার ব্যবস্থা করতে পারে না?

ক্রিকেটে বাংলাদেশ ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করায়, দল হিসেবে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স করায় বিশ্ব ক্রিকেটের নজর এখন এই ব-দ্বীপের দিকে। জাতীয় ক্রিকেটারদের নিয়েও এখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর বেরোয়। আর এসব ক্রিকেটাররাই তরুণদের আদর্শ, আইকন। এরকম আচরণ করলে কী শেখা যাবে ওদের কাছ থেকে?

নেতিবাচক খবরের শিরোনামে ক্রিকেট এবং ক্রিকেটারের নাম না আসার জন্যে দরকারি ব্যবস্থাপত্র বিসিবি নেবে, অভিযুক্ত কে সাময়িক নিষিদ্ধকরণ, দোষী প্রমাণিত হলে দীর্ঘ মেয়াদে নিষিদ্ধকরণ বা স্থায়ী নিষিদ্ধকরণ ইত্যাদি ব্যবস্থা গ্রহন করলে ক্রিকেটারদের মধ্যেও এসব নিয়ে আরো বেশি সচেতনতা তৈরি হতে পারে। কোনো কলঙ্কজনক অধ্যায় যেনো ক্রিকেটে যুক্ত না হয়, সেটাই ক্রিকেটপ্রেমিদের প্রত্যাশা।

এসএনপিস্পোর্টসটোয়েন্টিফোরডটকম/নিপ্র/অ/০০