ব্রজেন দাসের ইংলিশ চ্যানেল সাঁতরে পাড়ি দেওয়ার দিন

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ ১৯২৭ সালের ৯ ডিসেম্বর। মুন্সিগঞ্জের বিক্রমপুরের কুচিয়ামোড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন কিংবদন্তি সাঁতারু ব্রজেন দাস। সেখানেই প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে ১৯৪৬ সালে ঢাকার কেএল জুবিলি স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন তিনি। ছেলেবেলা থেকেই সাঁতারের পারদর্শী ছিলেন ব্রজেন। তাঁর সাঁতারের হাতেখড়ি ঘটেছিল বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে চলা ধলেশ্বরী নদীতে। বাদ যায় নি উত্তাল বুড়িগঙ্গায়ও। সেখানেও চলত সদ্য কৈশোরে পা দেওয়া এক দামাল ছেলের বেঁচে থাকার আনন্দের বহিঃপ্রকাশ।

১৯৫২ সালে পশ্চিমবঙ্গ সাঁতার প্রতিযোগিতায় ১০০ মিটার ফ্রি-স্টাইলে ব্রজেন প্রথম হয়েছিলেন। ১৯৫৪ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল ন্যাশনাল অলিম্পিক, ১০০ মিটার ফ্রি-স্টাইল সাঁতারে প্রথম হন তিনি। কিন্ত তাঁর এই বিজয় মানতে পারেনি পাকিস্তানী বিচারকেরা। সাঁতারকে নেশা আর পেশা হিসেবে গ্রহণ করা ব্রজেনের এই সাফল্য কোনোভাবে যেন মানতে পারলেন না শাসক পশ্চিম পাকিস্তানিরা। নানা অজুহাত দেখিয়ে তাঁকে অযোগ্য ঘোষণা করে বাদ দেওয়া হল। ৫২’র ভাষা আন্দোলনের পর আবারো এই বঙ্গে উঠে প্রতিবাদের ঝড়। যার সুবাদে পুনঃরায় আয়োজিত হয় সেই ১০০ মিটার ফ্রি-স্টাইল সাঁতার। যেখানে আবারো জেতেন ব্রজেন।

ব্রজেনের জন্মই যেন হয়েছিলেন ইতিহাস সৃষ্টি করার জন্য। যার দরুন ১৯৫৫ সালের পাকিস্তান অলিম্পিকে দুটো ইভেন্টে সোনা জেতেন। পরের বছর মেলবোর্ন অলিম্পিক। কিন্তু বিশ্বের সেরা ক্রীড়াযজ্ঞে তাঁকে বাঙালি বলে সুযোগ দেওয়া হয় নি। এই বাঙালি সাঁতারুর ‘স্পর্ধা’ তখনও হজম করতে পারেনি পশ্চিম পাকিস্তান সরকার। এরপর কেটে যায় প্রায় বছর দুয়েক। পাকিস্তান সরকারের অবহেলা, বঞ্চনায় থেমে যান নি ব্রজেন। ১৯৫৮ সালের ১৮ আগস্ট। ২৩টি দেশের প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে প্রথম দক্ষিণ এশিয়ান হিসেবে ইংলিশ চ্যানেল জয় করেন তিনি। সেখানে অংশগ্রহণের জন্য বিন্দুমাত্র আর্থিক সহায়তা করে নি তৎকালীন পাক সরকার। যুক্তফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান, সাংবাদিক, ক্রীড়া সংগঠক- সবাই এগিয়ে এলেন আর্থিক ফাণ্ড গঠনে। চাঁদা তুলে ফাণ্ড জোগাড় করা হয়েছিল।

ইংলিশ চ্যানেলে ১৪ ঘণ্টা ৫২ মিনিটের দূরত্ব কিন্তু মোটেই সহজ ছিল না। সেটি জয় করে দেশে ফেরার পর যে পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে অবমাননা জুটেছিল, তারাই তাঁকে সম্মানিত করে। আইয়ুব খান রীতিমতো বুকে জড়িয়ে ধরেন তাঁকে। যে ব্রজেনকে অবহেলার সঙ্গে ছুঁড়ে ফেলেছিল পাকিস্তানিরা, যে ব্রজেনের প্রতিভাকে মূল্যায়ন করতে চায়নি তারা, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র বাঙালী হবার কারণে যাকে হতে হয়েছে বঞ্চনার শিকার, সেই ব্রজেনের কৃতিত্বেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তানের নামটা একবার উচ্চারিত হয়েছিল শ্রদ্ধার সঙ্গে।

আদ্যপান্ত বাঙালি, সাধাসিধে এই মানুষটি ১৯২৭ সালে ৯ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেছিলেন। প্রথম দক্ষিণ এশীয় ব্যক্তি, যিনি সাঁতার কেটে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেন, ১৯৫৮ সালের আজকের এই দিনে (১৮ আগস্ট)। তিনি সর্বমোট ছয়বার ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেন। এর মধ্যে ১৯৬১ সালে ১০ ঘণ্টা ৩৫ মিনিটে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে তিনি বিশ্বরেকর্ড গড়েছিলেন।

১ জুন ১৯৯৮ ব্রজেন পরলোক গমন করেন।

এসএনপিস্পোর্টসটোয়েন্টিফোরডটকম/নিপ্র/১১০