ভয়কে জয় করে তাঁর পথচলা, তিনি ফিরবেনই

নাসিম আহমদ:: বাংলার ক্রিকেটের এক মশালবাহক। খাঁদের কিনার থেকে শক্ত হাতে টেনে তোলা একজন সৈনিক। পথ হারিয়ে ধুকতে থাকা একটা দলের দিশারি। আবহাওয়া বিবেচনায় একসময় বাংলাদেশের মাটিতে পেস বোলিং চিন্তা করাই ছিল দুঃসাধ্য। এমন পরিস্থিতিতে ছিপছিপে এক লম্বা তরুনের অভিষেক ফাস্ট বোলিং এর মাধ্যমে। তাকে দেখেই রুবেল, তাসকিন, মোস্তাফিজরা গতির ঝড় তোলার পথে পা বাড়িয়েছেন। তিনি হাজারো ফাস্ট বোলারের রোল মডেল। সেই মডেলের নাম মাশরাফী।

বাংলার ক্রিকেটের নবদিগন্তের সূচনাকারী। আহত শরীর নিয়ে ১৮ কোটি বাঙালির স্বপ্নকে রাঙিয়েছেন। বাংলার ক্রিকেটকে পরাশক্তিতে পরিণত করেছেন। খেলোয়াড়দের মনোভাবেও এনেছেন দারুন পরিবর্তন। তিনি যে একজন সফল দলনেতা।

চিত্রা পার দাপিয়ে ভেড়ানো কৌশিক বাংলার ক্রিকেটের মহানায়ক। অথচ এই কৌশিকের মহানায়কের কাব্য লিখতে অনেক ঝড়-ঝাপটা পোহাতে হয়েছে। ইনজুরি বার বার আপন করেছে। আবার বার বার প্রত্যাখাত হয়েছে। ভাঙা পায়ে লালসবুজের পতাকা বহন করে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। জ্বল জ্বল করে হাওয়ায় ভাসিয়েছেন লাল সবুজের পতাকা। তাইতো মাশরাফি বন্দনায় মেতেছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে ভিভ রিচার্ডস, ব্রায়ান চার্লস লারা, নাসের হোসেইন, শন পোলকরা।

ভক্তরা আপন করে নিয়েছিলেন। রেকর্ড বুককে করেছেন সমৃদ্ধ। এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই ‘এশিয়া কাপের’ ফাইনালে তুলেছেন একাধিক বার। সবচেয়ে মর্যাদার আসর আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপে শক্তিশালী ইংল্যান্ড বধের মহাকাব্য লিখেছিলেন। বাংলাদেশকে পৌছে দিয়েছিলেন কোয়ার্টার ফাইনালে। সবই ভাঙা পায়ে। ১১ বার ছুরি কাচির নিচে গিয়েছিলেন। ডাক্তারদের সতর্কবাণী উপেক্ষা করে লাল সবুজকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। বুক চিরে একে নিয়েছিলেন ৫৬ হাজার বর্গমাইল। লড়াই করেছিলেন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভয়কে জয় করে। তিনি অকুতোভয়। ভয়কে জয় করার অনুপ্রেরণা। তরুন প্রজন্মের আইডল।

দারুন সব অর্জন তার দখলে। তার অর্জনে গর্জন দেয় পুরো জাতি। তাকে ঘিরে স্বপ্ন দেখে ১৮ কোটি বাঙালি। তিনি স্বপ্নসারথি। তিনিই স্বপ্ন দেখাতে শিখিয়েছেন। ভালোবাসার পরশে আগলে রেখেছিলেন লাল সবুজকে নেতৃত্ব দেয়া দলকে। ভালোবেসেছেন, ভালোবাসতে শিখিয়েছেন। ক্রিকেটের দেয়াল টপকে রাজনীতিতে যোগদান। সমালোচনার ঝড়, ভক্তরা পাশে ছিলেন। উৎসাহ দিয়েছিলেন। সাদুবাদ জানিয়েছিলেন। সংসদ সদস্যের ভূমিকায়। কঠিন পরিক্ষা। তিনি যে মাশরাফী। পরিক্ষা যার কাছে পরিক্ষা দেয় তার তার পরিক্ষা কিসের।

ক্রিকেট মাঠে সবাইকে আগলে রাখা মাশরাফি নড়াইলকেও আগলে রাখলেন। নড়াইলের শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার। তিনি যে নড়াইল এক্সপ্রেস। তিনি কি শুধুই নড়াইলের? নড়াইল এক্সপ্রেস শব্দে অনেকের হিংসে হয়। তিনি কেনো শুধু নড়াইলের হবেন। তিনি নড়াইলের কৌশিক বাংলাদেশের মাশরাফি। ম্যাশ। তিনি যে বাংলাদেশ। টেলিভিশন কিংবা ছাপার অক্ষর যার পরিচয় দিতে পারেনা। ইনজুরি, প্রতিকূল পরিস্থিতি যাকে আটকাতে পারেনা। তিনি মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা। ১৮ কোটি বাঙালির হৃদয়ের স্পন্দন। আনন্দের উপলক্ষ। এতো কিছু যাকে আটকাতে পারেনা। সেই দূরন্ত, বাধ ভেঙে ছুটে চলা মাশরাফী কাছের মানুষের অবহেলায় সহজেই ভেঙে পরেন। হৃদয়ের রক্তক্ষরণ হয়।

সবাইকে কাঁদিয়ে সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট স্টেডিয়ামের প্রেস কনফারেন্সে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে টানা প্রায় ৫ বছরের যাত্রার ইতি টেনে নেয়ার ঘোষনা দেন। চাপা কান্না ঝরা কণ্ঠস্বর। আবেগী বাঙালি নিতে পারেনি। অঝোরে কেদেছে ভক্ত-অনুরাগীরা। অধিনায়কের বিদায়ে কেদেছে পুণ্যভূমি সিলেটের আকাশ। একটি বিদায়ের সাক্ষী করলেন সিলেটবাসীকে। যেই বিদায়টা কাম্য না।

ক্রিকেট মাঠেও সফল মাশরাফি রাজনীতির মাঠেও অল্প দিনে সফল। করোনার প্রভাবে থেমে থাকা জীবনে কিছুটা স্বস্তি দেয়ার লক্ষ্যে কাজ করেছিলেন। ব্যাক্তিপর্যায়, সরকারের তরফ হতে যেভাবে পেরেছিলেন সাহায্য করেছিলেন। নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিলেন। ১৮ বছরের সঙ্গী। মাশরাফির উথান পতনের সাক্ষী, প্রিয় ব্রেসলেটটিও নিলামের বাটখারায় তোলতে দ্বিধাবোধ করেননি। ব্রেসলেটটি তার হাতেই মানায় বলে তার হাতেই রয়ে গেল।

ব্রেসলেট থেকে প্রাপ্ত অর্থ মানুষের জন্য নিবেদিত করে ছিলেন। তিনি নিজেই যে মানুষের জন্য নিবেদিত প্রাণ। দেশের মানুষদের আপন করে নিয়েছিলেন, দেশের মানুষও যাকে আপন করে নিয়েছিলেন সেই মানবতার অগ্রদূতকে করোনাভাইরাসও যে আপন করে নেবে সেটাই বা কে ভেবেছিল। ভয়কে জয় করে যার পথচলা তাকে কি ভয়ে করোনাভাইরাস জয় করে নিবে? প্রশ্নটা হাস্যকর। ভয়টা তো তবুও থেকেই যায়। তিনি ভয় পেলে যে ১৮ কোটি বাঙালি ভয় পায়। তাই তিনি এখানেও অকুতোভয়। জানিয়েছেন ভয় নয় সচেতনতাই জয়। ম্যাশের করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর ভক্তদের হৃদয়ে নাড়া দিয়েছে। সচেতন হওয়ার একটা হুশিয়ারি বার্তা।

যিনি স্বাধীনতার মাহাত্ম্য কাজে লাগিয়ে বাঙালীর বিজয় কেতন উড়িয়েছেন তার প্রতি ৫৬ বর্গমাইলের বঙ্গীয় এই দেশের মানুষের ভালোবাসা। মানুষের ভালোবাসাই তাকে সুস্থ করে তুলবে। ভালোবাসার জয় সবসময়। মানুষের দোয়া ও ভালোবাসা তাকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনবে। তাকে যে ফিরতেই হবে। থেমে থাকা অজস্র জীবনের নৌকার পালে হাওয়া দিতে হবে। তিনি থেমে থাকলে থেমে যায় ১৮ কোটি মানুষ। তিনি সকল পরিস্থিতিতে নিজেকে চলমান রেখে মানুষের সাহসের সঞ্চার করেন। তিনি যে মাশরাফী। আমাদের মাশরাফী। ম্যাশ আপনি ফিরবেন নতুন উদ্যমে। আমাদের প্রত্যাশা। পুরো জাতীর প্রত্যাশা। মাশরাফী আপনার প্রতি দোয়া ও ভালোবাসা সবসময়। মাশরাফী আপনাকে যে ফিরতেই হবে।

এসএনপিস্পোর্টসটোয়েন্টিফোরডটকম/নিপ্র/০০