মাশরাফী গল্পের শুরু এই দিনে…

আকাশ আহমদ রকি:: ক্যালেন্ডারে আজ তারিখটা ৮ নভেম্বর২০১৮ সাল। আজ থেকে টিক ১৭ বছর আগে আজকের এই দিনে বাইশ গজে যাত্রা শুরু হয়েছিলো কৈশর পার করা চিত্রা পাড়ের এক ছেলের। যাত্রাটাও শুরু হয়েছিলো ক্রিকেটের অভিজাত সংস্করণ টেস্ট ক্রিকেট দিয়ে। যাকে মাঠে দেখে সবাই অবাকই হয়েছিলেন। সবাই অবাক হবেন না কেন? যেই ছেলে কোন প্রথম শ্রেনীর ম্যাচ খেলেননি সে কি করে জাতীয় দলে? সবার মনেই একটা প্রশ্ন আর একরাশ কৌতুহল। কে এই ছেলে? কি রকম বল করে? এই প্রশ্ন গুলো হয়তো সবার মনেই জেগে উঠেছিলো।

২০০১ সালের ৮ নভেম্বর প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়ে, বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম। শুরুতে ব্যাট হাতে ২২ বলে খেলেছিলেন ৮ রানের ইনিংস,যা ছিলো দলের পঞ্চম সর্বোচ্চ স্কোর। বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে ১০৭ রানে অলআউট হয়েছিলো। তারপর বল হাতে ৩২ ওভারে ৮ মেডেন দিয়ে ১০৪ রান দিয়ে তুলে নিয়েছিলেন প্রতিপক্ষের ৪ উইকেট। উইকেট গুলোর মধ্যে ছিলেন জিম্বাবুয়েন গ্রেট গ্রান্ড ফ্লাওয়ার, অপর তিনটি ছিলো কার্লিস, হিথ স্ট্রিক, ও মুরফির। দ্বিতীয় ইনিংসে আর বল করতে হয়নি। আমাদের কিংবদন্তীর অভিষেক টেস্ট বাংলাদেশ ড্র করেছিলো।।

দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে ২৮ ওভার বল করে ৪ মেডেন দিয়ে ১০৪ রানে নিয়েছিলেন ২ উইকেট। আর দ্বিতীয় ইনিংসে ১.৪ ওভার বল করেই শিকার করেছিলেন ২ উইকেট। দুই ইনিংসেই জিম্বাবুয়েন ওপেনার ইব্রাহীমকে বোল্ড করেছিলেন। ২০০১ সালের পর ২০০৩ সা

ল তারপর থেকে নিয়মিত খেলেছেন ২০০৯ সাল পর্যন্ত। ২০০৯ সালে প্রথম টে

স্ট অধিনায়ক হিসেবে নিজের ক্যারিবিয়ান সফর। কিন্ত সেই সফর বেশি সুখকর হয়নি।। সেই সফরেই ইঞ্জুরিতে পরেছিলেন তারপর থেকে এখনোও পর্যন্ত সাদা পোশাকে মাঠে নামেন নি। ২০০১ – ৯ সাল পর্যন্ত টেস্ট ক্রিকেটে তার পারফরমেন্স
ব্যাটিং-
ম্যাচ-৩৬
ইনিংস -৬৭ নট আউট ৫ বার
রান-৭৯৭
গড়-১২.৮২
স্ট্রাইক রেইট-৬৭.২০
সর্বোচ্চ-৭৯
ফিফটি- ৩
চার-৯৫
ছক্কা-২২

বোলিং-
ম্যাচ-৩৬
ওভার-৯৯৮.২
উইকেট-৭৮
সেরা বোলিং ফিগার- ৪/৬০ (ইনিংসে) ৫/৮৮
ওভার প্রতি রান দিয়েছেন-৩.২৪

অধিনায়ক হিসেবে টেস্টে জয় ১০০%।
উল্লেখ্য তার অধিনায়কত্বের প্রথম ম্যাচ ক্যারিবিয়ানদের সাথে বাংলাদেশ জিতেছিলো।

টেস্টের পর ওয়ানডেতে অভিষেক হয় ২৩ নভেম্বর এম এ আজিজ স্টেডিয়াম, প্রতিপক্ষ সেই জিম্বাবুয়ে।ওয়ানডে ক্রিকেটে তার অবদান মোটামুটি সবারই জানা।।হয়েছেন ঐতিহাসিক ম্যাচ জয়ের নায়ক। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের শততম নাম্বার ওডিয়াই ম্যাচে ভারতকে প্রথম হারানোর নায়ক। ২০০৪ সাল বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে টসে জিতে ব্যাটিং এ বাংলাদেশ।। শুরুতে ব্যাটসম্যানরা সুবিধা কর‍তে না পারলেও আশরাফুলের ২৮(৪১),আফতাব আহমেদের ৬১(৯৮) ও মাশরাফির ৩১*(৩৯) রানের ওপর ভর করে ৯ উইকেট হারিয়ে ৫০ ওভারে ২২৯ করেছিলো। সেই ম্যাচে বাংলাদেশ জিতেছিলো ১৫ রানে। ভারত সবকটি উইকেট হারিয়ে ২১৪ রান করেছিলো। সেই ম্যাচে মাশরাফি প্রথম ওভারের নিজের তৃতীয় বলেই শেওয়াগকে বোল্ড করেছিলেন। ওই ম্যাচে ৯ ওভার বল করে ২ মেডেন সহ ৩৬ রান দিয়ে তুল নিয়েছিলেন শেওয়াগ,ধনির উইকেট। একই ম্যাচে ধরেছিলে ২ টি ক্যাচ। দিন শেষে তিনি প্রথম ভারত বধের নায়ক। আবার তিনিই ছিলেন ২০০৭ সালে বিশ্বকাপে ভারত বধের নায়ক।

অভিষেকের পর থেকে এখন পর্যন্ত ওডিয়াইতে তার পারফরমেন্স

ব্যাটিং
ম্যাচ-১৯৯
ইনিংস-১৪৭ নট আউট ২৪ বার
রান-১৭২২
গড়-১৪
স্ট্রাইক রেইট-৮৮.০৪
সর্বোচ্চ-৫১
ফিফটি-১
চার-১৪৮
ছক্কা-৫৮

অধিনায়ক হিসেবে ৬৭ ম্যাচের ৩৮ টিতে জয় এবং ২৭ টি ম্যাচে হেরেছেন। ২০০১ সালে টেস্ট ওয়ানডেতে অভিষেক হলেও টি টোয়েন্টিতে অভিষেক হয় আরও ৫ বছর পর। অভিষেক ম্যাচে ম্যান অব দ্যা ম্যাচ হয়ে শুরু করেছিলেন ক্রিকেটের ছোট্ট ফরমেট টি টোয়েন্টিতে নিজের নিজের বাইশ গজের যাত্রা। শুরুটা ২০০৬ সালের ২৮ নভেম্বর। নিজ শহর খুলনার শেখ আবু নাসের স্টেডিয়াম, প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়ে।
নিজের অভিষেক ম্যাচে ব্যাট হাতে ২৬ বলে ২ চার ও ২ ছক্কায় করেছিলেন দলীয় সর্বোচ্চ ৩৬ রান। বল হাতে ৪ ওভারে ২৯ রানের বিনিময়ে ১ উইকেট। ম্যাচ শেষে হয়েছিলেন ম্যাচ সেরা।

অভিষেকের পর থেকে অবসর পর্যন্ত সময়ে খেলেছেন ৫৪ টি ম্যাচ। ৫৪ ম্যাচের ৩৯ ইনিংসে ব্যাট হাতে ১৩৬.৬১ স্ট্রাইক রেইটে ১৩.৪৬ গড়ে রান করেছেন ৩৭৭। ৩৭৭ রানের মধ্যে ছয় মেরেছেন ২৩ টি চার মেরেছেন ২৮ টি। উইকেট নিয়েছেন ৪২টি। সেরা বোলিং ফিগার ১৯ রানের বিনিময়ে ৪ উইকেট।

টেস্ট, ওডিয়াই থেকে অবসর না নিলেও ক্রিকেটের ছোট্ট ফরম্যাট টি টোয়েন্টিকে তিনি বিদায় জানিয়ে দিয়েছেন। ২০১৭ সাল শ্রীলঙ্কা সিরিজ -এ হঠাৎ করে টি-২০ ক্রিকেটকে বিদায় জানান তিনি। ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচটি খেলেছিলেন ঐ বছরের ৬ এপ্রিল। ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচে ৪ ওভারের স্পেলে ৩০ রানের বিনিময়ে শিকার করেছিলেন ১ টি উইকেট।

তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ খেলেছে একের অধিক এশিয়া কাপের ফাইনাল, ১৫ বিশ্বকাপের কোয়াটার ফাইনাল, ১৭ চ্যাম্পিয়ন ট্রফির সেমিফাইনাল। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ছাড়াও ঘরোয়া বাণিজ্যিক আসর ৫ বারের বিপিএলের ৪বার শিরোপা জয়ী ক্যাপ্টেন তিনি। দেশের হয়ে খেলেছেন ১৭ টি বছর। এই সময়ের মধ্যে নিজের সাথেই লড়াই করেছেন অনেকাবার। লড়াইয়ে জিতে ফিরেছেন চির চেনা বাইশ গজে।।
সেই লড়াই এখনো চলছে।।

আমাদের অধিনায়ক মাশরাফী জাতীয় দলের সব ফরম্যাটেই অধিনায়কত্ব করেছেন। টি-২০ থেকে অবসর নিয়েছেন। ইনজুরির সঙ্গে লড়াইয়ে নেই টেস্টে। তবে আমরা এখনো তাঁর কাঁধে চড়েই ওয়ানডে ক্রিকেটের সোনালী সময়ে আছি। আজকে আমাদের অধিনায়কদের আগমনের দিন। ১৭ বছর আগে আজকের দিনেই বিশ্ব ক্রিকেট পেয়ে ছিলো আমাদের অধিনায়ককে।

জানিনা কতদিন তিনি আর বাইশ গজে দৌড়াবেন। যতদিনই দৌড়াতে পারেন আশা করি নিজের আত্মসম্মানবোধ নিয়ে কলার উঁচু করেই বাইশ গজে দৌড়ে যাবেন। বাঘের গর্জন আর হুংকারে প্রতিপক্ষকে ভয় ধরিয়ে দিতেই বাইশ গজে দৌড়াবেন।। আগামী দিন গুলো আপনার সুখের হোক, শুভ হোক।

সবসময় চাই, যেখানেই থাকুন ভাল থাকুন, সুস্থ থাকুন।

(এসএনপিস্পোর্টস২৪ডটকম সব সময়ই পাঠকের প্রতি আন্তরিক ও শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখাটি লেখকের একান্তই নিজস্ব। আমরা সকলের মতামতকেই গুরুত্ব দেই। লেখকের মতামতের সঙ্গে আমাদের সম্পাদকীয় নীতির মিল নাও থাকতে পারে।)

এসএনপিস্পোর্টসটোয়েন্টিফোরডটকম/নিপ্র/পাঠক/০০