‘মাশরাফী ম্যাজিক’ শেষের সাক্ষী সিলেট

তানজীল শাহরিয়ার:: মাশরাফী ম্যাজিকের সমাপ্তি ঘটলো সিলেটে। লাক্কাতুরা চা বাগানের কোলে অনিন্দ্য সুন্দর স্টেডিয়ামে প্রকৃতিও যেন বিদায় সম্ভাষণ জানালো দেশের ক্রিকেটের মহানায়ক কে। দিনটা মেঘলাই ছিলো। তবে বাংলাদেশের ইনিংসের মাঝপথেই নামলো বৃষ্টি। ম্যাশ ভক্তদের হৃদয়ের অনুভূতি কি আকাশও বুঝতে পেরেছিলো?

অধিনায়ক হিসেবে ৫০তম জয় এবং ১০১ উইকেট নিয়েই মাঠ ত্যাগ করলেন নড়াইল এক্সপ্রেস। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা অধিনায়ক, সেটা বলা বাহুল্য। মাঠ এবং মাঠের বাইরে মাশরাফি অজস্র তরুণের স্বপ্নের নায়ক, আদর্শের প্রতিমূর্তি। ক্রিকেটার মাশরাফির চেয়ে ব্যক্তি মাশরাফিতে মুগ্ধ হওয়া মানুষের সংখ্যা অগুণতি।

দিশেহারা এক বাংলাদেশের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন মাশরাফী। টানা ৪৯ ম্যাচ জয়হীন থাকা বাংলাদেশ মাশরাফী ম্যাজিকে খোলনলচে পাল্টে গেলো। ২০১৫ বিশ্বকাপে বাঁচা মরার লড়াইয়ে পরাক্রমশালী ইংল্যান্ডকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেয় টাইগাররা। যেতে পারতো সেমিতেও। ইন্ডিয়ার বিপক্ষে সেদিন বিতর্কিত আম্পায়ারিংয়ের শিকার হয়ে সেমির স্বপ্ন জলাঞ্জলি দিতে হয়েছিলো। ২০১৭ এর চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে সেমিতে উঠে সে ক্ষতে খানিকটা প্রলেপ দেয়া গেছে। তবে, সবচেয়ে বড়ো প্রাপ্তি ঘরের মাঠে একটানা ৭টি সিরিজ জয়। প্রতিপক্ষের তালিকায় ইন্ডিয়া, পাকিস্তান, সাউথ আফ্রিকা ছিলো। নিউজিল্যান্ড, জিম্বাবুয়ে, আফগানিস্তান ততদিনে হারানোর জন্যে আর চ্যালেঞ্জিং প্রতিপক্ষ নেই, বিশেষ করে ঘরের মাঠে।

মাশরাফী ক্রিকেট ভক্তদের কাছে অনুপ্রেরণার নাম। ইনজুরি থেকে যেভাবে বারবার ফিরে এসেছেন তা এক বিস্ময় বটে। ইনজুরি থেকে ফিরে মাঠে নামা ম্যাশ যখনই ঝাঁপিয়েছেন বলের জন্যে ভক্তদের কলজে অব্দি কেঁপে উঠেছে আশংকায়-এই বুঝি আবার কিছু হলো!

মাশরাফী ২০১১ সালে ঘরের মাঠের বিশ্বকাপ খেলতে পারেননি। এর আগের বিশ্বকাপে ‘ধরে দিবানি’ বলে পরাশক্তি ইন্ডিয়া কে গ্রুপ থেকেই বাড়ি পাঠানোর প্রধান কুশিলব ছিলেন নড়াইলের ‘পাগলা’। হোয়াটমোরের প্রিয় শিষ্য পোর্ট অফ স্পেনে ইন্ডিয়ার ব্যাটিং মেরুদণ্ড সেদিন গুড়িয়ে দিয়েছিলেন বল হাতে। ২০১৫ এবং ২০১৯ বিশ্বকাপে মাশরাফী অধিনায়কত্ব করেছেন। শেষ বিশ্বকাপ প্রত্যাশা অনুযায়ী খেলতে পারেনি টাইগাররা। তখন থেকেই অধিনায়ক আর দল নিয়ে নানান সমালোচনা হচ্ছিলো। অধিনায়কের তরফ থেকে তেমন কিছু শোনা যায়নি। তবে জিম্বাবুয়ে সিরিজের আগেই বিসিবি সভাপতি ঘোষণা দিলেন এটাই অধিনায়ক মাশরাফীর শেষ সিরিজ। এরপর দলে থাকতে হলে পারফরম্যান্স আর ফিটনেস দিয়েই থাকতে হবে৷ জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজে সংবাদকর্মীরাও অবসর বিষয়ক প্রশ্নেই ঘুরপাক খেতে লাগলেন, অধিনায়ককে সেই পাকে ফেলতে চাইলেন। তাতে স্বভাবসুলভ ‘স্পোর্টিং’ মাশরাফির বিরক্তির অবয়ব ফুটে উঠলো। একই প্রশ্ন বারবার করা হলে এরকম প্রতিক্রিয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।

এর আগেও চিত্রা নদি সাঁতরে বেড়ানো দুরন্ত কৌশিক কে বেঁধে ধরে টি-২০ অধিনায়কের পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছিলো। তৎকালীন কোচ হাথুরুসিংহে এবং বিসিবি প্রধানই সে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছেন। অথচ, মাশরাফী স্বপ্ন দেখছিলেন টি-২০ দল কে ওয়ানডে দলের মত একটা স্থিতিশীল অবস্থায় পৌঁছে দিয়ে দায়িত্ব ছাড়তে।

এবার যখন অবসর নিচ্ছেন, তখনো বাংলাদেশ সুবিধাজনক অবস্থায় নেই। সাকিব নিষেধাজ্ঞা পালন করছেন। মুশফিক কে নিয়ে টানাহেঁচড়া চলছে। এই সিরিজের আগে তামিম ছন্দে ছিলেন না। রিয়াদও যেন তাল মেলাতে পারছেন না। মুস্তাফিজের ধার কমে গেছে, রুবেল, তাসকিন, শফিউল, আল আমিন ইনজুরি আর ফর্মের সঙ্গে যুঝছেন। এমন অবস্থায় বাংলাদেশের জন্যে চওড়া কাঁধের খুব দরকার ছিলো দায়িত্ব নেবার জন্যে। অথচ, এমন ক্রান্তিকালে মাশরাফীকে সরানো হলো।

তরুণদের জন্যে ম্যাশ ছিলেন ভরসার এক নাম। তামিম, লিটন, সৌম্যদের দুঃসময়ে ‘ছায়া’ হয়ে পাশে থেকেছেন। রুবেল, তাসকিনদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়তে শিখিয়েছেন। সাব্বির, নাসিরদের জন্যে দেনদরবার করেছেন। সত্যিকার এক নেতা ছিলেন তিনি। তরুণদের ভেতর থেকে সেরাটা বের করে আনার ম্যাজিক মাশরাফি ভালোই জানেন। তার সময়েই রিয়াদ, মুশফিক ব্যাট হাতে প্রতিপক্ষের সামনে ভয়াল রূপে আবির্ভূত হয়েছেন।

ক্রিকেট মাঠের বাইরেও জীবন দর্শন, দেশপ্রেম নিয়ে মাশরাফীর আবেগ, অনুভূতি, উপলব্ধি সাধারণ মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছে। বিভিন্ন প্রতিকূল অবস্থা কে জয় করে ফিনিক্স পাখির মত উড়তে শুরু করা মাশরাফি বিন মর্তুজা মানুষের কাছে লড়াইয়ের অনিঃশেষ প্রেরণার এক কিংবদন্তী।

মাত্র ১৭ বছর বয়সে বল হাতে ঝড় তোলা মাশরাফী আজ অসংখ্য মানুষের মনে ঝড় তোলা এক লড়াকু যোদ্ধা। যার প্রভাব ক্রিকেট মাঠের বাইরেও জ্বলজ্বল করছে। সে আলোর রোশনাইয়ে আরো অনেক যুবা খুঁজে নিজের লক্ষ্য পূরণের অনুপ্রেরণা-মাশরাফি তেমনই একজন।

এসএনপিস্পোর্টসটোয়েন্টিফোরডটকম/নিপ্র/০০