মুখের বুলিতে কাজী, কাজের বেলায় ফাঁকিবাজি

সংগৃহিত ছবি।

বিশেষ প্রতিবেদনঃ উপরের শিরোনামের সাথে একেবারে মানানসই কাজী সালাউদ্দিনের নাম! উত্তরটা নিশ্চিত করবেন আপনারা। আমরা শুধুমাত্র হিসেব মিলিয়ে দেওয়ার কাজটিই করব। দিন কয়েক পরেই দেশের ফুটবলের অভিভাবক সংস্থা বাফুফের নির্বাচন। অলৌকিক কিছু না ঘটলে আবারো বাংলাদেশ ফুটবলের নিয়ন্ত্রক হচ্ছেন কাজী সালাউদ্দিন। দীর্ঘ ১২ বছর থেকে সভাপতির দায়িত্বে থাকা সাবেক এই ফুটবলার আরো কয়েক বছর থাকতে চান সভাপতির পদে। ৩ অক্টোবরের নির্বাচন শেষে আগামি চার বছরের জন্য সভাপতি হতে পারেন তিনি। কিন্তুু একযুগে তিনি কি দিয়েছেন দেশের ফুটবলে, সেই হিসেব মেলানোর চেষ্টা এসএনপিস্পোর্টসে’র তিন পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনে। নির্বাচনী ইশতেহার নিয়ে আজ থাকছে প্রথম পর্ব।

নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রার্থীরা ঘুরছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামি ৩ অক্টোবর ১৩৯ জন ভোটার ভোট দিয়ে নিশ্চিত করতে যাবেন আগামি চার বছর দেশের ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থার মসনদে বসবেন কারা। বাফুফে নির্বাচনের নাম উঠতেই বর্তমান সভাপতি কাজী সালাউদ্দিনের নাম উঠে আসবে। যিনি কিনা তিন বারের বিজয়ী হয়ে চতুর্থবারের মতো নির্বাচন করতে যাচ্ছেন। এছাড়া তার প্যানেলের অনেক সদস্যই আছেন, যারাও কিনা চতুর্থবারের মতো নির্বাচনে এসেছেন।

এর আগে তিন বার জয়ী হয়ে দেশের ফুটবলকে কী দিয়েছেন কাজী সালাউদ্দিন? খেলোয়াড়ি জীবনে সেরা হওয়া এই মানুষটি কি সাংগঠনিক দক্ষতায় দেশের ফুটবলের উন্নতি সাধন করতে পেরেছেন আদৌও? নাকি শুধুমাত্র মুখের বুলিতেই সেরা হয়ে দেখিয়েছেন? ক্রমিকের পর ক্রমিক বসিয়ে আর পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠার দেওয়া ইশতেহারের কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে?

গত নির্বাচনে কাজী সালাউদ্দিন ২৫ দফা ইশতেহার ঘোষণা করেছিলেন দেশের ফুটবলের উন্নয়নে। সম্প্রতি গণমাধ্যমের সামনে তিনি বলেছেন তার পুরোনো ইশতেহারের ৭৫ শতাংশ কাজ পূর্ণ করে ফেলেছেন। অর্থাৎ, তিনি ১৭-১৮টি কাজ সম্পন্ন করেছেন। মুখের বুলিতে ব্যস্ত কাজী সালাউদ্দিন কি দিতে পারবেন সুনির্দিষ্ট সেই ১৭ থেকে ১৮টি কাজের হিসাব?

গেল দফায় নির্বাচনের ইশতেহারের আগে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দফা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় বাফুফে সভাপতি শুধুমাত্র কথাতেই উস্তাদ! সালাউদ্দিন তার ইশতেহারে দিয়েছিলেন জাতীয় দলের সাফল্যের প্রয়োজনে দেশের সকল ক্লাবকে আর্থিকভাবে সাহায্য করা ছাড়াও কোচ দিয়ে অনূর্ধ্ব-১৪, ১৬, ১৮ দল গঠন করে নিয়মিত টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হবে। আন্তর্জাতিক আসর ব্যতিত গত চার বছরে ঠিক ক’বার ঘরোয়াভাবে এই বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্ট দেখা গেছে দেশের ফুটবলে? তবে এটি সত্য যে নারী ও ছেলেদের বয়সভিত্তিক ফুটবলে বেশ কিছু সাফল্য পেয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। তবে ঘরোয়াভাবে তাদের জন্য কোনোকিছুর ব্যবস্থা ছিল না।

প্রতিশ্রুতি ছিল জাতীয় দলের পাইপলাইনে পর্যাপ্ত খেলোয়াড় তৈরি করার জন্য সিলেটে ফুটবল একাডেমিকে বাফুফের সঙ্গে প্রাইভেট ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিকমানের ফুটবল একাডেমি গড়ে তোলা হবে। একাডেমি হয়েছে ঠিকই কিন্তু, সেটি চালুই করতে পারেননি কর্তারা। এর আগেই বন্ধ হয়ে পড়ে। বাফুফে এর জন্য অর্থের অভাব দেখাচ্ছে। অথচ গুঞ্জন আছে, ফিফার গোল প্রজেক্টে পর্যাপ্ত পরিমাণ অর্থ পেলেও সেটি একাডেমির কাজে লাগেনি। তাহলে কোথায় গেল সেই অর্থ?

নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছিল বাফুফে ভবনে আন্তর্জাতিকমানের ফিটনেস সেন্টার গড়ে তোলা হবে। যা জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এই প্রতিশ্রুতি গেল বার তো ছিলই, এর আগেও দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু, সেটি শুধু মুখের কথাতে যেখানে ছিল সেখানেই আটকে রয়েছে। বাফুফে সভাপতি অর্থ না পাওয়ার কথা বলেছেন। অথচ বাস্তবতা বলে ভিন্ন কথা। ফিফা-এএফসি থেকে বছরের পর বছর কোটি কোটি টাকা পেয়েও খেলোয়াড়দের জন্য একটা জিম বানাতে পারেননি। ভালো মানের জিম বানাতে ৫০-৬০ লাখের বেশি খরচ হওয়ার কথা না। এই নিয়ে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের কাছেও এ ব্যাপারে কোনো সহায়তা চায়নি বাফুফে। আরও একটা প্রশ্ন থেকে যায়। টাকা-স্পন্সর ব্যবস্থা করার কথাতো বাফুফের কর্তাদের। যদি টাকা না’ই আনতে পারেন, তাহলে সেখানে কি সাংগঠনিক দক্ষতায় ব্যর্থ নন তিনি?

একটি প্রতিশ্রুতি ছিল প্রতিটি বিভাগে পর্যায়ক্রমে একটি করে টার্ফ ফিফার সহায়তায় স্থাপন করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ফিফার দেওয়া দুটি টার্ফ ছাড়া আর কোনো জায়গায় একটি ইটও গাঁথা হয়নি। এরপর ছিল সকল জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে বিএসএলের সাথে আলোচনা করে ডিএফএ কে প্রতিবছর ২ লাখ টাকা প্রদান করা হবে যেন ভালো করে লিগ আয়োজন করতে পারে। কিন্তু লিগগুলো কি হচ্ছে? দেশের ২০-২৫টি জেলাতেই হয় না লিগ।

দুটি প্রতিশ্রুতি ছিল দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় খেলোয়াড় তৈরির লক্ষ্যে সকল বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগে ফুটবল একাডেমি গড়ে তোলা হবে। এই সমস্ত ফুটবল একাডেমি পর্যায়ক্রমে ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকায় বিভিন্ন ফুটবল একাডেমির সঙ্গে টেকনিক্যাল টাইআপ করার ব্যবস্থা করা হবে। যেখানে এখন পর্যন্ত একটি একাডেমিও তৈরি করা সম্ভব হয়নি, সেখানে ইউরোপ-আমেরিকার একাডেমির সাথে কাজ করা তো রীতিমতো দিবাস্বপ্ন।

বিভাগীয় পর্যায়ে দেশী-বিদেশী ফুটবলার এনে হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ের মাধ্যমে বিএসএল আয়োজন করে দর্শকদের মাঠমুখী করার কথা বলেছিলেন কাজী সালাউদ্দিন। কিন্তু, দৃশ্যত এর কোনো বাস্তবায়নই আজ পর্যন্ত চোখে পড়েনি কারোর। প্রতি বছর বাফুফের পক্ষ থেকে ১ লাখ ফুটবল সারাদেশে বিতরণের উদ্যোগ নেয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া। অথচ দেশের শীর্ষ লিগ বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) খেলা ফুটবলের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠে বার বার।

এগুলো তো সব উল্লেখযোগ্য প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারেননি। এছাড়া আরও কয়েকটি পারেননি কাজী সালাউদ্দিনের প্যানেল। এরপরও কিভাবে তিনি এই ৭৫ শতাংশ কাজ পূরণ হওয়ার কথা বলেন?  ইশতেহারের ৭৫ শতাংশ বাস্তবায়নের হিসেব মেলানো ‘কঠিন’। এছাড়া জানান যেগুলো পূরণ করতে পারেননি সেই দোষও নাকি তার না। সেসময়ে তার নির্বাচনের প্রধান সমন্বয়কারী তরফদার রুহুল আমিনকে দোষী করে তিনি জানান, তাকে না জানিয়েই রুহুল আমিন অনেক ইশতেহার দিয়ে দিয়েছেন। ৫০ বছর ধরে ফুটবলকে সঙ্গী করা কাজী সালাউদ্দিনের এমন হাস্যকর এবং শিশুসুলভ যুক্তি শুধুমাত্র বিনোদনই সৃষ্টি করেছে।

সেই তিনিই এবার নতুন করে আরও  ইশতেহার দিয়েছেন আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে। এবার সেটি ৩৬ দফা। যেখানে রয়েছে অনেক পুরোনো ইশতেহারও।

এসএনপিস্পোর্টসটোয়েন্টিফোরডটকম/নিপ্র/সা/০০/১১০