যেখানে বদলে যায় সাদ উদ্দিনের গল্প

সাদ উদ্দিন। জাতীয় দলের আক্রমণ ভাগের এই খেলোয়াড়ের শুরুটা সেই ২০১৫ সালে। ঘরের মাঠে বাংলাদেশের কিশোর ফুটবল জিতেছিলো ইতিহাসের প্রথম শিরোপা। সাফ অনূর্ধ্ব-১৬ চ্যাম্পিয়নশিপের চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৬ দল। বাফুফের সভাপতি কাজী সালাউদ্দিনের দীর্ঘ দিনের একটি স্বপ্নও সেদিন পূরণ হয়। সাফের সভাপতি থাকা অবস্থায় নিজ দেশের হাতে তুলে দিতে পেরে ছিলেন চ্যাম্পিয়ন ট্রফি। সেই ট্রফি জয়ের অন্যতম কারিগর সিলেটের তরুণ ফুটবলার সাদ উদ্দিন। দুর্দান্ত পারফর্ম করা সাদ উদ্দিনকে আর পেছনে ফেরে থাকাতে হয়নি। বদলের যায় জীবনের গল্প। তিনি নিজেও মানছেন সাফ চ্যাম্পিয়নশিপটাই বদলে দিয়েছে জীবনের গল্প। রঙিন স্বপ্ন বোনা শুরু সেখান থেকেই। ফুটবল পরিবারের এই স্ট্রাইকারের বাড়ী নগরের সুরমার ওপারে। দক্ষিণ সুরমা উপজেলায়।

সেই ২০১৫ সাল থেকেই কিশোর সাদ উদ্দিন হয়ে উঠেন বাংলাদেশের গর্ব। বয়স ভিত্তিক ফুটবল পেরিয়ে তিনি এখন জাতীয় দলের আক্রমণ ভাগের অস্ত্র। কলকাতার সল্টলেকে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে ঐতিহাসিক গোল করে তিনি লাল-সবুজ ফুটবলের ‘হিরো’। মাঠে উপস্থিত স্বাগতিকদের লাখো দর্শক। মাঠের বাইরে ১৩০ কোটি ভারতীয়। সবাইকে নিজেদের মাঠে তিনি স্তব্ধ করে দিয়ে ছিলেন। অল্পের জন্য জয় ফসকে যাওয়া সেই ম্যাচে বাংলাদেশ ‘ড্র’ করে ছিলো। যে ‘ড্র’ দেশের ফুটবল পাগল মানুষের কাছে জয়ের সমতুল্য। ঘরোয়া ফুটবলের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব আবাহনীর হয়ে জিতেছেন দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের শিরোপা। সিলেটের সাদ এখন অনেক তরুণ ফুটবলারের ‘আইডল।’ করোনাকালীন অবসর সময়ে আছেন নিজের বাড়ীতে। ফুটবল নেই, পরিবারকে সময় দিচ্ছেন। দুঃসময়ে এলাকার অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। ত্রাণ বিতরণ করেছেন এলাকায়। কেমন যাচ্ছে দিনকাল? ভবিষ্যত পরিকল্পনা কি? এসব নিয়েই সাদ উদ্দিনের সঙ্গে কথা বলেছেন আমাদের সাব-এডিটর সাগর রায়

এসএনপিস্পোর্টসঃ করোনা আতঙ্কে সবাই, আগে কখনো এরকমটা হয়নি। দিনকাল কেমন যাচ্ছে?

সাদ উদ্দিনঃ বাসায় আছি। আমাদের তো অনুশীলন করতে হয়, নিজেদেরকে ফিট রাখতে হয়। ব্যক্তিগতভাবে অনুশীলন করছি। বাসার পাশেই মাঠ রয়েছে। সেখানে অনুশীলন করি। খুবই বোরিং একটা সময় যাচ্ছে। শুধু আমার ক্ষেত্রেই নয় সবারই একই অবস্থা।

এসএনপিস্পোর্টসঃ করোনা দুর্যোগে মানুষকে অনেককে সাহায্যও করেছেন…

সাদ উদ্দিনঃ হ্যাঁ, আমি এক মাস আগে ত্রাণ বিতরণ করেছি আমার এলাকায় ও অন্যান্য কয়েকটি এলাকায়। চেষ্টা করেছি সবাইকে সাহায্য করার। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী এখন যতটুকু করতে পারি, চেষ্টা করে যাচ্ছি।

এসএনপিস্পোর্টসঃ ২০১৫ সালে অনূর্ধ্ব -১৬ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে সিলেটে ভারতকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ। ঘরের মাঠ থেকেই কি ক্যারিয়ারের যাত্রাটা শুরু?

সাদ উদ্দিনঃ ক্যারিয়ারে এটা টার্নিং পয়েন্ট ছিল আমার। এরপর আমাকে আর পেছনে ফিরে থাকাতে হয়নি। এখন পর্যন্ত কন্টিনিউ করে আসছি। অনূর্ধ্ব-১৯, অনূর্ধ্ব-২৩, প্রিমিয়ার লিগ, জাতীয় দলে সুযোগ পেয়েছি। ২০১৫ সালের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপটা আমার ক্যারিয়ারের মোড়টাই ঘুরিয়ে দিয়েছিল।

এসএনপিস্পোর্টসঃ আবাহনীতে সু্যোগ পাওয়াটা কিভাবে?

সাদ উদ্দিনঃ আমি চ্যাম্পিয়শিপ লিগে খেলি ভিক্টোরিয়া ক্লাবের হয়ে। সেখান থেকে অনূর্ধ্ব-১৯ খেলার পর আমাকে আবাহনী থেকে ডাকা হয়। আমি তখন আর কোনো চিন্তা-ভাবনা না করেই সরাসরি চলে যাই আবাহনীতে ২০১৬ সালে। এরপর আবাহনীতে থেকেই অনূর্ধ্ব-২৩’এ খেলি। আস্তে আস্তে জাতীয় দলে খেলি। এখনও আবাহনীতেই আছি।

এসএনপিস্পোর্টসঃ ক্যারিয়ারে কাতার ও ভারতের মতো দলের বিপক্ষে ম্যাচ খেলেছেন। ভারতের বিপক্ষে ঐতিহাসিক ম্যাচের পর তো ব্যাপক তারকা খ্যাতি পেয়েছিলেন। কোনটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে?

সাদ উদ্দিনঃ ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটা আমার সেরা ম্যাচ। ইনজুরি থেকে ফিরে এসে এমন একটা ম্যাচ ছিল। প্রায় ৬ মাস ইনজুরিতে ছিলাম (নিজ শহরে বাইক দুর্ঘটনায় পড়েছিলেন)। যার জন্য সিলেটে অনুষ্ঠিত বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপটাও মিস করেছিলাম। এরপর কামব্যাক করে আর বসে থাকি নি, এখন পর্যন্ত খেলে যাচ্ছি।

এসএনপিস্পোর্টসঃ বিশ্বকাপ বাছাইয়ে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটি সিলেটে হওয়ার কথা?

সাদ উদ্দিনঃ যদি সিলেটে খেলা হয় তাহলে অনেক ভালো লাগবে। জাতীয় দলে সিলেটের যারা আছে, তাদের জন্যও খুব ভালো হবে বিষয়টা। তারপরও এটা হোম ম্যাচ, সিলেটে হোক আর ঢাকায় হোক আমাদেরকে সুযোগটা নিতে হবে। হোম এডভান্টেজটা কিভাবে নেওয়া যায়, এভাবেই পরিকল্পনা করছি।

এসএনপিস্পোর্টসঃ আসন্ন এশিয়ান ও বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ম্যাচগুলো নিয়ে ব্যক্তিগত কোনো বিশেষ পরিকল্পনা আছে?

সাদ উদ্দিনঃ এখনো ওই ভাবে চিন্তা করেনি। ক্যাম্পও শুরু হয়নি, সামনে কি করবো সেটিও জানি না। এছাড়া ব্যক্তিগত পরিকল্পনা বলতে আমি নিয়মিত ট্রেনিং করে যাচ্ছি। এখন সবচেয়ে বড় লক্ষ্য নিজেকে ফিট রাখা, নিজেকে সুস্থ রাখা। এরপর ক্যাম্পে গেলে অন্য একটা চিন্তা চলে আসবে। এখন নিজেকে ফিট আর সুস্থ রাখতে কাজ করে যাচ্ছি। একই সাথে সামনে ক্যাম্পের জন্য প্রস্তুত রাখছি।

এসএনপিস্পোর্টসঃ মাঠে অনুশীলনের সুযোগ নেই। এই সময়টাতে ফিটনেস ধরে রাখতে কোন কাজগুলো করে যাচ্ছেন?

সাদ উদ্দিনঃ আমার বাসায় কিছু জিমের সরঞ্জাম আছে। নিয়মিত জিম করি এগুলো দিয়ে। এরপর মাঠে (বাড়ির পার্শ্ববর্তী মাঠ) দুই রাউন্ড অনুশীলন করি। ব্যক্তিগতভাবে যেগুলো আছে, ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজসহ অন্যান্যভাবে নিজেকে ফিট রাখার চেষ্টা করছি, যতটুকু সম্ভব করা যায়।

এসএনপিস্পোর্টসঃ জাতীয় দলের আপাতত কোনো কর্মসূচি নেই, চলতি মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগসহ অন্যান্য আসর বাতিল হয়ে গেছে। প্রিমিয়ার লিগ মাঝপথে বাতিল হওয়াতে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছেন?

সাদ উদ্দিনঃ দেখেন আর্থিক ক্ষতি সব খেলোয়াড়দেরই হচ্ছে। ক্লাব, খেলোয়াড়, কোচ সংশ্লিষ্ট সব মানুষেরই আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। এখন এটা সবাইকে মেনে নিতেই হবে। তবে দেখার বিষয় ফেডারেশন কি সিদ্ধান্ত নেয়। পরবর্তীতে লিগ আছে, এখনও লিগ সম্পর্কে কোনো আপডেট পাইনিঅ এরপর বুঝা যাবে সবকিছু। আমাদের নতুন চুক্তির বিষয় আছে, আবার এ বছরেরও চুক্তির বিষয় আছে।

এসএনপিস্পোর্টসঃ সম্প্রতি কোচ জেমি ডে’র চুক্তি বেড়েছে, এই নিয়ে কি বলবেন?

সাদ উদ্দিনঃ জেমি ডে’র সাথে দুই বছরের চুক্তি আমাদের খেলোয়াড়দের জন্য অনেক ভালো হয়েছে। আমরা সবাই জেমিকে ভালোভাবে জানি। আর বড় বিষয় হলো জেমিও আমাদেরকে ভালোভাবে জানে। আমাদের খেলোয়াড়দের সাথে ওর একটা ভালো যোগাযোগ আছে, ভালো বোঝাপড়া আছে। সে যদি আমাদের সাথে আরও দুই/তিন বছর থাকে, তাহলে আমাদের জন্য ভালো হবে, বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য ভালো হবে।

এসএনপিস্পোর্টসঃ নতুন চুক্তি হওয়ার পর জেমি ডে কি জাতীয় দল নিয়ে আপনাদের কোনো বার্তা দিয়েছেন?

সাদ উদ্দিনঃ শুধু নতুন চুক্তি নয়, জেমি ডে সবসময়ই আমাদের সাথে যোগাযোগ রাখে। গতকালও আমাকে মেসেজ পাঠিয়েছে। (সাক্ষাৎকার সম্প্রতি নেওয়া হয়েছে)। আমাদের খেয়াল রাখছে সে। কিভাবে কি মেইন্টেইন করা লাগে, সবকিছুরই আপডেট দিয়ে রাখে সে।

এসএনপিস্পোর্টসঃ এই ক্যারিয়ারের পেছনে যদি কারোর অবদানের কথা বলি, কাদের বলবেন আপনি?

সাদ উদ্দিনঃ দেখেন একজন খেলোয়াড়ের এত বড় জার্নিতে পরিবারের সাপোর্ট অবশ্যই থাকে। ফ্যামিলি সাপোর্ট না থাকলে কেউই এতটা দূর আসতে পারে না। এছাড়া আমাকে যারা সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে তারাও আমাকে সাপোর্ট দিয়েছে অনেক। এরপর আমাদের সোহল ভাই, তিনি আমাকে নিয়মিত অনুশীলন করিয়েছেন পাশাপাশি সাপোর্ট দিয়েছেন। আসলে সবার ভালোবাসা-দোয়াতেই আমি আজকে এই জায়গায় আসতে পেরেছি।

এসএনপিস্পোর্টসঃ ভক্তদের উদ্দ্যেশে করোনার এই দুর্যোগকালীন সময় নিয়ে কিছু বলতে চান?

সাদ উদ্দিনঃ হ্যাঁ, সবার উদ্দেশ্যে একটিই কথা বলবো দেশের পরিস্থিতি খুব খারাপ, যতটুকু সম্ভব সাবধানে থাকার অনুরোধ সবাইকে। সব কাজগুলো যেন সাবধানতা অবলম্বন করে করেন। অযথা যেন কেউ বাইরে ঘোরাফেরা না করেন। আমরা যদি একটু সাবধানে থাকি তাহলেই এই ভাইরাসকে মোকাবেলা করতে পারবো। আর যদি সাবধনতা অবলম্বন না করি, তাহলে আমাদের জন্য খারাপ সময় আসবে। সবার উদ্দ্যেশে বলবো, আমাকে সাপোর্ট করবেন, আমাদের বাংলাদেশ দলকে সাপোর্ট করবেন, এই মহামারীতে সাবধানে থাকবেন, সবাই সবার জন্য দোয়া করবেন। ইনশাল্লাহ ভালো দিন আসবে।

এসএনপিস্পোর্টসঃ আপনাকে ধন্যবাদ।

সাদ উদ্দিনঃ আপনাকেও ধন্যবাদ।

এসএনপিস্পোর্টসটোয়েন্টিফোরডটকম/নিপ্র/সা/০০