রোনালদোর ছুঁড়ে ফেলা আর্মব্যান্ড যখন শিশুর চিকিৎসায় ‘অমূল্য রতন’

বিশেষ প্রতিবেদনঃ আর্বজনা কিংবা বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করার ইতিহাস বহু পুরোনো। কিন্তু সেটিকে অমূল্য সম্পদ বানানোর নজির নেই খুব একটা। তবে তেমনই এক কাণ্ড ঘটেছে সম্প্রতি। যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশ্বখ্যাত ফুটবলার ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এবং ছোট্ট এক শিশুর নাম। তবে এই দু’জনকে এক জায়গায় সঙ্গী করে যে মহান কাজটি সম্পন্ন হয়েছে, তিনি একজন দমকলকর্মী। যার নাম জর্জ ভুকিসেভিচ।

ঘটনাটা সদ্য শেষ হওয়া আন্তর্জাতিক বিরতিতে ইউরোপ অঞ্চলের এক বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ম্যাচকে কেন্দ্র করে। যেখানে ‘এ’ গ্রুপের একটি ম্যাচে মুখোমুখি লড়াইয়ে নেমেছিল সার্বিয়া ও পর্তুগাল। সার্বিয়ার ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত ২-২ গোলে ড্র হয়েছিল। তবে ম্যাচে নিশ্চিত জয় পেতে পারত পর্তুগাল। আর এখানেই ঘিরে আছে মূল বিতর্ক আর রহস্য।

ম্যাচের যোগ করা সময়ে রোনালদোর একটি শট সার্বিয়া গোলরক্ষকের গায়ে লেগে গোললাইন পেরিয়ে যায়। সার্বিয়ার আরও এক ফুটবলার সেটি ক্লিয়ার করলেও পর্তুগালের দাবি ছিল সেসময়, এর আগেই গোললাইন পেরিয়ে গিয়েছিল বল। কিন্তু রেফারির কোনো ধরনের সাড়া মেলেনি। পরবর্তীতে রিপ্লেতে দেখা মিলে সত্যিকার অর্থেই বল পেরিয়ে গেছে গোললাইন। এমন কাণ্ডে মাঠেই ক্ষোভ উগড়ে দেন পর্তুগালের কোচ, ফুটবলাররা এবং কর্তারা।

ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান দলের অধিনায়ক রোনালদো। রেফারি এবং লাইন্সম্যানকে ঘিরে দেখান বিক্ষোভও। পর্তুগিজ অধিনায়ক এই অতিরিক্ত রাগ দেখিয়ে হলুদ কার্ড পর্যন্ত দেখেন (পরবর্তীতে গোল না দেওয়ায় ক্ষমা চেয়েছেন সেই রেফারি)। এরপর ম্যাচ চললেও খেলেননি সিআরসেভেন। ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার কয়েক সেকেন্ড আগেই মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যান। যাওয়ার সময় মাঠের মধ্যেই ছুঁড়ে ফেলে যান অধিনায়কত্বের আর্ম ব্যান্ড।

এই ম্যাচ চলাকালীন সময়েই মাঠে দায়িত্ব পালন করছিলেন স্থানীয় দমকলকর্মী জর্জ ভুকিসেভিচ। রোনালদোর ছুঁড়ে ফেলা আর্ম ব্যান্ডটিকে তিনি মাঠ থেকে কুড়িয়ে নিয়ে নিজের কাছে রেখে দেন। পরবর্তীতে এক স্থানীয় একটি স্পোর্টস চ্যানেলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং দুস্থের সহায়তার কাজে লাগাতে আর্ম ব্যান্ডটি নিলামে তোলার পরিকল্পনা করেন।

ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর ছুঁড়ে ফেলা আর্ম ব্যান্ড কুড়িয়ে তোলা সেই দমকলকর্মী জর্জ ভুকিসেভিচ।

ভুকিসেভিচের উদ্দেশ্য ছিল জটিল রোগে আক্রান্ত ছয় মাস বয়সী এক শিশুর চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের যোগান। বিরল এই রোগে কিনা প্রতি ১০ হাজারে মাত্র একজন শিশু আক্রান্ত হয়। সেই শিশুটির চিকিৎসা কাজে একটি তহবিল সংগ্রহের জন্য পরিকল্পনা করেন ভুকিসেভিচ। এর জন্য ম্যাচের ছবি ও ভিডিও ফুটেজ প্রমাণ সাপেক্ষে দেখাতে বলেন ঐ স্পোর্টস চ্যানেলকে। শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয় নিলাম। যেখানে ৬৪ হাজার ইউরোতে বিক্রি হয় সেই আর্ম ব্যান্ডটি।

এই ৬৪ হাজার ইউরো দিয়ে শিশুটির চিকিৎসার ছোট্ট একটি অংশের ব্যয় বহন করা সম্ভব হবে। কেননা পুরো চিকিৎসা খরচ মেটাতে খরচ হবে ২০ লাখ ইউরো। তাই খুব সামান্য একটা অংশই জোগাড় হয়েছে এই নিলাম থেকে। কিন্তু এই সামান্য অংশ দিয়েই শিশুটি একটু বেঁচে থাকার আশ্বাস পাবে। বিশ্বজুড়ে বইবে মানবতার জয় গান। বার্তা পৌঁছাবে ফেলনা জিনিষ থেকে অমূল্য কিছু বের করে আনার চেষ্টা।

ধর্ম অন্তঃপ্রাণ বাংলায় একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ আছে, ‘উপরওয়ালা যা করেন, সব ভালোর জন্যই করেন’। সেই প্রবাদটির যেন ধ্রুব সত্যতা মিলল ঘটনাটিতে। যদি ম্যাচ রেফারি গোলটি দিয়ে দিতেন, তাহলে নিশ্চিতভাবেই রোনালদো রাগতেন না। ক্ষুব্ধ হয়ে ছুঁড়ে ফেলতেন না আর্ম ব্যান্ডটি। আর সেটিও উঠত না নিলামে। আসতো না ন্যুনতম অর্থটুকু।

কিন্তু ভাগ্যের পরিণতিতে সবকিছুই ঘটেছে উল্টো। জেনে-শুনে নিজ দায়িত্বে কতই না মানবিক কাজ করেন রোনালদো। তবে এবার তাঁর অজান্তেই হয়ে গেল মহৎ একটি কাজ। ঘটনার মূলে গেলে জগৎখ্যাত এই তারকা হয়তো আবার রাগবেন কিংবা দুঃখ পাবেন। কিন্তু পরক্ষণেই হেসে উঠতে পারে তাঁর মন। নিজের মনের প্রশান্তির পাশাপাশি, মনে মনেই হয়তোবা আনন্দ পেতে পারেন অন্যান্যদের একটি দারুণ বার্তা দিয়ে। কে বলতে পারে ছোট শিশুর মনে ফুটতে এক টুকরো হাসি। যে হাসিতে তৃপ্তিতা ছুঁয়ে যাবে পুরো মানবকূল আর পৃথিবীকে।

এসএনপিস্পোর্টসটোয়েন্টিফোরডটকম/নিপ্র/সা