লোহার শিকল ভেঙ্গে বাবার স্বপ্ন পূরণ

ছবি- সংগৃহিত।

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ জন্মের পর যে শিশুর জীবনই ছিলো শঙ্কার মাঝে। তিন বছর বয়সে যার দু পা বাঁকা হয়ে মুড়িয়ে যেতে শুরু করে। ডাক্তার তখন পরিয়ে দিয়েছিলেন লোহার জুতো। সাথে দিয়েছিলেন সর্তকর্বাতা, দৌড়ালেই পঙ্গুত্ব! গল্পটা এমনই ছিল রংপুরের মিঠাপুকুরে জন্ম নেওয়া মুকিদুল ইসলাম মুগ্ধ’র।

সেই লোহার জুতো ভেঙ্গে উঠে দাঁড়িয়েছেন মুগ্ধ। রূপকথার গল্পের মতো তিনি শুধু দাঁড়াননি, সুযোগ করে নিলেন বাংলাদেশের প্রাথমিক টেস্ট স্কোয়াডে। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে এপ্রিলে দুই টেস্টের প্রাথমিক স্কোয়াডে নাম উঠেছে ডানহাতি এই পেসারের। মুগ্ধ এর আগে অনুর্ধ্ব-১৪ থেকে ১৯ খেলেছেন বাংলাদেশের বয়সভিত্তিক দলে। গত বছর দুয়েক হলো, ইমার্জিং দল, এইচপি দল বা ‘এ’ দলে ছিলেন নিয়মিত। গত মার্চে শুরুর পর জাতীয় লিগের প্রথম দুই রাউন্ডে বল হাতে দেখিয়েছেন ঝলক। এবার ডাক পেলেন মুশফিকুর রহিম-মুমিনুল হকদের সাথে টাইগারদের টেস্ট স্কোয়াডে। পঙ্গুত্ব জয় করা মুগ্ধ এ যেন জগদ্দল পাথুরে উপত্যকা উপড়ে ফেলে চাষ করেছেন সুরভিত ফুলের বাগান।

প্রাথমিক দলে সুযোগ পাওয়ায় মুগ্ধের পরিবার উচ্ছ্বসিত। বাবা অপেক্ষায় সন্তানকে জাতীয় দলের জার্সিতে দেখার জন্য। অথচ মিঠাপুকুরে মুগ্ধের জন্মটা ছিল এক যুদ্ধ। সেই যুদ্ধ জয়ী মুগ্ধের ক্রিকেটার হবার বড় কৃতিত্ব তার বাবার। এক সাক্ষাৎকারে মুগ্ধ বলেছিলেন, ‘আমার পুরো ক্যারিয়ারের জন্য বাবার করা ঋণ পরিশোধ করা বড় এক চ্যালেঞ্জের নাম।’

জাতীয় দলের ভাবনা প্রসঙ্গে আগের সাক্ষাৎকারে মুগ্ধের পুরো কথাটি ছিল এমন, ‘মিরপুর মাঠে প্রথম যেদিন অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে ঢুকেছিলাম, সেদিনই মনে মনে বলেছিলাম যে, এই মাঠে একদিন আমি জাতীয় দলের জার্সি গায়ে নামবো। মাঝে যখন চোটের কারণে বেশ কিছুদিন বাইরে ছিলাম, সে সময় বাবা অনেক ভাবে আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। ওই সময়টায় আমার বাবাকে প্রতিবেশীরা আমার নাম করে অনেক টিটকিরি কাটতো। আমার ক্যারিয়ার নাকি শেষ হয়ে গেছে, এমন কথাও বলত। বাবা আমাকে কেবল বলেছিলেন, আমরা দিন এনে দিন খাওয়া পরিবারের মানুষ। তোমার স্বপ্ন সত্যি করতে অনেক পরিশ্রম করছি। এই পরিশ্রমটা বৃথা যেতে দিও না।’

জন্মদাতা বাবার মুখে এমন কথায় উদ্বুদ্ধ মুগ্ধ ঝড় সামলেছেন বেশ। ক্যারিয়ারের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এসেছেন এমন পর্যায়, যা নিয়ে গর্ব করতে বাধ্য হচ্ছেন অতীতে টিটকারি করা সেই প্রতিবেশীরাও! প্রাথমিক স্কোয়াডে ডাক পাওয়ার পর মিঠাপুকুরের সেই শীতলগাড়ি গ্রামের ব্যবসায়ী  মুগ্ধ’র বাবা জাহিদুল ইসলাম বললেন, ‘আমার দীর্ঘদিনের আশা ছিল ছেলে জাতীয় দলে সুযোগ পাবে। আজ আমার আশা পূর্ণ হয়েছে। দেশবাসীর কাছে আমার মুগ্ধ’র জন্য দোয়া চাই। সে দেশের হয়ে খেলুক। দেশের জন্য বল হাতে নিয়ে দৌড়াবে, লড়বে। ভালো খেলে ও যেন জাতীয় দলে স্থান করে নেয়। দেশে-বিদেশে ওর নাম ছড়িয়ে পড়ুক, এ প্রত্যাশা করছি।’

ক্রিকেটে পথচলার শুরুর স্মৃতি মুগ্ধ বললেন এভাবে, ‘২০১২ সালে রংপুরে বিকেএসপির একটা ট্রায়াল হয়েছিল। সেই ট্রায়ালে ভালোই ব্যাটিং করেছিলাম। কিছুদিন পর এক মাসের ক্যাম্পে ডাক পাই। ব্যাটিংটাই করতাম। কিন্তু আমার ৬ ফিট ১ ইঞ্চি উচ্চতা দেখে আখিনুজ্জামান রুশো স্যার (কোচ) আমাকে পেস বোলিং করতে বললেন। এরপর তিনিই আমাকে গাইড করেছেন। গতির ওপর খুব জোর দিতেন তিনি। মতি স্যারও নানান সময়ে অনেক কিছু শিখিয়েছেন।’

মুগ্ধ জাতীয় দলকে প্রতিনিধিত্ব করার স্বপ্নের সিঁড়ি পেয়েছেন। এবার নিজেকে প্রমাণ করেই মূল স্কোয়াডে জায়গা করে নেওয়ার পালা। জাতীয় লিগের ফর্ম যদি শ্রীলঙ্কায় প্রস্তুতি ম্যাচে ধরে রাখতে পারেন তাহলে সুযোগ এসে যেতে পারে আবু জায়েদ রাহি-এবাদত হোসেনদের সাথে ড্রেসিংরুম শেয়ারে। মুগ্ধ বলছেন, ‘আল্লাহর রহমত। অনেক ভালো লাগছে। মা-বাবা, গ্রামবাসী, আমার সর্তীর্থরা সবাই খুশি। সবার কাছ থেকে আমি বিভিন্ন সময়ে সাহস পেয়েছি। আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা ও শুকরিয়া প্রকাশ করছি। এখন আমার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ফিটনেস ধরে রেখে মূল স্কোয়াডে জায়গা করে নেওয়া।’

এসএনপিস্পোর্টসটোয়েন্টিফোরডটকম/নিপ্র/১১০