সাকিব, তিন শব্দের এক গল্প…

সাকিব হাসান রুয়েল:: তার পরিচয় দিতে যাওয়াটা মিছে। মিরপুর থেকে মেলবোর্ন। টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া, পুরো বিশ্ব-জুড়ে এক নামে পরিচিত সাকিব আল হাসান। স্বাধীনতার ১৬ বছর পর ১৯৮৭ সালের আজকের এই দিনে বাবা মাশরুর রেজা ও মা শিরিন রেজার ঘর আলোকিত করে মাগুরায় জন্ম গ্রহন করেন ফয়সাল। যিনি আজকের সাকিব আল হাসান।

আজ ২৪ মার্চ। উনি জন্মেছেন বলেই, বাংলাদেশের পক্ষে রান এসেছে ১০৮৫৫, প্রতিপক্ষের উইকেট পড়েছে ৫৪০টির বেশি। বাউন্ডারি হয়েছে ১০০০ টিরও বেশি; ওভার বাউন্ডারি হয়েছে শ খানেক। গর্জন হয়েছে কোটি কোটি; তাতেই গলা ভেঙেছে লাখ লাখ মানুষের। ক্রিকেট বিশ্বে লাল সবুজের পতাকা চিনিয়েছেন বারবার। ভিলির্য়াস থেকে শুরু করে কোহলি, স্মিথরা সিংহের মতো তাঁর সামনে এসে ফিরতে হয়েছে মাথা নিচু করে।

আমলা, ব্রাউচার, সাঙ্গা, মাহেলারা তার সামনে দূর্গের মতো দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন বার বার; গাঙ্গুলি থেকে শুরু করে ওয়ার্নার, রোহিতরাও ঘূর্ণি বেলকিতে ধরা পড়েছেন তাঁর হাতে। ভাষ্যকারদের কণ্ঠে বেজে উঠেছে, – What a delivery from him, He is the trump card, The Bangladeshi skipper, He is come from BD, What a player he is been!

আজমলের মতো ধ্রুপদি, হেরাথের, অশ্বিনের মতো পরিণত বোলাররাও তুলোধুনো হয়েছেন তাঁর ব্যাটে; ব্রাভো, গুল, বল ছুঁড়ে মনে মনে কেঁদেছেন বার বার; রিয়াজ, নাথানরাও ভয় পেয়েছেন তাঁর হুংকারে; বাংলাদেশ হয়েছে বিশ্বসেরা। তার ব্যাটে-বলের জাদুতে বাংলাদেশ পেয়েছে অসংখ্য জয়। বিশ্ব পেয়েছে সময়ের সেরা অলরাউন্ডার। সাকিব আজকের দিনে জন্ম নিয়েছেন বলেই এতো কিছু সম্ভব হয়েছে। বাবা চেয়েছিলেন ছেলে ফুটবলার হবে। মনে প্রাণে ফুটবল লালন করবে কিন্তু যে ছেলেকে সৃষ্টিকর্তা ক্রিকেটের বাদশা করে পাঠিয়েছেন। সে ছেলে কী করে ক্রিকেট থেকে দূরে থাকবেন। বাবা মাশরুর রেজা বলেছিলেন, ফুটবলই হচ্ছে খেলা। পেলে, ম্যারাডোনা থেকে শুরু করে কত বিখ্যাত বিখ্যাত ব্যাক্তিরা ফুটবল খেলেছেন তুইও ফুটবল খেলবি।

কিশোর সাকিবের তখন উত্তর ছিল “ক্রিকেট খেললে বিশ্বকাপ খেলা যাবে ” সেটাই সত্যি! সাকিব শুধু এখন বিশ্বকাপ খেলে না। বিশ্বকাপ গুলোর মতো বড় বড় মেগা আসরের বড় তারকাদের একজন। বলছিলাম একজন সাকিব আল হাসানের কথা। আসলেন খেললেন এবং বিশ্ব জয় করলেন। দাদা বলেছিলেন, অনেক বড় হতে হবে দাদুভাই; এতো বিখ্যাত হতে হবে যে, দুনিয়ার সবাই জানবে তোমার নাম। যখন তুমি বাড়ী আসবে, সবাই দল বেঁধে ভিড় জমাবে তোমায় দেখতে। দাদুর সেই কথাটা হয়তো সাকিব মনে গেঁথে রাখে। সাকিব কে দেখে এখন তুরুনরা স্বপ্ন দেখে বিশ্বসেরা হওয়ার। হ্যাঁ ২২ জানুয়ারি ২০০৯ সালের আগে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ থেকে বিশ্ব সেরা দূর সেরা একশো-তে ছিলনা। ২২ জানুয়ারি ২০০৯ সালের রৌদ্রজ্জ্বল শীতের সকালে আইসিসি ওডিআই ফর্মেটে বাংলাদেশ থেকে বিশ্বসেরা হওয়ার গৌরব ওর্জন করেন সাকিব আল হাসান। জ্যাক- ক্যালিস, আফ্রিদী, শেন ওয়ার্টসনদের পিছনে ফেলে সাকিব তার নামটি নিয়ে যান সেরাদের প্রথম স্থানে আর যেখানে তার নামের পাশে লাল- সবুজের পতাকাবাহী দেশ বাংলাদেশের নামটি ঝলমল করছে।

তিন শব্দের সাকিব আল হাসান নামটি এখন এক মহাতারকার নাম। আজ থেকে এক যুগ আগে মাগুরায় নাম কয় জনেই বা জানতো? সেই মাগুরা থেকে শুরু মিরপুর, ইডেন গার্ডেন, মেলবোর্ন, হারারে বিশ্বের প্রতিটা ক্রিকেট ভেন্যু সাকিবের পদচারণে ধন্য। গল্প নয়; রূপকথা। ক্রিকেট বলে প্রথম যে বলটা করলেন। তার প্রথম বলেই ব্যাটসম্যানকে বোল্ট করলেন। ওই ম্যাচে তিন উইকেট পাওয়া সাকিব জানান দিয়েছিলেন আমি আসছি ক্রিকেটে রাজ করতে । সাকিব আল হাসানের ভক্ত সংখ্যা ১ লক্ষ ৪৭ হাজার ৬শত ১০ বর্গ- মাইলের গন্ডি ছাড়িয়ে সারা বিশ্বব্যাপী। বছর-দশেক আমরা যখন শচীন, শেন ওয়ার্ণ, ইমরান খান কিংবা কপিল, লারাদের খেলা দেখতাম তখন ওরাই ছিল আমাদের স্বপ্নের নায়ক। খেলা দেখতাম আর বলতাম “ইশ ইমরান, কপিলের মত আমাদের যদি একজন অলরাউন্ডার থাকতো। আমাদের দেশ থেকেও কেউ বিশ্ব সেরা হবে। ইন্টারন্যাশনাল হিরো হবে। হ্যাঁ, আমরা পেরেছি বিশ্বসেরা হতে, আমরা পেয়েছি ইন্টারন্যাশনাল হিরো, সবকিছুই সম্ভব হয়েছে একজন সাকিব আল হাসানের হাত ধরে। যার বোলিং তোপে ব্যাটসম্যান কাপে, যাকে আউট করার জন্য বোলাররা পৃথক প্ল্যান করে। এই সেই হিরো যাকে কেনার জন্য বিশ্বের বড় বড় লিগে কোটি দাম তুলে কাড়াকাড়ি হয়। আমাদের হিরোকে সবাই পেতে চায।

আমাদের এখন কেউ আর শচীন কিংবা ইমরান হতে চায় না। সবাই চায় সাকিব আল হাসান হতে। ২০০৯ সালে ত্রিদেশীয় কাপে ফাইনালে তুলা ৯২ রানের ইনিংস কিংবা কিউদের মাটিতে ২১৭ রানের মহাকাব্য ইনিংস সবাইকে ছাড়িয়ে সাকিব আল হাসান আমাদের ইন্টারন্যাশনাল হিরো। জীবন্ত কিংবদন্তী। চ্যাম্পিয়নস টফ্রিতে ম্যাচ বাঁচানো শতক, শততম টেস্ট ম্যাচে হার না মানা শতক, আফ্রিকার মতো পেস কন্ডিশনে পরপর পাঁচ উইকেট তাঁকে বানিয়েছে এক মহাতারকা। সিপিএলে ছয় উইকেট কিংবা কিউই ক্যারাবীয়দের বাংলা ওয়াশের পিছনে সাকিবের অবধান সবই আজ অতীত। তবে এ দেশের ভবিষ্যৎ ক্রিকেটারদের মনে জায়গা করে নেওয়া তাদের আইডল সাকিব আল হাসান পুরোটাই বর্তমান। ২০০৬ সালের আগে বাংলার ঘরে ঘরে খুঁজলে হয়তো হাতে গোনা কয়েকটা সাকিব নামের ছেলে পাওয়া যেত আর এখন সবাই সাকিব হতে চায়।

সাকিবকে নিয়ে এখন আমরা সবাই ভাবি। মহাকাব্যের চরিত্রের মতো। অকালে চাকরি হারানো ছেলেটিও আলোচনা করে, সাকিবের বল শোয়েব আক্তারদের মতো এতো গতি হয়না তারপরেও উইকেট পাই কি ভাবে? আলফ ভ্যালেন্টাইনকে নিয়ে ক্যারিবিয়ান সেই ক্যালিপ্সো মনে আছে, ‘দৌজ টু লিটল পালস অফ মাইন/ রামদিন অ্যান্ড ভ্যালেন্টাইন। সাকিবকে নিয়ে তো এরকম লেখা যায়ই। সাকিব আল হাসান সময়ের সেরা অলরাউন্ডার। কিন্তু সর্বকালের সেরা হবার সুযোগ কি তাঁর আছে? সাকিবের প্রতিভা নিয়ে সন্দেহ ছিল না কোনকালেই, এখনও নেই। আজ তার ৩২তম জন্মদিন। সবকিছু ঠিক থাকলে হয়তো আরো পাঁচ-ছয় বছর ক্রিকেট চালিয়ে যাবেন। দীর্ঘদিনের ক্যারিয়ার শেষে সাকিব আল হাসান নামটি নিয়ে যাবে অনন্য উচ্চাতায়। তার ক্যারিয়ারের এতোসব অর্জনই বলে দিচ্ছে সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার হওয়া মাত্র সময়ের ব্যাপার। শুভ জন্মদিন সাকিব আল হাসান। শুভ জন্মদিন চ্যাম্পিয়ন।

(এসএনপিস্পোর্টস২৪ডটকম সব সময়ই পাঠকের প্রতি আন্তরিক ও
শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখাটি লেখকের একান্তই নিজস্ব। আমরা সকলের মতামতকেই
গুরুত্ব দেই। লেখকের মতামতের সঙ্গে আমাদের সম্পাদকীয় নীতির মিল নাও থাকতে
পারে।)

এসএনপিস্পোর্টসটোয়েন্টিফোরডটকম/নিপ্র/পাঠক/০০