সাগরিকার ঢেউ দেখতে বিকেএসপি ক্যাডেটরা…

কাইয়ুম আল রনি:: সাগরিকায় উত্তাল ঢেউয়ের দেখা নেই। সমানে সমানে লড়াই চলছে। এই লড়াইয়ে সমুদ্রের গর্জন নেই। নেই উত্তাল সমুদ্রের হুংকার।চট্টগ্রাম টেস্টের তৃতীয় দিন শুক্রবার অর্জনের পাল্লায় কিছু নেই বাংলাদেশের। সময় গড়ানোর সাথে সাথে পাল্লা ভারী হচ্ছে লঙ্কানদের দিকেই। অনেকটা হেলেদুলে সময় কাটাচ্ছেন বাংলাদেশের বোলাররা। ব্যাটসম্যানশীপ দেখাচ্ছে শ্রীলংকা। টেস্ট ধৈর্য্যের খেলা। টেম্পারমেন্টের পরীক্ষা। ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কতো কঠিন, কঠিন সময় আসলে কিভাবে উতরাতে হয়, পাস নম্বর তুলতে হয়, সাফল্য ছিনিয়ে নিতে হয়, সবকিছু পর্যবেক্ষণ করতে জহুর আহমেদ চৌধুরি স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে প্রতিদিনই ৩০/৪০ কিশোরের মেলা বসে। ওরা নানা বয়সের। নানা রঙ্গের। নানা প্রত্যাশা তাদের। লেখা পড়ার ফাঁকে ওরা কত স্বপ্নের মালা গাঁথে।

কেউ হতে চায় সাকিব। কেউ মুমিনুল। কেউবা মিরাজ; কেউবা মাশরাফি-মুস্তাফিজ, কিছু কিশোরের স্বপ্নজুড়ে ড্যাশিং ওপেনার তামিম ইকবাল। কারো চোখে বিশ্বের শক্তিশালী দলকে বড় হয়ে সুযোগ পেয়ে ছত্রখান করার প্রতিজ্ঞা। বাংলার পতাকাকে সমুন্নত আর রক্ষা করার চ্যালেঞ্জ। কিশোর তরুণরা কারা?

বলছি চট্টগ্রামের বিকেএসপির কথা। বিকেএসপির ক্যাডেট কিশোররা গড়ে উঠছে বুক ভরা আশা নিয়ে। আধুনিক প্রশিক্ষণে। ২২ জগের প্র্যাকটিক্যাল নলেজের ফায়দা তুলতে বড় ভাইদের লংকা মিশনের পরীক্ষা সরাসরি হাতেনাতে ওরা দেখছে, ভুলত্রুটি শিখছে মাঠের বাইরে থেকে।

বাস্তব দীক্ষার সাথে সামাজিক পরিসরে বড় হয়ে ওঠার চ্যালেঞ্জগুলোকে হাতের মুঠোয় পাচ্ছে ওরা। কিশোরদের সঙ্গে কথা বললেই, ওরা নানারকম প্রত্যয়ের কথা বলে। অনেকেরই বাবা-মার স্বপ্ন ছেলে হোক শিক্ষিত মার্জিত একজন খেলোয়াড়। যার আলো-দীক্ষা কাজে আসবে, উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা হবে সমাজে, সকলের কাছে।

পরিবারের স্বপ্ন বুকে লালন করে ওরা  কষ্ট করে বড় হচ্ছে একটা কারণে, দেশকে বিশ্বদরবারে সঠিকভাবে রিপ্রেজেন্ট করতে। চাঁদপুরের কিশোর শমসের হায়দার রবি। কখনো বাবা-মায়ের আচলের বাইরে যেতে হয়নি তাঁকে। মা-বাবা আর ভাই বোনদের দূরে রেখে বাসার বাইরে যাওয়া হতো না আগে। তবে সবকিছুই ছেড়ে আসতে হয়েছে। প্রিয় মায়ের ভালোবাসা, বাবার আদর আর ভাই-বোনদের আলিঙ্গন দূরে রেখে শমসের চলে এসেছে সাগরিকার কুলে। স্বপ্ন একটাই হতে হবে শিক্ষিত একজন ক্রিকেটার।

পরিবার নিয়ে আবেগাপ্লুত শমসের হায়দার বলেন, প্রথম যেদিন বিকেএসপি থেকে ফোন আসে বাবার মোবাইলে, তখনকার অনুভূতি কোনদিন প্রকাশ করা যাবে না। কষ্ট হচ্ছিলো এবার সবাইকে ছেড়ে আসতে হবে। বিকেএসপিতে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার আনন্দ ছাপিয়ে কান্না করছিলাম। বাবা আমাকে বললেন ‘ যা বাবা, বিকেএসপিতে সুযোগ পেয়েছিস। একজন শিক্ষিত খেলোয়াড় হউ।’

নীলফামারির অনীক সাকি’র স্বপ্ন সাগরিকার ২২ গজে হাজারো মানুষের সামনে সে দেশের হয়ে লড়াই করবে। বিশ্বের বুকে তুলে ধরবে প্রিয় বাংলাদেশকে। অনিকের কথায় শুনুন, ‘আমি একদিন এই ভাবে এখানে খেলতে চাই। সবাই আমার খেলা দেখবেন। আমি বিশ্বের সেরা একজন ক্রিকেটার হতে চাই।’

ঠাকুরগাঁওয়ের জারিফের কষ্ট হয়। সে কষ্ট মা-বাবার জন্য। তবে সেই কষ্ট সে ভুলে যায় যখন প্র্যাকটিসে নেমে পড়ে। স্যাররা যখন আগামির তারকা হওয়ার স্বপ্ন দেখান, তখন আর কোন কষ্ট থাকে না তাঁর।

আগামির এসব তারকাদের শুধু ক্রিকেটার নয়, ভালো মানুষ করে গড়ে তুলতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। তাই ‘কঠোর’ অনুশীলনের সাথে তাদের স্কুলেও যেতে হয়। পরীক্ষা দিতে হয়। ২২ গজের মতো স্কুলে সেরা হতে হয়। বিকেএসপির স্কুলের প্রধান শিক্ষক নাজমুল পলাশ সঙ্গেও কথা হয়। তিনি এসএনপিস্পোর্টসকে বলেন, ‘আমরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরেও এদের সামাজিক নানা কাজ সম্পর্কে উৎসাহ দেই। খেলার বাইরেও এরা সমাজের অন্য সবার মতো, অন্য সব কারিকুলামের শিক্ষার্থীদের মতো করে বুঝতে শেখে; পাঠদান করে। নিজেদের অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবার জন্য উৎসাহিত হয়।’

প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কোচ হাবিবুর রহমান রিপন বলেন, ‘এরা অনেক মেধাবী। অনেক বড় হবার স্বপ্ন দেখে কিশোররা। আমরা ওদের আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করে গড়ে তোলার জন্য নানা প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। অনেক উদীয়মান ক্রিকেটার উঠে আসবে আগামীতে আমরা বিশ্বাস রাখি। বাংলাদেশ ক্রীড়াশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিকেএসপির তারকা ক্রিকেটার আজ বাংলাদেশের ক্রিকেটে এগিয়ে নিচ্ছে। আগামীতেও নিবে এই বিশ্বাস রাখি।’

কোচ মির্জা কাউসার জানান, এদের প্রত্যেকের মনে বিশাল একেকটা স্বপ্ন। এগিয়ে যাওয়ার প্রতিজ্ঞা নিয়ে এরা নিজেদের সঙ্গে লড়াই করছে। ‘কঠোর’ অনুশীলন করছে। আশা করি এখান থেকেই বেরুবে আগামির সাকিব-তামিমরা।

এসএনপিস্পোর্টসটোয়েন্টিফোরডটকম/নিপ্র/০০