সিং যুবরাজ নাকি সিংহ যুবরাজ

ছবিঃ সংগৃহিত।

জীবনের গল্পে যে যুবরাজ এক হার না মানা বীরের নাম। বীর হবেনই না বা কেন তিনি? যে মানুষটা সরাসরি ঈশ্বরের সাথে ডিল করেন, যা চাও, তাই-ই নিয়ে নাও। ইচ্ছে করলে জীবনটাও। কিন্তু বিনিময়ে বিশ্বকাপটা দিয়ে দাও!‌ সেই মানুষটাকে বীর না বলে উপায় আছে! তবে ঈশ্বর ঠিকই পরীক্ষার জীবনটা প্রায় নিয়েই নিয়েছিলেন। কিন্তু, ঐ যে বীরত্বগাঁথা জীবন। হয়তোবা এজন্যই স্বয়ং ঈশ্বরও করুণা করেছেন যুবরাজের উপর। তাই তো ক্যান্সারের মতো প্রাণঘাতী রোগকে পরাজিত করার শক্তি দিয়ে যুবরাজকে বানিয়েছেন ‘মহানায়ক’।

সাগর রায়ঃ যুবরাজ সিং! নামের ভারেই স্পষ্ট মানুষটা পাঞ্জাবি। এই মানুষগুলো প্রচণ্ড শক্তিশালী হয় মনের দিক দিয়ে। শারিরিকভাবেও বেশ বলশালী। স্বাভাবিকভাবেই যুবরাজ সিংয়ের রক্তে মিশে আছে সেটি। কিন্তু, সেটা ন্যুনতম মাত্র। স্বাভাবিকের চেয়েও যুবরাজের শক্তি কতটা প্রকট তা ক্রিকেট বিশ্ব টের পেয়েছে হারে হারে। জীবনের গল্পে যে যুবরাজ এক হার না মানা বীরের নাম।

বীর হবেনই না বা কেন তিনি? যে মানুষটা সরাসরি ঈশ্বরের সাথে ডিল করেন, যা চাও, তাই-ই নিয়ে নাও। ইচ্ছে করলে জীবনটাও। কিন্তু বিশ্বকাপটা দিয়ে দাও!‌ সেই মানুষটাকে বীর না বলে উপায় আছে! ঈশ্বর ঠিকই পরীক্ষার জীবনটা প্রায় নিয়েই নিয়েছিলেন। কিন্তু, ঐ যে বীরত্বগাঁথা জীবন। হয়তোবা এজন্যই স্বয়ং ঈশ্বরও করুণা করেছেন যুবরাজের উপর। তাই তো ক্যান্সারের মতো প্রাণঘাতী রোগকে পরাজিত করার শক্তি দিয়ে যুবরাজকে বানিয়েছেন মহানায়ক।

সময়টা ২০০৭ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর। দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত সেই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে স্টুয়ার্ট ব্রডকে ছয় বলে ছয় ছক্কার মার আজও ইতিহাসের পাতায় চির অমলিন। সেই ম্যাচেই ১২ বলে ৫০ রানের কীর্তি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এখন পর্যন্ত ভাঙতে পারেনি কেউই। সেবার তরুণ অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনির অধিনায়কত্বে বিশ্বকাপ জিতেছিল ভারত।

২০১১ সালে ঘরের মাঠে ওয়ানডে বিশ্বকাপ শুরুর আগে যে শরীরের সাথে রীতিমতো যুদ্ধ করেছিলেন যুবরাজ। দক্ষিণ আফ্রিকায় ওয়ানডে সিরিজ খেলতে গিয়ে কাশির সাথে হচ্ছিল রক্তপাত। ফুসফুসে টিউমার ধরা পড়লেও, তবে সেসবকে পাত্তা দেননি। শুধু দেখেই যাচ্ছিলেন কত সময় চলতে থাকে সেটি। রাত কেটেছে নির্ঘুমতায়। ম্যাচের মাঝে এক রানকে দ্রুততার সহিত দুই করতে গিয়ে অনবরত হাঁপানি উঠেছিল। স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসে আসছিল বাঁধা। কিন্তু, তখনও যুবরাজের এসব নিয়ে কোনো হুশ-জ্ঞান নেই। কেননা সামনেই যে বিশ্বকাপ। সেটিও আবার ঘরের দোয়ারে। কিন্তু্, নিধারুণ কষ্টে কাটিয়েছিলেন বিশ্বকাপটা। রক্তবমি, শ্বাসকষ্ট আর নির্ঘুমভাবে সাত সপ্তাহ কেমন যে শারীরিক যন্ত্রণায় কাটিয়েছিলেন সেটা তো একমাত্র তিনিই জানেন।

বিশ্বকাপ চলাকালে একটি ম্যাচের মাঝেই তো দেখা দিয়েছিল সমস্যা। উইন্ডিজের বিপক্ষে ম্যাচে তো বসেই পড়েছিলেন একেবারে। ২২ গজের পাশেই করেছিলেন বমি। প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট নিয়ে তিনি লড়াই করে গিয়েছিলেন। কী আশ্চর্যজনক ব্যাপার, সেই ম্যাচেই ১২৩ বলে ১১৩ রানের দুর্ধর্ষ এক ইনিংস খেলেছিলেন পাঞ্জাব তনয়। ফাইনালের আগের দিন ঈশ্বরের সাথে হওয়া যুবরাজের ডিল অনুসারেই ঈশ্বর সেদিন কথা রেখে ২৮ বছর পর দ্বিতীয় বিশ্বকাপের স্বাদ দিয়েছিল ভারতকে। মুম্বাইয়ের বিখ্যাত ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে উপস্থিত দর্শকসহ দেশের প্রায় ১৩০ কোটির সামনে যুবরাজকেও অনন্য সম্মান দিয়েছিলেন ঈশ্বর। বিশ্বকাপের সেই আসরের সেরা খেলোয়াড়ের পুরষ্কারটা যে এই বাঁহাতি ক্রিকেট যোদ্ধার হাতে উঠেছিল।

দু’হাত ভরে ঈশ্বর যখন সম্মান দিয়েছেন, প্রতিদানে যুবরাজের প্রাণটাও যে অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছিলেন প্রায়। ২০১২ সালে আঙ্গুলের ইনজুরিতে তখন দলের বাহিরে যুবরাজ। কিন্তু, সে বছরের জানুয়ারিতে এলো দুঃসংবাদ। ব্রেন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন যুবরাজ। মূহুর্তেই ক্রিকেট বিশ্ব ছেয়ে গিয়েছিল অন্ধকারে। কিন্তু, লড়াই করার নেশা যার রক্তে, সেই যুবরাজ কি আর এত সহজে হার মানবেন! মানেনওনি। ২৫ জানুয়ারি থেকে শুরু হয় চিকিৎসা। মৃত্যুভয়ের সাথে ৬ মাসের লড়াই শেষে সুস্থ হয়ে উঠেন তিনি। কেমোথেরাপির বিছানা ছেড়ে আবারও সবুজ গালিচায় নেমে পড়েন ব্যাট-বল নিয়ে।

শুরু করেন নিজের প্রত্যাবর্তনের অধ্যায়। সবাইকে অবাক করে দিয়ে ২০১২ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ দলে জায়গা করে নেন। এ যেন অনন্য অসাধারণ কাব্য। পরবর্তীতে আইপিএলে এক আসরে দুই হ্যাটট্রিকের রেকর্ড কিংবা ফ্র্যাঞ্চাইজির ইতিহাসে নিলামে ১৬ কোট রুপিতে বিক্রি হওয়ার রেকর্ড ছিল সেই কাব্যের একেকটা খণ্ডিত অংশ। ২০০০ সালে অভিষেকের পর থেকে দেশের জার্সিতে ৪০ টেস্টে ১৯০০ রানের সাথে ৯ উইকেট, ৩০৪ ওয়ানডেতে ৮৭০১ রান ও ১১১ উইকেট, ৫৮ টি-টোয়েন্টিতে ১১৭৭ রান এবং ২৮ উইকেট জানান দেয় কতটা সমৃদ্ধ অলরাউন্ডার ছিলেন তিনি। একইসাথে স্বীকৃত ক্রিকেটে ২৬,৪৮৫ রানের সঙ্গে ২৮৭ উইকেট জানান দেয় কতটা বর্ণাঢ্যময় ক্যারিয়ার যুবরাজের।

অথচ, ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস শুরুতে ক্রিকেটারই হতে চাননি যুবি। বাবা-মায়ের ছাড়াছাড়ি হওয়ায় এমনিতেই ছোট বেলা থেকে অন্তর্কোন্দলের শেষ ছিল না পরিবারে। এর মাঝে বাবা সাবেক ক্রিকেটার যোগরাজ সিং যেভাবেই হোক ছেলেকে ক্রিকেটার বানানোর পণ করেছিলেন। নিজে বড় ক্রিকেটার হতে না পারার ইচ্ছাটা ছেলের মাধ্যমে পূরণ করে ছাড়বেনই তিনি। অনেকটা আমির খানের ব্লকবাস্টার দঙ্গল সিনেমার মতো। কনকনে শীতের ভোরে বিছানার মাঝে জল ঢেলে ছেলেকে ঘুম থেকে উঠিয়ে দৌড়তে নিয়ে যাওয়া কিংবা রঞ্জিতে বোকা শট খেলে আউট হওয়ায় বাড়ি ফেরার পর ছেলের দিকে জলভর্তি কাচের গ্লাস ছুঁড়ে মারার মতো তিক্ত কাজগুলো করেছিলেন যোগরাজ। বাবা যোগরাজকে তাই ঘেন্না করা শুরু করেছিলেন তিনি। রোলার স্কেটিংয়ে মেডেল এনে দিলেও মন গলাতে পারেননি বাবার। বলা চলে এক প্রকার চাপে পড়েই ক্রিকেটার হয়েছিলেন যুবরাজ।

ক্যারিয়ারে বাদ পড়াসহ নানা উত্থান-পতন, চড়াই-উতরায় দেখেছেন যুবরাজ। নামের পাশে রয়েছে অসংখ্য বিতর্ক। রয়েছে আইপিএলে দলকে ডুবানোর অভিযোগ, ইচ্ছাকৃতভাবে ম্যাচ হারার অভিযোগ। ক্ষণে ক্ষণে রঙ পাল্টানো জীবনে সবকিছুকে ছাপিয়ে আবারও উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো ফিরেছেন। প্রতিটা ক্ষেত্রে রোমাঞ্চ ভরপুর আছে যুবরাজের জীবনিতে। তাইতো তিনি ভারতীয় ক্রিকেটের এক অন্যতম কিংবদন্তি। জীবনযুদ্ধের কাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে চলা সেই যুবরাজ সিং আজ ৩৮ বছর পেরিয়ে পা রেখেছেন ৩৯ বছরে। জন্মদিনে শুভেচ্ছা নেবেন ভারতীয় ক্রিকেটের ধ্রুবতারা।

এসএনপিস্পোর্টসটোয়েন্টিফোরডটকম/নিপ্র/সা/১১০