সিলেট টি-টোয়েন্টি ব্লাস্টঃ ক্রিকেটাররাই যেখানে সফল সংগঠক

আশিক উদ্দিনঃ জাতীয় পুলের ক্রিকেটারদের বাইরে প্রচুর ক্রিকেটার ঘরোয়া ক্রিকেটের আয়ে জীবন নির্বাহ করেন। প্রিমিয়ার লিগ, এনসিএল, বিসিএল বা ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলো থেকেই তাদের মূল রুটি-রুজি। কিন্তু গত এক বছর ধরে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি তাদের ফেলেছে বিপাকে। মাঠে নেই লিগ, দেশের অনেক স্থানে নেই অনুশীলনের পর্যাপ্ত সুযোগও। ফলে ঘরোয়া ক্রিকেট খেলা ক্রিকেটারদের আর্থিক সংকট যেমন দেখা দেয়, তেমনি মরচে ধরার ভাব আসে স্কিলেও। এমন পরিস্থিতি কাটাতে এগিয়ে আসেন বিভিন্ন বিভাগের ক্রিকেটাররাই। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তাব্যক্তিরা যেখানে কোভিড-১৯’র প্রকোপ, আর্থিক ক্ষতিগ্রস্থের কারণ দেখিয়ে ঘরোয়া লিগ বন্ধ রেখেছেন, লিগে অংশ নিতে অনীহা প্রকাশ করেছেন সেখানে আয়োজকের ভূমিকায় আবির্ভাব ঘটে জাতীয় দলে বা বিভাগীয় দলে খেলা ক্রিকেটারদের। করোনা পরবর্তী সময়ে ময়মনসিংহ, নড়াইল ও রাজশাহীর মত অঞ্চলে টি-টোয়েন্টি লিগ আয়োজন হয়েছে। যার নেপথ্যে মূলত ক্রিকেটাররা।

বিভাগীয় শহর সিলেটেও জমজমাট এক টি-টোয়েন্টি লিগের আয়োজন দেখেছে ক্রিকেট বিশ্ব। ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক এই লিগের মূল আয়োজক সিলেট ক্রিকেটার্স এসোসিয়েশন। স্থানীয় প্রথম বিভাগ লিগ মাঠে না গড়ানোয় এ অঞ্চলের ক্রিকেটাররা যখন শঙ্কার মুখে তখন ত্রাতা হিসেবে এগিয়ে আসে সিলেট ক্রিকেটার্স এসোসিয়েশন। আয়োজন করে ফ্র্যাঞ্চাইজি ভিত্তিক টি-টোয়েন্টি লিগ। যেখানে মুমিনুল হক, সাব্বির রহমান, ইমরুল কায়েস, আরিফুল হক, ফরহাদ রেজাদের মত জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের সাথে ড্রেসিংরুম ভাগাভাগি করেছেন সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন একাডেমির উঠতি ক্রিকেটাররা। বিভাগীয় ক্রিকেটারদের সাথে বাইরের কোটায় খেলে গেছেন সাব্বির-মুমিনুল-আরিফুলরা। তার আগে হয়েছে অভিজাত এক কনভেনশন হলে এই ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের প্লেয়ার্স ড্রাফট। যেখান থেকে অংশগ্রহণকারী ৫ ফ্র্যাঞ্চাইজি তাদের পছন্দের খেলোয়াড়দের নিয়ে সাজায় দল। মধ্য ফেব্রুয়ারিতে কৃত্রিম আলোয় উদ্বোধনী ম্যাচ দিয়ে মাঠে গড়ায় সিলেট টি-টোয়েন্টি ব্লাস্ট। যার সমাপ্তি ঘটে শনিবার। টুর্নামেন্টের সবগুলো ম্যাচই হয়েছে সিলেট জেলা স্টেডিয়ামে। যার মধ্যে আবার চারটি ম্যাচ হলো কৃত্রিম আলোয়।

সিলেটের মাঠে এমন লিগ আয়োজনে বাহবা দিচ্ছেন ক্রীড়া সংগঠকরা। লিগে খেলা ক্রিকেটারদের মুখেও ফুটেছে হাসি। প্রশংসায় ভাসছে সিলেট ক্রিকেটার্স এসোসিয়েশন। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড পরিচালক শফিউল আলম চৌধুরি নাদেল ভূয়সী প্রশংসা করেছেন আয়োজকদের। শনিবার লিগের ফাইনাল খেলা শেষে নাদেল বলেন, ‘সিলেটের মাঠে এমন লিগ অনেক প্রশংসার দাবি রাখে। আমি আয়োজকদের ধন্যবাদ জানাতে চাই। এত সুন্দর একটি আয়োজন নিশ্চয় সিলেটের ক্রিকেটকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।’

সিলেট টি-টোয়েন্টি ব্লাস্ট প্রশংসা কুড়িয়েছে সিটি কর্পোরশন মেয়র আরিফুল হকেরও। ফাইনাল শেষে এসএনপিস্পোর্টসের সাথে আলাপকালে আরিফ বলেন, ‘করোনা মহামারির পর এরকম ক্রিকেট উৎসবে মেতে উঠতে পেরে আমি খুব আনন্দিত। আমাদের দল চ্যাম্পিয়ন হয়েছে এজন্য আরো ভালো লাগছে। প্রথম বিভাগ লিগ মাঠে না গড়ানোয় ক্রিকেটাররা বেশ হতাশ ছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত অনেক ক্রিকেটার খেলতে পেরেছেন সিলেট ক্রিকেটার্স এসোসিয়েশনের আয়োজনে। আমি আয়োজকদেরকে ধন্যবাদ দিতে চাই, যারা সফলভাবে একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ শেষ করেছে। আমি ভবিষ্যতেও তাদের সাথে থাকব। এই লিগ সিলেটের নতুন ক্রিকেটার তৈরী করতে সাহায্য করবে বলে আমি মনে করি।’

জাতীয় দলের ক্রিকেটার ফরহাদ রেজা বলেন, ‘আমি এখানে খেলতে আসতে পেরে খুব খুশি। জাতীয় দলের বাইরে এটিই একটি লিগ যেখানে কোকাবুরা বল দিয়ে খেলা হচ্ছে। যেটি খেলার মান বাড়িয়ে দিচ্ছে। এরকম লিগ হওয়া মানে নতুন ক্রিকেটার বের হয়ে আসা। সিলেট থেকে আরো ক্রিকেটার বাংলাদেশ দলে প্রতিনিধিত্ব করবে আমি আশাকরি।’

সিলেট ক্রিকেটার্স এসোসিয়েশনের তথ্য ও প্রচার সম্পাদক ইমরান আলী এনাম বলেন, ‘আমাদের ক্রিকেটার্স এসোসিয়েশনের মূল লক্ষ্যই ছিল মাঠে ক্রিকেট চালু রাখা। সেটা যে শুধু বিভাগীয় দলের ক্রিকেটাররা খেলবে সেটা না। বিভাগীয় দলের বাইরের ক্রিকেটাররা যেন খেলতে পারে মাঠে এমন লক্ষ্য নিয়েই আমরা এগোচ্ছিলাম। যার সুবাদেই ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের আয়োজন করেছি। এর আগে গত বছরের শুরুতে আমরা আরেকটি লিগ করেছি। সবশেষ অক্টোবরে করোনার প্রকোপকে পাশ কাটিয়েও মাঠে ক্রিকেট আয়োজন করেছি।’

সিলেট প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লিগ নিয়ে এনাম বলেন, ‘আমরা চাচ্ছিলাম নভেম্বর-ডিসেম্বরে লিগ আয়োজন করুক জেলা ক্রীড়া সংস্থা। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে কর্তারা লিগ বন্ধের ঘোষণা দেন। তারপর আমরা মাঠের খেলা ফিরিয়ে আনতেই এই ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ করা। এটা আসলে কাউকে দেখানোর জন্য না, আমরা মাঠের খেলা ফেরানোর লক্ষ্যেই টি-টোয়েন্টি লিগ আয়োজন করেছি। আগামীতেও আমরা চেষ্টা করব এরকম লিগ আয়োজন করার।’

সিলেট ক্রিকেটার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি এনামুল হক জুনিয়র ও সাধারণ সম্পাদক আহমেদ সাদিকুর তাজিনের নেতৃত্বাধীন এই কমিটি বেশ নাম কুড়িয়েছে সিলেট টি-টোয়েন্টি ব্লাস্ট সফল আয়োজন করে। এই টি-টোয়েন্টি লিগের আগে অবশ্য আরো দুটি লিগ সম্পন্ন করেছেন তারা। যার সবশেষটি গত অক্টোবরে। সিলেট বিভাগীয় দলের ক্রিকেটারদের অংশগ্রহণে আয়োজিত হয়েছিল টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট। বিসিবি ছাড়া যেটি ছিল করোনাকালে ঢাকার বাইরের প্রথম কোনো ক্রিকেট লিগ।

করোনার অজুহাতে সিলেট প্রথম বিভাগ লিগ এবার হচ্ছে না বলে আগেই জানা গেছে। যার ফলে তৃণমূলের পেশাদার ক্রিকেটাররা ছিলেন সংকটে। তাদের সেই অর্থনৈতিক সংকট দূর করার সঙ্গে মাঠের খেলা ফিরিয়ে আনার ভাবনা শেষ পর্যন্ত এমনভাবে বাস্তবায়ন করল সিলেট ক্রিকেটার্স এসোসিয়েশন। এ যেন সিলেট লিগ না হওয়া কোনো এক অদৃশ্য শক্তির অহম মাটিতে নামিয়ে আনা!

 

এসএনপিস্পোর্টসটোয়েন্টিফোরডটকম/নিপ্র/১১০