সেঞ্চুরির অপেক্ষায় ম্যাথিউজ, হতাশায় দিন শুরু বাংলাদেশের

নিজস্ব প্রতিবেদক:: লঙ্কানদের যেখানে চেপে ধরার কথা, দ্রুত উইকেট নিয়ে প্রতিপক্ষকে অলআউটের পরিকল্পনা ছিলো টাইগারদের, সেখানে দারুণ প্রতিরোধ গড়েছেন অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউজ ও দিনেশ চান্দিমাল। দু’জনের দৃঢ় ব্যাটিংয়ে দিনের শুরুটা হতাশায় শেষ হয়েছে বাংলাদেশের। প্রথম সেশনে সফরকারীদের কোনো উইকেটই ফেলতে পারেননি স্বাগতিক বোলাররা।

মুমিনুলদের করা ৩৬৫ রানের জবাবে ভালোই জবাব দিলো সফরকারীরা। হোম অব ক্রিকেটে ৩৬৫ রান টপকে লিড নিয়েছে করুনারত্মের দল। লাঞ্চ ব্রেকে যাওয়ার আগে দলটি ৪ রানের লিড নিয়েছে। সেঞ্চুরির অপেক্ষায় আছেন ম্যাথিউজ। ৯৩ রানে অপরাজিত থেকে লাঞ্চ ব্রেকে গেছেন তিনি। ৬১ রানে অপরাজিত আছেন দিনেশ চান্দিমাল। প্রথম সেশন শেষে সফরকারীদের সংগ্রহ ১৩০ ওভারে ৫ উইকেটে ৩৬৯ রান। ষষ্ঠ উইকেটে শতরানের পার্টনারশীপ গড়েছেন দু’জনে।

চতুর্থ দিন সকালে প্রথম সেশনে বাংলাদেশ কোনো উইকেটের দেখা পায়নি। ৫ উইকেটে ২৮২ রান নিয়ে চতুর্থ শুরু করে সফরকারী দলটি। আগের বৃষ্টিতে এক সেশনেরও বেশি খেলা পণ্ড হয়ে যায়। আম্পায়াররা তাই আজ আধঘন্টা আগেই শুরু করেন খেলা।

তৃতীয় দিন উইকেটের আশায় থাকা বাংলাদেশ প্রথম সেশনে দুই উইকেটের পর পঞ্চম উইকেটের জন্য শেষ বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়ে। চতুর্থ সকালে এখনো পর্যন্ত উইকেটের দেখা পায়নি টাইগাররা।

দ্বিতীয় সেশন বৃষ্টি কেড়ে নেওয়ায় লঙ্কান ব্যাটারদের পরীক্ষায় ফেলতে পারেননি বাংলাদেশের বোলাররা। তবে তৃতীয় সেশনে খেলা শুরু হওয়ার পর স্বাগতিক বোলাররা খুব একটা চাপ সৃষ্টি করতে পারেননি। ভেজা মাঠ আর নতুন বলের সুবিধায়ও উইকেটের দেখা পাননি এবাদত-খালেদরা। আজ সকালে খেলা শুরুর আঘন্টা পেরিয়ে গেলেও উইকেটের অপেক্ষায় আছে টাইগাররা।

তবে তৃতীয় দিন নিরাশ হতে যাওয়া টাইগার সমর্থকদের শেষ সময়ে আশা দেখান সাকিব আল হাসান। শেষ বিকেলে লঙ্কান ব্যাটার ধনাঞ্জয়াকে তিনি ফিরিয়েছেন সাজ ঘরে। তার আগে অবশ্য এই ব্যাটার ম্যাথিউজকে নিয়ে পঞ্চম উইকেটে শতরানের জুটি গড়েন। ১০২ রানের জুটি গড়ে ব্যক্তিগত ৫৮ রানে ইনিংসের ৮৮তম ওভারের পঞ্চম বলে সাজঘরে ফিরেন তিনি। সাকিবদের আবেদনে আম্পায়াররা সাড়া দেননি। রিভিউ নিয়ে সফল হয় বাংলাদেশ। চার চার ও এক ছয়ে ১৪৩ বলে নিজের ইনিংসটি সাজান তিনি। লঙ্কানদের দলীয় ২৬৬ রানে বাংলাদেশ পায় পঞ্চম উইকেটের দেখা। লঙ্কানরা দিন শেষ ৯৭ ওভারে ৫ উইকেটে ২৮২ রান তুলেছে। ৫৮ রানে ম্যাথিউজ ও ১০ রানে চান্দিমাল অপরাজিত আছেন।

দিনের প্রথম সেশনে সাকিব-এবাদত যখন লঙ্কান দুই উইকেট নিয়ে চেপে ধরেছেন, উইকেটে টিকে থাকার লড়াইয়ে ম্যাথিউজ-ধনাঞ্জয়া, তখনি এলো বৃষ্টি। বৃষ্টিতে খেলা বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত ৭০.১ ওভারে লঙ্কানদের সংগ্রহছিলো ৪ উইকেটে ২১০ রান।

দুই উইকেটে ১৪৩ রান নিয়ে দ্বিতীয় দিন শুরু করা শ্রীলঙ্কা ১৫২ রানে হারায় দলীয় তৃতীয় উইকেট। আগের দিন শুন্য রানে অপরাজিত থাকা কাসুন রাজিথা রানের খাতা খুলার আগেই ফিরেছেন সাজঘরে ইনিংসের ৪৭তম ওভারের দ্বিতীয় বলে।

এবাদতের পরপরই লঙ্কান শিবিরে ধাক্কা দেন সাকিব আল হাসান। বাংলাদেশের পথের কাটা হয়ে উঠা করুনারত্মেকে ফিরিয়েছেন সাকিব। আগের দিন দু’বার জীবন পাওয়া এই লঙ্কান ব্যাটারকে আজ আর সুযোগ দেয়নি টাইগাররা। ইনিংসের ৫৬তম ওভারের শেষ বলে দলীয় ১৬৪ রানে চতুর্থ উইকেট হারায় সফরকারীরা। ব্যক্তিগত ৮০ রানে সাজঘরে ফিরেন করুনারত্মে। ১৫৫ বলের ইনিংসে ৯টি বাউন্ডারি হাঁকিয়েছেন তিনি।

বাংলাদেশের হয়ে এখন পর্যন্ত সাকিব ৩টি ও এবাদত ২টি উইকেট লাভ করেন।

এর আগে বাংলাদেশের করা ৩৬৫ রানের জবাবে শ্রীলঙ্কা দ্বিতীয় দিন শেষ করে দুই উইকেটে ১৪৩ রানে। তবে দ্বিতীয় দিনটা পুরোটাই বাংলাদেশের হতে পারতো। এবাদতের করা ২৬তম ওভারে এলবিডাব্লিউ হয়ে যদি করুনারত্মে ফিরে যেতেন সাজঘরে। কিন্তুু বাংলাদেশ রিভিউ না নেওয়ায় অর্ধশতকের আগে সে যাত্রায় বেঁচে যান এই ওপেনার। পরের ওভারেই আবারো সুযোগ ছিলো বাংরাদেশের লঙ্কানদের এই ব্যাটারকে ফেরানোর।

২৭তম ওভারে তাইজুল ক্যাচ তুলতে বাধ্য করেছিলেন করুনারত্মকে। কিন্তুু ক্যাচ হাত বন্দী করতে পারেননি মাহমুদুল হাসান জয়। শেষ পর্যন্ত এই ব্যাটারই লঙ্কানদের টানছেন। যদিও এবাদত ওই ওভারেই ওপেনার ফার্নান্দোকে ফিরিয়েছেন। শেষ বিকেলে সাকিবও শিকার করেছেন এক উইকেট।

নিজেদের প্রথম ইনিংসে ব্যাটিংয়ে নামা শ্রীলঙ্কা দুই ওপেনারের ব্যাটে দারুণ শুরু পায়। ওশাদা ফার্নান্দো ও করুনারত্মে দু’জনে মিলে যোগ করেন ৯৫ রান। ইনিংসের ২৬তম ওভারের ৫ম বলে ফার্নান্দোকে ব্যক্তিগত ৫৭ রানে এবাদত সাজঘরে পাঠালে ভাঙে সফরকারীদের উদ্বোধনী জুটি। তার বিদায়ের পর উইকেটে নামা কুশল মেন্ডিসকেও অবশ্য বেশিক্ষণ টিকতে দেননি সাকিব আল হাসান। দলীয় ১৩৯ রানের মাথায় লঙ্কানরা দ্বিতীয় উইকেট হারায়। ইনিংসের ৪৪তম ওভারের প্রথম বলে সাকিব এলবিডাব্লিউ’র ফাঁদে ফেলেন মেন্ডিসকে। ৪৯ বলে ১১ রান করেন তিনি। তার বিদায়ের পর ‘নাইট ওয়াচম্যান’ হিসেবে নামা কাসুন রাজিথাকে নিয়ে বাকীটা সময় নিরাপদে পার করেন করুনারত্মে।

এর আগে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে নিজেদের প্রথম ইনিংসে ৩৬৫ রানে অলআউট হয় বাংলাদেশ। মধ্যাহ্ন বিরতি থেকে ফেরার খানিক পরেই অলআউট হয়ে যায় টাইগাররা। রান আউট হয়ে এবাদত হোসেন ফিরলেই স্বাগতিকদের ইনিংসের সমাপ্তি ঘটে।

মিরপুরের হোম অব ক্রিকেটে আগের দিনের করা ৮৫ ওভারে ৫ উইকেটে ২৭৭ রান নিয়ে ব্যাটিংয়ে নামে বাংলাদেশ। সেখান থেকে ১১৩ ওভারে ৯ উইকেটের বিনিময়ে ৩৬১ রান নিয়ে দ্বিতীয় দিনের প্রথম সেশন পার করেছে স্বাগতিকরা। মধ্যাহ্ন বিরতি থেকে দ্বিতীয় সেশনে ফেরার পর ৩.২ ওভার মাত্র ব্যাট করতে পারে বাংলাদেশ। এরপরই ৩৬৫ রানে অলআউট হয় দল।

পাঁচ উইকেটে ২৭৭ রান নিয়ে দ্বিতীয় দিন ব্যাটিংয়ে নামা বাংলাদেশ নিজেদের ষষ্ঠ উইকেট হারিয়েছে ২৯৬ রানে। সকালে খুব বেশি সময় ঠেকেনি মুশফিকুর রহিম ও লিটন দাসের বীরত্বগাঁথা জুটি। উইকেটরক্ষক ব্যাটার লিটনের বিদায়ে ভাঙে মুশফিকের সাথে তার ইতিহাস গড়া ২৭২ রানের অসামান্য এক জুটির।

টেস্ট ক্যারিয়ারের সেরা ইনিংস খেলে ফিরেন লিটন দাস। দলের বিপর্যয়ে মাঠে নেমে হাল ধরেছিলেন। দলকে অনেকটা নিরাপদে পৌঁছে দ্বিতীয় দিন সকালের প্রথম সেশনে তিনি ফিরেছেন ব্যাক্তিগত ১৪১ রান। ২৪৬ বলের ঝলমলে আর দায়িত্বশীল ইনিংসটি তিনি সাজিয়েছেন ১৮টি চার ও ১টি ছক্কায়। সাদা পোশাকে এর আগে ১১৪ রান ছিল তার ক্যারিয়ার সেরা।

লিটনের বিদায়ের পর উইকেটে আসা মোসাদ্দেক কোনো রান সংগ্রহের আগেই ফিরেছেন সাজঘরে। ৩ বল খেলে ‘ডাক’ মেরে রীতিমতো উইকেট বিলিয়ে দিয়ে এসেছেন এই ব্যাটার। একই ওভারে লিটন-মোসাদ্দেককে ফিরিয়ে কাসুন রাজিথা পূরণ করেন পাঁচ উইকেট। ক্যারিয়ারে যেটি তার এবারই প্রথম।

পরবর্তীতে উইকেটে আসেন তাইজুল ইসলাম। তিনি এসে মুশফিককে বেশ ভালোভাবেই সঙ্গ দিচ্ছিলেন। তবে দুজনের ৪৯ রানের দারুণ জুটির সমাপ্তি হয় তাইজুলের বিদায়ে। আসিথা ফার্নান্দোর বলে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন তাইজুল। এর আগে খেলে যান ৩৭ বলে ২ বাউন্ডারিতে ১৫ রানের ইনিংস। উইকেটে আসা খালেদ আহমেদ ফিরেন ২ বলে ডাক মেরে।

শেষ উইকেটে লড়াই চালান মুশফিক ও এবাদত। দুজনের ১২ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটিতে মধ্যাহ্ন বিরতিতে যায় বাংলাদেশ। যদিও এর মাঝে একবার রিভিউ নিয়ে জীবন পান এবাদত। তবে মধ্যাহ্ন বিরতি থেকে ফেরার খানিক পর এবাদত রানআউট হয়ে ফিরলে ভেঙে যায় তার সাথে মুশির ১৬ রানের জুটি। এবাদত ১৬ বল খেলে কোনো রান না করেই প্যাভিলিয়নে ফেরেন। এতে করে ইনিংসে ষষ্ঠ ব্যাটার হিসেবে ডাক মারলেন তিনি।

তবে একপ্রান্তে অপরাজিত থেকে গেছেন লড়াই করা মুশফিকুর রহিম। ৩৫৫ বলে ২১ বাউন্ডারিতে ১৭৫ রানে অপরাজিত থেকে মাঠ ছেড়েছেন মিস্টার ডিপেন্ডেবল। অল্পের জন্য হলো না আরও একটি ডাবল সেঞ্চুরির।যদি সেটি হতো তাহলে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দ্বিতীয় ও ক্যারিয়ারের চতুর্থ ডাবল সেঞ্চুরির দেখা পেতেন। তবে সেটা না হলে, বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসের প্রথম ব্যাটার হিসেবে পাঁচ বার দেড়শ পার করা ইনিংস খেলেছেন তিনি।

আর তাঁর এই ইনিংস ইতিহাসে থাকবে অনন্যভাবে। ধ্বংসস্তূপ থেকে দলকে তিনি আর লিটন দাস ২৭২ রানের জুটি গড়ে যেভাবে টেনে তুলে ছিলেন, সেটা ছিল অনবদ্য। বাংলাদেশের তো বটেই টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে ২৫ রানের মধ্য পাঁচ উইকেট হারানোর পর এমন জুটি কেউই করতে পারেনি। তাই স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে দুজনের এই জুটি।

এর আগে ১৯৫৯ সালে উইন্ডিজের বিপক্ষে ২২ রানে ৫ উইকেট হারানোর পর ৮৬ রান যোগ করেছিলেন পাকিস্তানের ওয়ালিস ম্যাথিয়াস ও সুজাউদ্দিন। এবার তাদের ছাড়িয়ে গিয়ে নতুন উচ্চতা স্থাপন করেছেন মুশফিক-লিটন। এর বাইরে বাংলাদেশের হয়ে ষষ্ঠ উইকেটে বাংলাদেশের হয়ে রেকর্ড জুটি করেছেন লিটন ও মুশফিক। বাংলাদেশ যখন টপ অর্ডারে তামিম-সাকিবদের ‘ডাক’ মেরে ফিরে যাওয়ায় ধুঁকছিল, তখনই এমন অনবদ্য ব্যাটিং করে ম্যাচের মোড় পাল্টে দেন দুজন। এসবের বাইরে ব্যর্থ হন নাজমুল হোসেন শান্ত, মুমিনুল হকরাও।

শ্রীলঙ্কার হয়ে প্রথম ইনিংসে কাসুন রাজিথা ৫টি ও অসিতা ফার্নান্দো ৪টি করে উইকেট লাভ করেন।

এসএনপিস্পোর্টসটোয়েন্টিফোরডটকম/নিপ্র/০০