স্পোর্টস ডেস্ক:: অস্ট্রেলিয়াকে দ্বিতীয়বার ওয়ানডেতে হারাতে ২১ বছর অপেক্ষা করতে হলো। কার্ডিফে মোহাম্মদ আশরাফুলের আলো ছড়ানো সেই ম্যাচের পর কেটে গেছে দুই দশক। এবার হোম অব ক্রিকেটে টাইগাররা বধ করলো সিংহদের।
ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচে ৮৬ রানের দুর্দান্ত জয় তুলে নিল বাংলাদেশ। টস হেরে ব্যাটিংয়ের আমন্ত্রণ পায় বাংলাদেশ। সেই আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে সাহসী ব্যাটিং করেন স্বাগতিক ব্যাটাররা। মোসাদ্দেক হোসেন, তানজিদ হাসান তামিম ও নাজমুল হোসেন শান্তর হাফ সেঞ্চুরিতে ২৮৪ রান তোলে বাংলাদেশ। জবাবে নাহিদ রানা-মোসাদ্দেক-মোস্তাফিজদের তোপের মুখে ১৯১ রানেই থমকে যায় অজিদের ইনিংস। তাতেই ডাকওয়ার্থ-লুইস পদ্ধতিতে ৮৬ রানের জয়ে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ শুরু করল বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের দেওয়া ২৮৫ রানের লক্ষ্যে খেলতে নেমে ইনিংসের প্রথম বলেই ম্যাথিউ শর্টকে ফিরিয়ে সাফল্য এনে দেন তাসকিন আহমেদ। বাংলাদেশের এই পেসারের ভেতরে ঢোকা বলটি বুঝতেই পারেননি শর্ট। পরের ওভারেই মারনাস লাবুশেনকে তুলে নেন মোস্তাফিজুর রহমান। অজি ব্যাটিংয়ের দুই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটারকে দ্রুত ফিরিয়ে জয়ের পথটা সহজ করে ফেলে বাংলাদেশ। ১ রান করে আউট হন লাবুশেন।
২ রানে ২ উইকেট হারানোর পর কুপার কোনোলি ও জশ ইংলিস প্রতিরোধের চেষ্টা করলেও সফল হননি। নাহিদের গতির সামনে অসহায় হয়ে পড়েন ইংলিস। ১৪৭.৯ কিলোমিটার গতির বলে পরাস্ত হয়ে ফিরেন প্যাভেলিয়নে। চতুর্থ উইকেটে কোনোলিকে সঙ্গে নিয়ে অ্যালেক্স ক্যারি দলকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করেন। চার বছর পর দলে ফেরা মোসাদ্দেক ৩৫ রানে থামিয়ে দেন তাকে। পঞ্চম উইকেটে ক্যারি ও ক্যামেরন গ্রিন গড়েন আরও ৩৭ রানের জুটি। এবার ১৪৬ কিলোমিটার গতির সিম ডেলিভারি ভেতরে ঢোকে। পা না সরিয়ে দাঁড়িয়ে বলটি ঠেকানোর চেষ্টা করেছিলেন ক্যারি। কিন্তু বলের মুভমেন্ট তাকে ধোঁকা দেয়। ব্যাটের কানায় লেগে বল চলে যায় উইকেটরক্ষক লিটনের গ্লাভসে। ৪৭ রানে আউট হন ক্যারি।
নাহিদের গতি ও নিখুঁত লাইন-লেংথের সামনে অসহায় হয়ে পড়েন অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটাররা। ১২৮ রানে পঞ্চম উইকেট হারানোর পর দ্রুত আরও তিন উইকেট হারায় তারা। মোসাদ্দেকের স্লোয়ারে ম্যাট রেনশ ২ রানে ফেরেন। নাহিদের গতিতে পরাস্ত হয়ে লিয়াম স্কট ২ ও জাভিয়ার বার্টলেট ১ রান করেন। নাহিদ তখন অপেক্ষায় ছিলেন আরও একটি ফাইফারের। তবে শেষ পর্যন্ত ৫ উইকেট পাওয়া হয়নি তার। ১০ ওভারে ৪১ রান খরচায় শিকার করেন ৪ উইকেট।
খেলাটা দ্রুতই শেষ হয়ে যেতে পারত। কিন্তু ক্যামেরন গ্রিন দায়িত্ব নিয়ে লেজের ব্যাটারদের সঙ্গে ব্যাটিং করেন। ম্যাচ জেতার সম্ভাবনা না থাকলেও অনেকটা নেট ব্যাটিংয়ের মেজাজে খেলছিলেন তিনি। নাথান এলিসের সঙ্গে ১৬ এবং অ্যাডাম জাম্পার সঙ্গে ৩৫ রানের জুটি গড়েন গ্রিন।
সন্ধ্যা ৭টা ৫ মিনিটে মিরপুরের আকাশে বজ্রপাত শুরু হলে দুই দলের ক্রিকেটাররা ড্রেসিংরুমে ফিরে যেতে বাধ্য হন। পরে বৃষ্টি নামলে আর খেলা শুরু করা সম্ভব হয়নি। এক ঘণ্টা পর ডাকওয়ার্থ-লুইস পদ্ধতিতে বাংলাদেশকে জয়ী ঘোষণা করা হয়।
এর আগে টস জিতে প্রথমে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় অস্ট্রেলিয়া। ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুতেই সাইফ হাসানকে হারিয়ে চাপে পড়ে বাংলাদেশ। অজি পেসার নাথান এলিসের অফ স্টাম্পের বাইরের ডেলিভারিতে খোঁচা দিয়ে ৬ বলে ৪ রান করে ফেরেন সাইফ। তবে শুরুর ধাক্কা সামলে দলকে বিপদমুক্ত করেন তানজিদ হাসান তামিম ও নাজমুল হোসেন শান্ত। পাওয়ার প্লেতে দুজন মিলে তুলে ফেলেন ৬২ রান।
এরপর শান্ত কিছুটা ধীরগতিতে খেললেও তানজিদ একই ছন্দে রান তুলতে থাকেন। দলীয় ১০৬ রানে ভাঙে এই জুটি। ব্যক্তিগত ফিফটি পূর্ণ করার পর আরও আক্রমণাত্মক হতে গিয়ে আউট হন তানজিদ। এলিসের স্লোয়ার বলটি বুঝতে পারেননি তিনি। ফেরার আগে ৪৪ বলে খেলেন ৫৪ রানের ইনিংস, যেখানে ছিল কয়েকটি দৃষ্টিনন্দন বাউন্ডারি ও আত্মবিশ্বাসী শট।
এরপর লিটন দ্রুত বিদায় নিলেও চাপে পড়েনি বাংলাদেশ। শান্ত ও তাওহীদ হৃদয় মিলে দলকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। ইনিংসের চতুর্থ ওভারে জীবন পাওয়া শান্ত আউট হন ৬৭ রানে। তার আগে তাওহীদের সঙ্গে ৭৫ রানের জুটি গড়েন বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপের অন্যতম ভরসা এই ব্যাটার।
শান্তর বিদায়ের পর ক্রিজে নামেন চার বছর পর জাতীয় দলের হয়ে ওয়ানডে খেলার সুযোগ পাওয়া মোসাদ্দেক। গত কয়েক বছর ধরেই ঘরোয়া ক্রিকেটে দারুণ ছন্দে থাকা এই ক্রিকেটার নিজের প্রত্যাবর্তন ম্যাচটি রাঙান। শুরুতে সময় নিয়ে খেললেও পরে রান তোলার গতি বাড়ান। সিঙ্গেল-ডাবলের সঙ্গে ফাঁকা বল পেলেই বাউন্ডারি বের করে আনছিলেন তিনি।
৩২তম ওভারে জীবন পান মোসাদ্দেক। তখন তার রান ২১। রেনশর বলে ক্যাচ তুললেও সেটি তালুবন্দি করতে পারেননি কোনোলি। জীবন পাওয়ার পর আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন এই ডানহাতি ব্যাটার। দারুণ সব শটে ক্যারিয়ারসেরা ইনিংস খেলেন আবাহনীর এই ক্রিকেটার।
তবে তাওহীদ-মোসাদ্দেকের জুটিটি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ৭৫ রানের জুটির পর ব্যক্তিগত ৩১ রানে নাথান এলিসের বলে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন তাওহীদ। সঙ্গীকে হারালেও আক্রমণাত্মক ব্যাটিং চালিয়ে যান মোসাদ্দেক। মাত্র ৪৯ বলে পূর্ণ করেন নিজের ফিফটি। অর্ধশতকের পর আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠেন তিনি। অ্যাডাম জাম্পার এক ওভারে দুটি চার ও একটি ছক্কা হাঁকিয়ে তুলে নেন ১৬ রান।
শেষ পর্যন্ত লেজের ব্যাটারদের নিয়ে ৭০ বলে ৭ চার ও ৩ ছক্কায় ৮৬ রানের ইনিংস খেলে অপরাজিত থাকেন মোসাদ্দেক। এটি তার ক্যারিয়ারসেরা ইনিংস। তার ব্যাটিংয়ে ছিল দৃষ্টিনন্দন বাউন্ডারি ও দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ের ছাপ।
তার আগে মেহেদী হাসান মিরাজ বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। স্কটের বলে এলবিডব্লিউ হন তিনি। রিভিউ নিয়েও বাঁচতে পারেননি মিরাজ। মাত্র ৩ রান আসে তার ব্যাট থেকে। ইনিংসের শেষ দিকে তানভির ইসলামও বড় শট খেলতে গিয়ে আউট হন। তবে তাসকিন বড় অবদান রাখেন, খেলেন ১৬ বলে ২০ রানের কার্যকর ইনিংস।
এসএনপিস্পোর্টসটোয়েন্টিফোরডটকম/নিপ্র/ডেস্ক/০০































