৫ ক্লাব আর ২৫ লাখ জনসংখ্যার দেশ নামিবিয়ার ক্রিকেটে অভাবনীয় উত্থান

সাগর রায়: নামিবিয়া! পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম দেশগুলোর একটি। আফ্রিকা অঞ্চলের মরুভূমিতে ধূসর রাঙা দেশ। যেদিকে দু চোখ যায়, সবদিকেই শুধুই ফাঁকা অঞ্চল। জনসংখ্যার দিক দিয়ে মাত্র ২৫ লাখ ৪১ হাজার মানুষের দেশ নামিবিয়া। যেখানে কিনা ফুটবল-রাগবির মতো খেলাগুলোই জনপ্রিয়। তবে সেই প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখন বইছে ক্রিকেটেরও জনজোয়ার।

গল্পের শুরুটা ২০১৯ সালে। যখন কিনা ওয়ানডে স্ট্যাটাস লাভ করে নামিবিয়া। একই বছর নিশ্চিত করে চলমান টি-২০ বিশ্বকাপের বাছাই পর্বে খেলা। সেই বছরই নিজেদের চুক্তিবদ্ধ ক্রিকেটারের সংখ্যাটা ৩ থেকে ১৬’তে নিয়ে যায় ক্রিকেট নামিবিয়া। মাত্র পাঁচটি ক্রিকেট ক্লাব আছে নামিবিয়ার। যারা কিনা চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য লড়ে।

নেই কোনো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম। বলার মতো আট-নয়টি মাঠই কেবল সম্বল হিসেবে আছে। সেখানেই চলে প্র্যাক্টিস আর চ্যাম্পিয়নশিপের খেলা। তবে সব অসুবিধেকে ছাপিয়ে এবার বিশ্ব মঞ্চে নিজেদের সমাদৃত করেছে ক্ষুদ্র দেশটি। ২০০৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ এবং প্রথম বারের মতো কোনো বিশ্বকাপ খেলেছিল নামিবিয়া। সেই দলে ছিলেন রুডি ফন বুরেন।

এই ফন বুরেন ভারতের বিপক্ষে ম্যাচে নিয়েছিলেন শচীন টেন্ডুলকারের উইকেট। তবে সবচেয়ে ভালো অর্জন ছিল ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পাঁচ উইকেট নেওয়া। ১৮ বছর পর নামিবিয়া যখন আরও একটি বিশ্বকাপ খেলছে, তখন সেটির অভিভাবক সংস্থা ক্রিকেট নামিবিয়ার চেয়ারম্যান এখন ফন বুরেন। তার মতে, গেল তিন বছরে কঠোর পরিশ্রমের ফল আসছে এখন।

প্রথম বারের মতো টি-২০ বিশ্বকাপে খেলতে এসে নামিবিয়া নতুন ইতিহাস গড়েছে। আর সেই ইতিহাস গড়ার পেছনে রয়েছে দলের ঐক্যবদ্ধতা। বড় মঞ্চে নিজেদের জাত চেনানোর একাগ্রতা। বাছাই পর্বে প্রথম ম্যাচে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে পাত্তা না পেলেও, নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসে নিজেদের প্রথম জয়ের দেখা পায় নামিবিয়া। সম্ভাবনা জাগিয়ে রাখে মূল পর্বে যাওয়ার।

এরপর আয়ারল্যান্ডকে হারিয়ে নতুন ইতিহাসের উচ্চতা আরও খানিকটা বাড়িয়ে নেয় নামিবিয়া। প্রথম বারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে এসে মূল পর্বে জায়গা করে নেয় দলটি। অভিজ্ঞতা ও সবদিক থেকে এগিয়ে থাকা টেস্ট খেলুড়ে দেশ আইরিশদের হারিয়ে দিয়ে বিশ্বকাপের মূল মঞ্চের টিকিট কাটে নামিবিয়া। নেদারল্যান্ডস-আয়ারল্যান্ডের মতো দলকে ছাপিয়ে সুপার টুয়েলভে যাবে, সেটা ভাবতে পারার লোক ছিল কয় জন?

তবে নিজেদের কাজটা করে দেখিয়েছে নামিবিয়া। মূল মঞ্চে এসেও ইতিহাস গড়া থামায়নি দেশটি। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে মূল পর্বের প্রথম ম্যাচেই দারুণ এক জয় তুলে নেয় নামিবিয়া। এ জয়টাও এক ইতিহাস। যেখানে টানা সাত বিশ্বকাপের সবকটিতে খেলা বাংলাদেশও এখন পর্যন্ত মূল পর্বে জিততে পারেনি কোনো ম্যাচ। এছাড়া আইসিসির নন টেস্ট প্লেইং দেশ হিসেবে সুপার টুয়েলভে খেলতে নেমই জয় পাওয়া প্রথম এবং একমাত্র দল এই নামিবিয়া।

অবশ্য এখন বিশ্বকাপের বাকি মঞ্চটা চুপিসারেই যাচ্ছে তাদের। কেননা পাকিস্তান, আফগানিস্তানের সাথে হারের দেখা পেয়েছে তারা। সামনে আছে নিউজিল্যান্ড ও ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ। যেখানে জয়ের আশা নেই বললেই চলে। অবশ্য সেটা আশা করাও বোকামি। এক প্রকার শূন্য থালা নিয়ে শুরু করা নামিবিয়ার কাছে এতদূর পর্যন্ত আসাটাই যে অনেক বড় সম্বল। তবে কে বলতে পারে অঘটনের জন্ম দিলেও দিতে পারে দক্ষিণ আফ্রিকার পার্শ্ববর্তী এই দেশ।

বিশ্ব মঞ্চে এসে আলো ছড়ানোটা অবশ্য এত সহজে হয়নি নামিবিয়ার। এর পেছনে ছিল প্রচুর অধ্যাবসায় আর শ্রম। যার ফল হিসেবে এবারের বিশ্বকাপের পারফর্ম ধরা দিয়েছে তাদের সামনে। জুগিয়েছে নতুন আশা। ভরসা দিয়েছে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে। মরুর বুকে জনপ্রিয় করে তুলেছে ক্রিকেটকে।

চলমান বিশ্বকাপে নামিবিয়ার এতো সাফল্যের অন্যতম বড় কারিগর ডেভিড ভিসে। ২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ডেভিড ভিসে খেলেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে। এরপরই কলপ্যাক চুক্তিতে দেশ ছেড়ে ইংল্যান্ডের ক্রিকেটে নাম লেখান। সেখান হয়ে বাবার দেশ নামিবিয়ার ক্রিকেটে নিজেকে সংযুক্ত করেন। মাঝের পাঁচ বছর ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে আড়ইশর বেশি ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা ঝুলি ভারী করেছেন শুধু।

বাবার দেশ নামিবিয়ার হয়ে বিশ্বকাপ খেলতে এসে নায়ক এখন ডেভিড ভিসে।

আরও একটি টি-২০ বিশ্বকাপে নামিবিয়ার হয়ে প্রতিনিধিত্ব করতে এসে সেই অভিজ্ঞতাকে এখন পুরোদমে কাজে লাগাচ্ছেন ৩৬ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার। বাবার দেশের হয়ে খেলতে নেমে নামিবিয়ার ক্রিকেট ইতিহাস লিখেছেন নতুন করে। একইসাথে সহযোগী দেশগুলোর জন্য তৈরি করেছেন আলাদা বার্তা। ব্যাট হাতে কিংবা বল হাতে, যেকোনোভাবেই হোক ম্যাচে অবদান রেখেই চলেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক এই তারকা অলরাউন্ডার। ম্যাচ সেরা ক্রিকেটারও হয়েছেন দু’বার।

অবশ্য এতে করে কম বলা যায়না দেশটির অন্য ক্রিকেটার কিংবা টিম ম্যানেজম্যান্ট বা এই সাফল্যের পেছনে জড়িয়ে থাকা প্রতিটি মানুষের অবদান। মূল পর্বে উঠার পর অধিনায়ক জেরার্ড এরাসমাসের আবেগে চোখের জল ধরে রাখতে না পারা কিংবা রুবেল ট্র্যাম্পেলম্যানের করা সেই স্কটিশদের বিপক্ষে প্রথম ওভার, নামিবিয়ার ভক্ত-সমর্থকদের মনে গেঁথে থাকবে অনেকদিন।

সামনের নায়ক হতে না পারলেও, পেছনের নায়ক হয়ে ঠিকই থাকবেন নামিবিয়ার কোচ পিয়েরে ডি ব্রুইনে। যে দেশে ছিল না ক্রিকেটের কোনো সূচিই, কোভিডের আঘাত, সেখান থেকে টেনে আনেন দলকে। ফুলটাইম ফিজিও কিংবা ফুল টাইম ট্রেনার নেই নামিবিয়ার। অখ্যাত এই দেশের ক্রিকেটে দক্ষিণ আফ্রিকার ডি ব্রুইনে আলো হয়ে আসেন। সঙ্গে নিয়ে আসেন প্রোটিয়া বন্ধু সাবেক তারকা ক্রিকেটার এবি মরকেলকে সহকারী কোচ হিসেবে। দু’জনে মিলে মাস্টারমাইন্ড পরিকল্পনায় তিলে তিলে গড়ে তোলেন দলটাকে। তাদের পরিকল্পনাতেই ভিসে এসে শক্তি বাড়ান নামিবিয়া দলের।

প্রধান কোচ ডি ব্রুইনে (ডানে) ও সহকারী কোচ এবি মরকেল (বামে)।

আজ হাটি হাটি পা করে আসা এই দলটা সাফল্য পাচ্ছে। বিশ্বকাপের বাকি অংশে বড় হারে, এতটুকু রঙও হারাতে দেবে না নামিবিয়ার এই সাফল্যে। উল্টো সেখান থেকে লড়াই করা শিখবে নামিবিয়ার হাজারো তরুণ। আগ্রহিত হয়ে আসবে ক্রিকেটে। উৎসাহ আর ঝোঁক বাড়াবে ক্রিকেটের প্রতি। বাদ যাবে না বাকি সহযোগী দেশগুলোও।

কিভাবে বিশ্ব মঞ্চে নিজেদের জাত চেনাতে হয়, লড়াই করে উপরে উঠতে হয়, জিততে হয়, সেটা শিখবে সেই দেশগুলো। ক্রিকেটের ইতিহাস এতে করে পাল্টাবে। এতে করে বিশ্বব্যাপীও ক্রিকেটে নতুন জাগরণের ইতিহাস রচয়িত। বিশ্ব মঞ্চে গিয়ে নামিবিয়া কোচ ডি ব্রুইনের মতো বলে উঠবে, ‘বিশ্বকাপে বেড়াতে আসিনি, যেটা করতে এসেছি সবাই সেটা দেখেছে।’

এসএনপিস্পোর্টসটোয়েন্টিফোরডটকম/নিপ্র/সা/00