পেছন পথে হাঁটছে বাংলাদেশ

কাইয়ুম আল রনি:: একটা ম্যাচে কতটা ভুল করলে ম্যাচটি হারা যায় সেটা নিয়েই হয়তো ভাবছেন সমর্থকেরা। ক্রিকেট কর্তারা কাঁচে ঘেরা রুমে বসে হয়তো ভাবছেন এ আর কি! কোচিং স্টাফের সদস্যরা খাতা-কলম নিয়ে হয়তো একের পর এক ভুলগুলো নোট করছেন? একটা ম্যাচে কতটা রানআউট মিস করা যায়, কতটা ক্যাচ মিস করা যায়? কতটা নো-বল দেওয়া যায় সেই প্রতিযোগিতায় যেনো ক্রিকেটাররা। একের পর এক এসব ছোট ছোট ভুলে এশিয়ায়ও খর্বশক্তির দল হয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। অন্তত টি-২০ ফরম্যাটে সেটাই হচ্ছে। সামনে ঝলমলে আলো রেখে পেছনে পথে যেনো অন্ধকার গলি দিয়ে হাটছে বাংলাদেশ টি-২০ দল।

শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচটি বাঁচা-মরার লড়াই। জিততে পারলে সংযুক্ত আরব-আমিরাতে মিলবে এশিয়া কাপের সুপার ফোরের গোল্ডেন ভিসা। টস হেরে ব্যাট করতে নামা বাংলাদেশ যেনো জ্বলে উঠলে। আগ্রাসী ব্যাটিং আর শুরুর দুর্দান্ত ফিল্ডিং দেখে ভাবতেই পারেন দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় বাঘেদের এমন গর্জে উঠা। শেষের কয়েকটা আসরেও যেখানে বাংলাদেশ ফাইনাল খেলেছে, সেখানেই কিনা এবার আফগানিস্তান আর শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে বাদ পড়ে যাবে গ্রুপ পর্বে? তাই হয়তো এমন জ্বলে উঠা।

তবে এই দুর্দান্ত জ্বলে উঠা ফসকে গেছে ছোট ছোট কয়েকটা ভুলে। বিপজ্জনক কুশল মেন্ডিস নিজেই পেলেন চারটি জীবন। উইকেটরক্ষক বুঝতেই পারেননি বল গ্লাভস ছুঁয়েছে। নিজেও ক্যাচ ছেড়েছেন এই ব্যাটারের। রানআউট মিস হয়েছে, নো বল দিয়েও উইকেট উপহার দেওয়া হয়েছে। লঙ্কানদের বিপক্ষে এই হারটা মূলত ক্যাচ মিস, রানআউট মিস আর নো বলের কারণেই। বাংলাদেশের বোলাররা চারটি নো বল দিয়েছেন, ৮টি ওয়াইড দিয়েছেন সঙ্গে একাধিক ক্যাচ ও রানআউট মিস করেছেন। রিভিউও নিতে পারেননি সময় মতো। ২০ ওভারের একটি ম্যাচে হারের জন্য এর চেয়ে বেশি কিছু করতে হয় না।

সামনের দিকে যখন ছুটে চলার কথা দুর্বার গতিতে, সেখানেই ক্রিকেটের নতুন শক্তিধর হয়ে উঠা আফগানিস্তানের কাছে হার। যেই নবী-রশিদ খানরা অনুশীলনেরও সুযোগ সুবিধা পান না, নিজেদের মাঠে খেলার স্বপ্নও দেখা যেনো তাদের অপরাধ। সেই আফগানদের কাছেই হার। দুর্বল লঙ্কানদের বিপক্ষে জ্বলে উঠে সুপার ফোরে যাওয়ার কথা, সেখানে একের পর এক ভুলে লঙ্কানদের কাছেও হেরে এশিয়া কাপ থেকে বিদায় বাংলাদেশের।

অথচ সাকিবের ম্যাচ ভেন্যু দুবাই এবং শারজা যেনো এক টুকরো বাংলাদেশে পরিণত হয়েছিলো। প্রবাসী বাঙালিরা নিজেদের কাজ ফেলে, ডলার খরচ করে এসেছেন প্রিয় দেশকে সমর্থন দিতে, তারকাদের চার/ছক্কায় মেতে উঠতে, সেখানে শুন্য হাতেই ফিরতে হলো তাদেরকে। প্রবাসী এই রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের সম্মানের জন্য হলেও বাংলাদেশের সুপার ফোরে খেলা উচিত ছিলো। আমাদের দেশ প্রেমিক ক্রিকেটাররা সেটাই পারেননি।

দুবাই স্টেডিয়ামে যেনো বাঘের গর্জন। চারি দিকে লাল-সবুজ জার্সি আর বাংলাদেশের পতাকা। দেখে মনে হচ্ছিলো দুবাইয়ে নয়, হয়তো মিরপুরে খেলা হচ্ছিলো। শারজাতেও ছিলো একই রূপ। অথচ বাংলাদেশ দল প্রবাসীদের কাঁদালো দুই ভেন্যুতেই। দুবাই থেকে শুন্য হাতেই ফিরছে দেশে। দাসুন শানার দল দুই উইকেটের ব্যবধানে হারিয়েছে সাকিব আল হাসানদের।

১৮৪ রানের বিশাল এই লক্ষ্য টপকাতে হলে শুরু থেকেই মারমুখী লঙ্কান ব্যাটাররা। দুই ওপেনার পাথুম নিশাঙ্কা ও কুশল মেন্ডিস তাই শুরু করলেন রীতিমতো বিধ্বংসী। তবে বিপজ্জনক হয়ে উঠা ওপেনিং জুটিকে আটকেছেন অভিষিক্ত পেসার এবাদত হোসেন।

ইনিংসের ষষ্ঠ ওভারের তৃতীয় বলে দলীয় ৪৫ রানের মাথায় প্রথম উইকেট শিকার করে বাংলাদেশ। এবাদতের বলে মুস্তাফিজের হাতে ধরা পড়ে সাজঘরে ফিরেছেন লঙ্কান ওপেনার পাথুম নিশাঙ্কা। দুই চার ও এক ছয়ে ১৯ বলে ২০ রান করেছেন তিনি। একই ওভারের শেষ বলে চারিথ আসালাঙ্কাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন অভিষিক্ত এই পেসার।

ব্যক্তিগত দ্বিতীয় ওভারেই এবাদত ফিরিয়ে দেন গুনাতিলাকাকে। ইনিংসের অষ্টম ওভারের চতুর্থ বলে তৃতীয় উইকেট হারায় লঙ্কানরা। এবাদতের তৃতীয় শিকারে দুই চারে ৬ বলে ১১ রান করা গুনাতিলাকা ফিরেন প্যাভেলিয়নে। এরপরই তাসকিন শিকার করেন ভানুকা রাজাপাকসেকে। ইনিংসের নবম ওভারের পঞ্চম বলে দলীয় ৭৭ রানে চতুর্থ উইকেট হারিয়েছে শানাকার দল।

তবে এক প্রান্ত আগলে রেখে ব্যাট চালিয়ে যেতে থাকেন কুশল মেন্ডিস। চার বার জীবন পাওয়া এই ব্যাটার শেষ পর্যন্ত সাজঘরে ফিরেছেন হাফ সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে। ইনিংসের ১৫তম ওভারের তৃতীয় বলে দলীয় ১৩১ রানে পঞ্চম উইকেট হারিয়েছে লঙ্কানরা। মুস্তাফিজের দারুণ এক বলে তুলে মারতে গিয়ে তাসকিনের হাতে বন্দী হন মেন্ডিস। চার চার ও তিন ছয়ে ৩৭ বলে ৬০ রানের বিস্ফোরক ইনিংস খেলেছেন তিনি।

মুস্তাফিজের পরপরই তাসকিন শিকার করেন নিজের দ্বিতীয় উইকেট। ১৬তম ওভারের তৃতীয় বলে তাসকিন হাসরাঙ্গা ডি সিলভাকে মেহদী হাসানের হাতবন্দী করেন। ১৩৯ রানেই ষষ্ট উইকেট হারায় লঙ্কানরা। ১৮তম ওভারের পঞ্চম বলে লঙ্কান অধিনায়ক দাসুন শানাকাকে শিকার করেন মেহদী হাসান। ১৫৮ রানে সপ্তম উইকেট হারায় দলটি। তিন চার ও দুই ছয়ে ৩৩ বলে ৪৫ রান করেন লঙ্কান অধিনায়ক। দারুণ এক থ্রুতে ১৯তম ওভারের পঞ্চম বলে চামিকা করুনারাত্মেকে সাজঘরে পাঠান সাকিব। ১০ বলে ১৬ রান করেন এই ব্যাটার। অষ্টম উইকেট হারায় লঙ্কানরা। শেষ ওভারে জয়ের জন্য ৮ রানের সমীকরণ সহজেই মিলিয়ে নেন ৩ বলে দুই চারে ১০ রান করা অসিথা ফার্নান্দো। ৪ বল হাতে রেখেই সুপার ফোর নিশ্চিত হয়ে যায় দলটির।

বাংলাদেশের হয়ে এবাদত ৩টি ও তাসকিন ২টি করে উইকেট লাভ করেন।

এর আগে দুবাইয়ে টি-২০ মেজাজী ছোট্ট ছোট্ট কার্যকরি ইনিংস। লঙ্কান বোলারদের পিটিয়ে তাতেই সংযুক্ত আরব-আমিরাতের মাঠে ‘রেকর্ড’ করে বাংলাদেশ। মধ্যপ্রাচ্যের দেশটিতে নিজেদের টি-২০ ইতিহাসে সর্বোচ্চ রান করে সাকিবের দল। সুপার ফোরে খেলতে হলে শ্রীলঙ্কাকে হারাতে হবে। এমন সমীকরনের ম্যাচেই বাংলাদেশের ব্যাটারদের দেখা গেলো টি-২০ মেজাজী ব্যাটিংয়ে। মিরাজ, আফিফ, রিয়াদ-সাকিবদের ছোট ছোট ইনিংসে বাংলাদেশ ১৮৩ রান তুলে সাত উইকেটে।

টস হেরে ব্যাট করতে নেমে দারুণ শুরু এনে দেন মেহেদী হাসান মিরাজ। তবে সাব্বিরের বিদায়ের পর তিনি নিজেও ফিরেন দ্রুত। এরপর একে একে ফিরেন মুশফিকুর রহিম ও সাকিব আল হাসানরা। দারুণ শুরুটা তাই ধরে রাখতে পারেনি বাংলাদেশ। শতরানের আগে চার উইকেট হারানোর পর পঞ্চম উইকেটে আফিফ ও রিয়াদের ব্যাটেই বড় সংগ্রহের পথ পায় টাইগাররা।

ইনিংস উদ্বোধন করতে নেমে দ্রুতই ফিরেন ওপেনার সাব্বির রহমান। মাত্র একটি বাউন্ডারি এসেছে তার ব্যাট থেকে। দুই ওপেনার দারুণ শুরুর ইঙ্গিত দিয়ে ছিলেন। বাউন্ডারি বেশি হাঁকাতে না পারলেও দ্রুত রান তুলছিলেন সিঙ্গেল নিয়ে। মাত্র ১৯ রান স্থায়ী হয়েছে বাংলাদেশের উদ্বোধনী জুটি। তৃতীয় ওভারের পঞ্চম বলেই সাব্বিরকে ফিরিয়ে দিয়েছেন ফার্নান্দো।

সাব্বিরের বিদায়ের পরও মিরাজ অবিচল থাকেন। সাকিবকে নিয়ে দ্রুতই তুলতে থাকেন রান। একের পর ক বাউন্ডারিতে লঙ্কান বোলারদের তুলোধুনো করতে থাকেন। ইনিংসের সপ্তম ওভারের পঞ্চম বলে তাদের বিদায়ের পরই বাংলাদেশের রানের চাকা স্লো হয়ে যায়। দলীয় ৫৮ রানে মিরাজ ফিরেন সাজঘরে। তার আগে দুই চার ও দুই ছয়ে ২৬ বলে ৩৮ রান করেন এই ওপেনার।

মিরাজের বিদায়ের পর উইকেটে আসা মুশফিকুর রহিম ইনিংস বড় করতে পারেননি। অষ্টম ওভারের শেষ বলে দলীয় ৬৩ রানের মাথায় তিনি ফিরেন প্যাভেলিয়নে। ৫ বলে ৪ রান করা এই উইকেটরক্ষককে সাজঘরে ফেরত পাঠান করুনারাত্মে। এক ওভার পরেই অধিনায়ক সাকিবও প্যাভেলিয়নের পথ ধরেন। ১১তম ওভারের তৃতীয় বলে দলীয় ৮৭ রানের মাথায় বাংলাদেশ হারায় চতুর্থ উইকেট। তিন চারে ২২ বলে ২৪ রান করা বাংলাদেশ অধিনায়ককেও ফেরান করুনারাত্মে।

অধিনায়কের বিদায়ের পর দায়িত্বটা যেনো কাঁধে তুলে নেন আফিফ। সঙ্গী মাহমুদল্লাহ উল্লাহ রিয়াদ। দু’জনে মিলে পঞ্চম উইকেটে যোগ করেন ৩৭ বলে ৫৭ রান। ১৭৭’র বেশি স্ট্রাইক রেটে চার চার ও দুই ছয়ে মাত্র ২২ বলে ৩৯ রানের টর্নেডো ইনিংস খেলেন এই তরুণ। দলীয় ১৪৪ রানে ১৭তম ওভারের চতুর্থ বলে বাংলাদেশের সবচেয়ে মারমুখী এই ব্যাটার ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে পিরেন সাজঘরে। তিার বিদায়ের পর মাহমুদউল্লাহও বেশিক্ষণ থাকতে পারেননি। ১৮তম ওভারের প্রথম বলে তুলে মারতে গিয়ে তিনিও প্যাভেলিয়নে ফিরেন। একটি চার ও ছক্কায় ২২ বলে ২৭ রান আসে তার ব্যাট থেকে।

রিয়াদের বিদায়ের উইকেটে আসা মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতও ব্যাট হাতে ঝড় তুলেন। টি-২০ ঘরানার ব্যাটিংয়ে রীতিমতো বিধ্বংসী হয়ে উঠেন তিনি। ২৬৬’র বেশি স্ট্রাইক রেটে চার চারে ৯ বলে ২৪ রান করে অপরাজিত থাকেন তিনি। তার সঙ্গে কম যাননি তাসকিন আহমদও। ছয় বলে এক ছক্কায় এই পেসার ১১ রানে থাকেন অপরাজিত। তাতেই বাংলাদেশ পেয়ে যায় সাত উইকেটে ১৮৩ রানের বড় পূঁজি।

লঙ্কানদের হয়ে চামিকা করুনারাত্মে ও হাসারাঙ্গা ডি সিলভা ২টি করে উইকেট লাভ করেন।

এসএনপিস্পোর্টসটোয়েন্টিফোরডটকম/নিপ্র/ডেস্ক/০০