ফুটবলে আলো ফিরিয়েছে ওরা, এবার যদি আলো আসে ওদের জীবন

    নিজস্ব প্রতিবেদক:: নারীদের চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ। হিমালয় জয় করেছে বাংলা মায়ের অগ্নিকন্যারা। ঈদ কিংবা উৎসব, যাদের জীবনের বড় একটা অংশ কেটেছে বাফুফের ক্যাম্পে। যারা মায়ের শেষ সম্বল, বোনের স্বর্ণ বিক্রি করে লাল-সবুজের ফুটবলকে এনে দিয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্ব। যারা পরিবারের ভালােবাসা, উৎসব, আনন্দ বিসর্জন দিয়েছে এই ফুটবলের জন্য। দিনের পর দিন পরিবার-স্বজন ছেড়ে থেকেছে বাফুফের ক্যাম্পে।

    দেশের ফুটবলে ফুল ফুটিয়েছে বঙ্গ কন্যারা। এবার যদি ফুটে তাদের জীবনের ফুল। মহিলা দলের বেশির ভাগই একদম সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা। বেশির ভাগেরই বাড়িতে ফিরে শান্তিতে ঘুমাবার জায়গা নেই। ভাঙা-চোরা ঘরের ছবি ভাসছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। কারো প্রধানমন্ত্রীর দেওয়ার উপহারের জমিও বেদখলে। পুরস্কারে পাওয়া টাকায় বানানো কারো ঘরও আছে উচ্ছেদের হুমকিতে। দেশের ফুটবলে ফুল ফুটালেও তাদের জীবনের ফুল ফুটছে না। অভাব-অনটন লেগেই আছে তাদের।

    তাদের যে অভিভাক, সেই বাফুফেরই অনেক অবহেলা ছিলো সাফ জয়ী এই মেয়েদের প্রতি। ক্যাম্পে অসুস্থ হলে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হতো, বিদেশ সফর শেষ করে দেশে ফিরলে বা ক্যাম্প থেকে বাড়িতে যেতে হলে লোকাল বাসে চড়তে হতো মেয়েদের। ট্রেনে তুলে দিয়েই দায় শেষ করতো ফেডারেশন। আর মেয়েদের বেতন, সেতো আরেক নিদারুণ গল্প।

    যেই মেয়েরা অনেক সাফল্য এনে দিয়েছে বয়স ভিত্তিক ফুটবলেই, যারা আজ দক্ষিণ এশিয়ার সেরা হলো সেই মেয়েদের বেতন পনেরো হাজারের ঘরও ছাড়তে পারেনি। মায়ের শেষ সম্বল, বোনের স্বর্ণ বিক্রি করে তাই ফুটবল চালিয়ে যেতে হয়েছে এই অগ্নিকন্যাদের। সমাজের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা সমালোচকদের কতশত টিটকারি, মশকরা মাড়িয়ে এগিয়ে যেতে হয়েছে তাদের। এই জয়টাই শুধুই তাদের।

    আর্থিক নিশ্চয়তা নেই, কারো থাকার ঘরও নেই। এক বেলা খেতে পারলে আরেকবেলা খাবার নিশ্চয়তাও নেই। কারো বাড়ি-ঘরও ছাড়তে হয়েছে প্রভাবশালীদের প্রভাবে। কারো বাবাকে লাঞ্চিত হতে হয়েছে। পাশে পায়নি কাউকে। প্রতিনিয়ত জীবনের জন্য যুদ্ধ করে যেতে হয়েছে বাংলার বাঘিনীদের। সোমবার ফাইনালে নামার আগেই নারী ফুটবলার সানজিদা আক্তারের এক ফেসবুক পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। নারী ফুটবলারদের লাঞ্চনা-বঞ্চনার করুণ চিত্র উঠে আসে। সমাজের কতো টিপ্পনী সহ্য করে যেতে হয়েছে মেয়েদের। সেটাই আরেকবার স্মরণ করিয়ে দেন তিনি।

    সানিজদা লিখে ছিলেন- ‘ফাইনালে আমরা একজন ফুটবলারের চরিত্রে মাঠে নামবো এমন নয়, এগারোজনের যোদ্ধা দল মাঠে থাকবে, যে দলের অনেকে এই পর্যন্ত এসেছে বাবাকে হারিয়ে, মায়ের শেষ সম্বল নিয়ে, বোনের অলংকার বিক্রি করে, অনেকে পরিবারের একমাত্র আয়ের অবলম্বন হয়ে। আমরা জীবন যুদ্ধেই লড়ে অভ্যস্ত। দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্টত্বের জন্য শেষ মিনিট পর্যন্ত লড়ে যাবো।

    তিনি লিখেন, ‘যারা আমাদের এই স্বপ্নকে আলিঙ্গন করতে উৎসকু হয়ে আছেন, সেই সকল স্বপ্নসারথিদের জন্য এটি আমরা জিততে চাই। নিরস্কুশ সমর্থনের প্রতিদান আমরা দিতে চাই। ছাদখোলা চ্যাম্পিয়ন বাসে ট্রফি নিয়ে না দাঁড়ালেও চলবে, সমাজের টিপ্পনীকে একপাশে রেখে যে মানুষগুলো আমাদের সবুজ ঘাস ছোঁয়াতে সাহায্য করেছে, তাদের জন্য এটি জিততে চাই। আমাদের এই সাফল্য হয়তো আরো নতুন কিছু সাবিনা, কৃষ্ণা, মারিয়া পেতে সাহায্য করবে। অনুজদের বন্ধুর এই রাস্তাটুকু কিছু হলেও সহজ করে দিয়ে যেতে চাই।’

    সানজিদা, সাবিনা-কৃষ্ণারা লড়ছেন, সেরা হয়েই দেশে ফিরছেন। এবার তাদের জন্য, তাদের জীবনের আর্থিক-সামাজিক নিরাপত্তার জন্য লড়তে হবে ফেডারেশনকে, সরকারকে। অভয় দিতে হবে তোমরা লড়ে যাউ দেশের জন্য, দেশ আছে তুমাদের জন্য।

    এসএনপিস্পোর্টসটোয়েন্টিফোরডটকম/নিপ্র/০০