স্পোর্টস ডেস্ক:: টেস্ট ক্রিকেটে সেরা সাফল্য পেলো লাল সবুজের বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে ছেলেখেলা করেছে টাইগাররা। প্রথমবারের মতো অজিদের মাটিতে টেস্ট জয় করে ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ দল। ডারউইন টেস্টে বাংলাদেশ জিতেছে ৯ উইকেটের বিশাল ব্যবধানে।
ব্যাট-বল হাতে জ্বলে উঠা টাইগারদের সামনে অসহায় আত্মসম্পূর্ণ করেছে স্টিভেন স্মিথরা। প্রথম ইনিংসে ১৯৮ রান করা অজিরা দ্বিতীয় ইনিংসে পিছিয়ে পড়ে ২৮৪ রান করতে পারে। তাতে বাংলাদেশের লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান। অল্প লক্ষ্য টপকাতে কষ্ট করতে হয়নি টাইগারদের। মাত্র এক উইকেট হারিয়ে মারারা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বিজয়ের উৎসব করেছে টাইগাররা।
অজিদের মাটিতে গিয়ে প্রতিপক্ষের জয়ের রেকর্ড খুব একটা নেই। এশিয়ার কোনো দলের ক্ষেত্রে সেটা আরো বেশি কষ্টকর। তবে ডারউইনে এবার বাংলাদেশ রীতিমতো তুলোধুনো করেছে অজিদের। চার দিনের মাথায় জিতে নিয়েছে টেস্ট। বাংলাদেশের দাপুটে লড়াইয়ে অসহায় ছিলো অস্ট্রেলিয়া।
মাত্র ৫৭ রানের লক্ষ্যে খেলতে নামা বাংলাদেশ ১৪.২ ওভারে এক উইকেট হারিয়ে জয় নিশ্চিত করে ফেলে। ইনিংসের শুরুতেই দলীয় ৪ রানে ওপেনার তাজীদ হাসান তামিম শুন্য রানে ফিরে যান। প্রথম ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান দ্বিতীয় ইনিংসে শুন্য রানে ফিরলেও টাইগারদের কষ্ট করতে হয়নি। ২৫ রানে সাদমান ও ৩০ রানে মুমিনুল হক অপরাজিত থেকে ইতিহাস গড়ে মাঠ ছাড়েন।
অজিদের হয়ে জশ হ্যাজেলউড ১টি উইকেট লাভ করেন।
২২৮ রানে পিছিয়ে পড়ে ব্যাট করতে নামা অস্ট্রেলিয়া গতকাল তৃতীয় দিন শেষ করে ছিলো ৪ উইকেটে ১৬১ রানে। ৪৩ রানে ক্যামেরণ গ্রিণ আজ ব্যাট করতে নেমে সেঞ্চুরি করেন। তবে তাতে খুব একটা লাভ হয়নি দলের। মিরাজের ৫ উইকেট আর হাসান মাহমুদের তিন্ উইকেটে ২৮৪ রানে অলআউট হয়ে যায় স্বাগতিকরা।
বড় ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নামা অস্ট্রেলিয়া ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারের তৃতীয় বলে হারায় জ্যাককে। দলীয় ৪ রানের মাথায় শুন্য রানে সাজঘরে ফেরেন ওপেনার জ্যাক। দুর্দান্ত হাসান মাহমদু প্রতিপক্ষের দ্বিতীয় উইকেটও তুলে নিয়েছেন দ্রুত। ইনিংসের ১১তম ওভারের দ্বিতীয় বলে ফিরিয়ে দেন আরেক ওপেনার ট্রাভিস হেডকে। দলীয় ৩৭ রানে ব্যক্তিগত ১৭ রানে কাটা পড়েন এই অজি ওপেনার।
বাংলাদেশের দারুণ বোলিংয়ে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে স্বাগতিকরা। তৃতীয় উইকেটে লাবুশানেকে ফিরিয়ে তাইজুল ভাঙেন ৩৬ রানের জুটি। দলীয় ৭৩ রানে ফেরার আগে লাবুশানে ৫৯ বলে করেন ৩১ রান।
চতুর্থ উইকেটে গ্রিনকে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেন স্মিথ। প্রথম ইনিংসের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহককে এদিন বড় ইনিংস খেলতে দেননি মিরাজ। নিজের বলে নিজেই ক্যাচ নিয়ে ৪৪ রান করা এই অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যানকে প্যাভেলিয়নে ফেরত পাঠান তিনি। তার বিদায়ে ৩৮তম ওভারের দ্বিতীয় বলে দলীয় ১২২ রানে চতুর্থ উইকেট হারায় স্বাগতিকরা।
এক প্রান্ত আগলে রেখে ক্যামেরণ গ্রিণ লড়াইয়ের চেষ্টা করেন। ইনিংসের ৯৩তম ওভারের পঞ্চম বলে দলীয় ২৭৮ রানের মাথায় নবম উইকেটে তার বিদায়ের পর অজিদের স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়। হাসান মাহমুদের শিকারে সাজঘরে ফেরার আগে ২০১ বলে চারটি চার ও একটি ছক্কায় ১০৪ রান করেন তিনি। এছাড়াও ৩০ রান করেন ক্যারি। ১৮ রান আসে স্টার্কের ব্যাট থেকে।
বাংলাদেশের হয়ে মিরাজ ৫টি ও হাসান মাহমুদ ৩টি করে উইকেট লাভ করেন।
এর আগে বাংলাদেশ নিজেদের প্রথম ইনিংসে ৪২৬ রানে অলআউট হয়। দ্বিতীয় দিন বাংলাদেশ শেষ করেছিলো ১ উইকেটে ৬ উইকেটে ৩৫১ রানে। আগের দিনে ৩২ রানে অপরাজিত থাকা মেহেদী হাসান মিরাজ আর হাফ সেঞ্চুরি করেন। সাজঘরে ফিরেন ৬৫ রানে। ১৩ রানে অপরাজিত থাকা হাসান মাহমুদ ব্যাটিংয়ে নেমে এক রান যোগ করেই ফিরেন প্যাভেলিয়নে।
নিজেদের প্রথম ইনিংসে ব্যাট করতে নামা বাংলাদেশ প্রথম উইকেট হারায় ইনিংসের নবম ওভারের দ্বিতীয় বলে দলীয় ৩৬ রানে। ওপেনার সাদমান ৩০ বলে ২০ রান করে সাজঘরে ফিরেছেন। নিজের মুমিনুল হক ইনিংস বড় করতে পারেননি। ইনিংসের ৪০তম ওভারের দ্বিতীয় বলে দলীয় ১৩৮ রানে তার বিদায়ে ভাঙে দ্বিতীয় উইকেট জু্টি। বিদায়ের আগে তামিমকে নিয়ে গড়েন ১০২ রানের জুটি। হাফ সেঞ্চুরি থেকে মাত্র এক রান দুরে থাকতে ৪৯ রানে প্যাভেলিয়নে ফেরেন মুমিনুল। ৯৬ বলের ইনিংসে বাউন্ডারি হাঁকান ৮টি। চারে নামা শান্ত তামিমকে নিয়ে তৃতীয় উইকেটে ৯৩ রানের জুটি গড়েন। তানজীদ তামিম দারুণ টেম্পারম্যান্ট দেখিয়ে অজি বোলারদের শাসন করে আদায় করেন দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরি। আট চার ও এক ছক্কায় ১৯৭ বল খেলে ১০১ রানে যখন প্যাভেলিয়নে ফিরেন তামিম, বাংলাদেশ তখন অজিদের ১৯৮ রান টপকে লিড নিয়েছে। ইনিংসের ৬৬তম ওভারের তৃতীয় বলে ২৩১ রানে তার বিদায়ে ভাঙে বাংলাদেশের তৃতীয় উইকেট জুটিটি।
চতুর্থ উইকেটে অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহিমকে নিয়ে ৬৬ রানের জুটি গড়েন অধিনায়ক শান্ত। সেঞ্চুরির পথে এগুতে থাকা বাংলাদেশ অধিনায়ক নতুন বলের ধাক্কায় দলীয় ২৯৭ রানে সেঞ্চুরি তেকে মাত্র ১৬ রান দূরে থাকতে সাজঘরে ফেরেন তিনি। সাত চার ও এক ছক্কায় ১২৬ বলে ৮৪ রানের দারুণ এক ইনিংস খেলেন টাইগার দলনেতা।তার বিদায়ের পর দ্রুতই লিটন দাস ও মুশফিককে হারায় বাংলাদেশ। দলীয় ৩০৬ রানে, ইনিংসের ৮৫তম ওভারের পঞ্চম বলে ১২ বল খেলে শুন্য রানে সাজঘরে ফিরেন লিটন। এরপর মুশফিকের বিদায়ে বড় ধাক্কা খায় বাংলাদেশ। ২ রান তুলতেই দলীয় ৩০৮ রানে অভিজ্ঞ এই ব্যাটসম্যান প্যাভেলিয়নে ৫৫ বলে ৩৬ রান করে।
দ্রুত দুই উইকেটের পর ষষ্ট উইকেটে মেহেদী হাসান মিরাজ ও হাসান মাহমুদ প্রতিরোধ গড়েন। বল হাতে ছয় উইকেট শিকার করা হাসান এবার অজি বোলারদের শাসন করতে থাকেন। দিন শেষে দু’জনে অপরাজিত আছেন। ৭৬ বলে ১৩ রানে হাসান মাহমুদ ও ৭৩ বলে ৩২ রানে অপরাজিত থাকা এই দুই ব্যাটার আজ তৃতীয় দিন রোববার দ্রুত ফিরলেই বাংলাদেশ গুটিয়ে যায় ৪২৬ রানে।
অজিদের জশ হ্যাজেলউড ৬টি করে উইকেট লাভ করেছেন।
এর আগে বাংলাদেশের প্রেস আক্রমণে ছন্নছাড়া হয় অস্ট্রেলিয়া। শক্তিশালী স্বাগতিক প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ‘রেকর্ড’ করলেন বাংলাদেশের তিন পেসার হাসান মাহমদু, এবাদত হোসেন ও তাসকিন আহমদ। তিন পেসারের আগুনে পুড়ে ছাই অজি ব্যাটিং লাইনআপ। ডারউইনে প্রথম টেস্টে তিন পেসার ১০ উইকেট তুলে নিয়েছেন। প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া গুটিয়ে গেছে মাত্র ১৯৮ রানে।
বাংলাদেশের পেসাররা দ্বিতীয়বারের মতো প্রতিপক্ষের সব উইকেট তুলে নিয়েছেন। স্পিন নির্ভর বাংলাদেশ দিনে দিনে পেসে উন্নতি করছে। পেসাররা আক্রমণে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। প্রতিপক্ষের সব উইকেট পেসাররা তুলে নেওয়ার দ্বিতীয় রেকর্ড এটি বাংলাদেশের পেসারদের জন্য।
এর আগে ২০২৪ সালে পাকিস্তান টেস্টে স্বাগতিকদের বিপক্ষে বাংলাদেশের পেসাররা ১০ উইকেট শিকার করেছিলেন। সেটিই ছিলো পেসারদের সব উইকেট নেওয়ার প্রথম রেকর্ড। এবার ডারউইনে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেও পেসাররা দারুণ করলেন। এবাদত, হাসান মাহমুদদের গতির ঝড়ে উড়েছেন অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যানরা।
ইনিংসের ১২তম ওভারের চতুর্থ বলে প্রথম উইকেটের দেখা পায় বাংলাদেশ। জেক ওয়েরদারল্যান্ডকে দলীয় ৪৫ রানে ফিরিয়ে দেন হাসান মাহমুদ। ৩৭ বলে ২৩ রান করে ছিলেন তিনি। এরপরই সাজঘরে ফিরেন আরেক ওপেনার টার্ভিস হেড। দলীয় ৫২ রানে, ব্যক্তিগত ২২ রানে প্যাভেলিয়নে ফেরেন তিনি।
দ্রুত দুই উইকেট হারানোর পর লাবুশানেও ফিরেন সাজঘরে। ইনিংসের ১৯তম ওভারের দ্বিতীয় বলে দলীয় ৬১ রানে তাকে ফেরান এবাদত হোসেন। ২০ বলে মাত্র এক রান করেন তিনি। ২২তম ওভারের শেষ বলে চতুর্থ উইকেট হারিয়ে প্রথম সেশন শেষ করে স্বাগতিকরা। এবার ফিরেন ক্যামেরন গ্রিন। দলীয় ৭৪ রানে ব্যক্তিগত ১৩ বলে ১৩ রানে কাটা পরেন তিনি।
দ্বিতীয় সেশনে পঞ্চম উইকেটে স্টিভেন স্মিথ অ্যালেক্স ক্যারিকে নিয়ে ৫৫ রানের জুটি গড়েন। এবার এবাদত ভাঙেন প্রতিরোধ গড়া জুটিটি। ইনিংসের ৩৭তম ওভারের প্রথম বলে দলীয় ১২৯ রানে ক্যারিকে ফেরান তিনি। সাজঘরে যাওয়ার আগে ৪৩ বলে দুই বাউন্ডারিতে ১৯ রান করেন তিনি।
পঞ্চম উইকেটের পর ষষ্ট উইকেটও দ্রুত হারায় স্বাগতিকরা। তাসকিনের শিকারে বিওয়েবস্টার ফিরেন প্যাভেলিয়নে। ৩৯তম ওভারের তৃতীয় বলে দলীয় ১৫২ রানে সাজঘরে ফেরার আগে তিনি ১০ বলে ১২ রান করেন।
হাসান মাহমুদ ইনিংসের ৪৫তম ওভারের তৃতীয় বলে অজি অধিনায়ক প্যাট কামিন্সকে ফিরিয়ে দেন। দলীয় ১৭২ রানে সপ্তম উইকেটে ফেরার আগে স্বাগতিক দলনেতা ১৯ বলে করেন মাত্র ৯ রান। দুর্দান্ত বোলিংয়ে হাসানের চতুর্থ শিকারে পরিণত হন মিচেল স্টার্ক। ইনিংসের ৪৭তম ওভারের শেষ বলে তার বিদায়ে ১৭৬ রানেই অষ্টম উইকেট হারায় কামিন্সের দল। ১১ বল খেলে মাত্র ১ রান করেন স্টার্ক।
এরপর ব্যাট হাতে একা লড়াই করা স্টিভেন স্মিথকে থামান হাসান মাহমুদ। ৫১তম ওভারের পঞ্চম বলে সাজঘরে ফেরার আগে ১০৯ বলে ৭১ রানের নান্দনিক ইনিংস খেলেন শুরুতে জীবন পাওয়া এই ব্যাটসম্যান। ১৮৯ রানে স্মিথের বিদায়ের পর অস্ট্রেলিয়া অলআউট হয়ে যায় ১৯৮ রানে নাথান লিয়নের বিদায়ের পর। ১৩ বলে ৭ রান করেন অজিদের শেষ ব্যাটার।
ডারউইনে প্রথম টেস্ট শুরুর আগে একটাই জল্পনা-কল্পনা পাঁচ দিনের টেস্ট কত দিনে শেষ হবে? দুই দিন নাকি তিন দিন? বাংলাদেশ কত সময় ব্যাটিং করতে পারবে? অস্ট্রেলিয়া আগে ব্যাটিং করলে কখন ইনিংস ঘোষণা করবে? অজিদের সেই দাম্বিকতায় চরম চপেটাঘাত করলেন বাংলাদেশের বোলাররা।
প্রথম টেস্টের প্রথম দিনই বিপর্যয়ে অস্ট্রেলিয়া। টাইগার বোলারদের তোপের মুখে পড়েন স্টিভেন স্মিথরা। একের পর এক উইকেট তুলে নিচ্ছেন টাইগার পেসাররা। মারারা স্টেডিয়ামের সবুজ গালিচায় গতি, বাউন্সের মিশেলে তাসকিন, এবাদত আর হাসান মাহমুদ রীতিমতো ছেলে খেলা করছেন স্বাগতিকদের নিয়ে। একের পর এক উইকেট তুলে নিচ্ছেন। দুর্দান্ত বোলিং করেন।
বাংলাদেশের হয়ে হাসান মাহমুদ একাই ৬টি, তানকিন ও এবাদত ২টি করে উইকেট লাভ করেন।
এসএনপিস্পোর্টসটোয়েন্টিফোরডটকম/নিপ্র/ডেস্ক/০০.































